প্রধান লক্ষ্য যখন ক্ষমতা তখন সেই ক্ষমতার মোহে হেন কোনো কাজ নাই, তাহা যতই নিকৃষ্ট হউক, যাহা করা সম্ভব নহে। কোনটি ঠিক কোনটি ঠিক নহে, তাহা বিবেচনা করিবার বিবেকবোধকে প্রয়োজনে বিসর্জন দিয়া ক্ষমতালোভীগণ লক্ষ্যের দিকে আগাইয়া যাইতে থাকে। কিন্তু সেই ক্ষমতা যাহাদের সমর্থনের ফল এবং যাহাদের কল্যাণার্থে তাহারাই যদি উপেক্ষিত রহিয়া যায় তাহা হইলে ইহাকে নিছক প্রহসন বৈ আর কী বলা যায়? কোন রাজনৈতিক গোষ্ঠী যখন জনগণকে কেবল ভোট প্রদানের যন্ত্র মনে করে তখন তাহারা জনগণের বুকে সিমারের ন্যায় কড়াত চালাইতেও কুণ্ঠাবোধ করে না। যেই ব্যবস্থার উপর জনগণ বিশ্বাস স্থাপন করিয়াছে সেই রাজনীতিই যদি তাহাদের সহিত অবিমৃষ্যকারিতার পরিচয় দেয়, তখন তাহা শুধু বিস্ময়েরই নহে উদ্বেগেরও। রাজনৈতিক ক্ষমতার এই খেলা যখন জাতির মেরুদণ্ড বিবেচিত শিক্ষাকেও ধ্বংস করিতে পিছপা হয় না, তখন ধরিয়াই লইতে হইবে সেই জাতি বিদ্যমান রাজনীতির পাকচক্রে একটি ঘোর অন্ধকারাচ্ছন্ন ভবিষ্যতের দিকে ধাবমান। গত পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচন পূর্বাপর জনগণ দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেই ধ্বংসলীলা প্রত্যক্ষ করিয়াছে তাহা যেকোন সভ্য ও দেশপ্রেমিক নাগরিককে নিদারুণভাবে বিচলিত করিয়াছে, নিশ্চিতরূপেই। দেশের শিক্ষাকে তুচ্ছজ্ঞান করিয়া নির্বাচন প্রতিহত করিবার নামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাণ্ডব চালনায় কে কতটা পারদর্শী তাহারই প্রতিযোগিতায় যেন অবতীর্ণ হইয়াছিল এদেশের রাজনীতির একাংশ। দেশের মানুষের সেই বেদনাহত হূদয়ে কষ্টের নূতন মাত্রা যোগ হইয়াছে যখন ছয় মাস অতিবাহিত হইবার পরও ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনেকগুলিই অদ্যাবধি রহিয়া গিয়াছে মেরামতবিহীন, এমন সংবাদে। দেশের রাজনীতি যে নানান অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটিবার ফলে বর্বরোচিত হামলায় ক্ষতির শিকার এইসব বিদ্যাপীঠের বর্তমান পরিস্থিতিটিই তাহার প্রমাণ। শতকরা হিসাবে মেরামত না হওয়া এইসব বিদ্যালয়ের সংখ্যা হয়ত অল্প, কিন্তু শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হইবার কারণে বিগত প্রায় ছয়মাসে ঐ বিদ্যালয়গুলির শিক্ষার্থীরা যেই ক্ষতির সম্মুখীন হইয়াছে তাহা কি শতকরা হিসাবে পরিমাপযোগ্য? কোমলমতি এই শিক্ষার্থীদের বিঘ্নিত ছয়টি মাস ফিরাইয়া দেওয়া কি আর কোনভাবেই সম্ভব! দেশের শিক্ষার প্রতি এইরূপ উদাসীনতা কী কোনমতেই মানিয়া লওয়া যায়?
নূতন সরকার গঠিত হইবার পর স্বয়ং শিক্ষামন্ত্রী ক্ষতিগ্রস্ত সকল প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো পুনঃনির্মাণ করিবার ক্ষেত্রে কোনোপ্রকার বিলম্ব হইবে না বলিয়া প্রতিশ্রুতি দিয়াছিলেন। দেশের মানুষও তাহার কথায় আশ্বস্ত হইয়াছিল। কিন্তু ছয় মাস চলিয়া যাইবার পরও ৩৬টি বিদ্যালয়ের মেরামতকর্মে দীর্ঘসূত্রতা জরুরি বিষয়ে জাতীয় উদাসীনতার নামান্তর। অনাকাঙ্ক্ষিত এই বিলম্বের দায় সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ তথা ক্ষমতাসীন সরকার কোনভাবেই এড়াইতে পারেন না। অপরপক্ষে সংস্কার কাজকে এই দীর্ঘসূত্রতার জালে জড়াইবার ক্ষেত্রে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং বিত্তশালীগণের ঔদাসীন্যও কম দায়ী নয়। যেই স্কুলভবন বা কাঠ ও টিন দ্বারা নির্মিত স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছে—সেই প্রতিষ্ঠানগুলিকে পূর্বের অবস্থায় ফিরাইয়া আনিতে যেই অর্থের প্রয়োজন তাহার অংক আকাশচুম্বী নহে। প্রয়োজন শুধু সদিচ্ছা এবং শিক্ষার প্রতি ভালোবাসা। কাবিখা (কাজের বিনিময়ে খাদ্য), টিআর (টেস্ট রিলিফ)-সহ বিভিন্ন কর্মসূচির আওতায় জনপ্রতিনিধিগণ সাংবাত্সরিক যেই বরাদ্দ পাইয়া থাকেন ইহার একটি অংশ তাহারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়নকর্মে ব্যয় করিতে পারেন। তাহার পরও কি কারণে বিশেষ সরকারি বরাদ্দের জন্য অপেক্ষা তাহা বোধগম্য নহে। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের কাছে অপরাজনীতির হিংস্রতা, কূটকৌশল ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা অবোধ্য। যেই স্বপ্ন তাহারা বত্সরের শুরুতেই নূতন বই হাতে পাইয়া দেখিয়াছিল, সেই স্বপ্নের পথযাত্রা যাতে কোনোভাবেই রুদ্ধ না হয় সেই ব্যবস্থাই করিতে হইবে। ক্ষতিগ্রস্ত স্কুলসমূহ যত দ্রুত সম্ভব সংস্কার-মেরামত করা হইবে—ইহাই প্রত্যাশিত।
