মাকড়শার জালের মতো নদীনালা-খালবিল পূর্ণ এই দেশে আমিষের চাহিদা পূরণে মত্স্য সম্পদের গুরুত্ব অপরিসীম। জলবায়ু পরিবর্তনসহ বিবিধ কারণে গত কয়েক সপ্তাহ ইলিশ ধরিবার মওসুমেও রুপালি মেস্যর দেখা মিলিতেছে না। ইলিশের আকালে মত্স্য আহরণের সহিত জড়িত লাখ লাখ শ্রমজীবী আপাতত বড় বিড়ম্বনায় পড়িলেও তাহা ভবিষ্যতের জন্যও কোনো অশনি সংকেত কিনা, তাহা ভাবিবার সময় আসিয়াছে। বিপুল জনসংখ্যার এই দেশে পুষ্টিঘাটতি মিটাইতে মাছের ভূমিকা প্রথমভাগে, এবং সেই মত্স্য-সংস্থানের যদি সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনায় বাস্তবে ঘাটতি থাকে, তাহা হইলে বিপদ বৃহত্তর। গত সোমবার ইত্তেফাকে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে জানা গিয়াছে, মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন কেন্দ্র ও লালন কেন্দ্র হিসাবে গড়িয়া তুলিতে সুন্দরবনের নদীনালায় সকল প্রকার মত্স্যসম্পদ আহরণ নিষিদ্ধ করা হইতেছে। এই হেতু সুন্দরবন উপকূলীয় এলাকা বাগেরহাট জেলায় ত্রিশ হাজার জেলেকে দেওয়া হইবে আইডি কার্ড। মত্স্য আহরণ কাজে নিয়োজিত এ জেলেদের বিকল্প আয়ের উেসর কথাও ভাবিতেছেন কর্তৃপক্ষ।
নিরাপদ সংরক্ষণে মাছের উত্পাদন কয়েকগুণ বৃদ্ধি করিতে ইহা নিঃসন্দেহে কার্যকর একটি উদ্যোগ। কেননা, মৌসুমের শুরুতে ফি-বত্সর সুন্দরবনের বিভিন্ন মত্স্য অভয়াশ্রম ও প্রজনন ক্ষেত্র অবৈধভাবে দখল হইবার খবর পত্রিকায় প্রকাশ হইতে দেখা যায়। সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের সুপতি, কটকা ও কচিখালীর নদী এলাকায় ‘মত্স্য অভয়াশ্রম’ হিসাবে আগে হইতেই মত্স্য প্রজননের নির্বিঘ্ন ক্ষেত্র তৈরির প্রচেষ্টা রহিয়াছে। কিন্তু ইহাও সত্য যে, এতদাঞ্চলে বসবাস করে শত-শত জেলে পরিবার। মত্স্য আহরণই তাহাদের প্রধান পেশা। সুতরাং বত্সরের গুরুত্বপূর্ণ ছয়টি মাস জুন হইতে নভেম্বর পর্যন্ত তাহারা মাছ না ধরিয়া জীবন-জীবিকা নির্বাহ করিবে কীরূপে? সেই কারণে মাছের নিরাপদ আশ্রয়, বিচরণ ও প্রজননের জন্য সংরক্ষিত এই এলাকায় সকল প্রকার মাছ ধরা নিষিদ্ধ হইলেও তারা বাঁকা পথে ঠিকই উপায় বাহির করিয়া নেয়। সত্যিকার অর্থে. বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করিলে, এই অবৈধ কর্ম হইতে তাহাদের বিরত রাখাও সম্ভবপর হইবে না। সুতরাং এতদাঞ্চলের ৩০ হাজার মত্স্যজীবীর সুষ্ঠু তালিকা করিয়া আইডি কার্ড তৈরি করিলে ওই ছয় মাস তাহাদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থার সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব হইতে পারে। তাহা অত্যাবশ্যকও বটে। তাহা না হইলে ‘মত্স্য অভয়াশ্রম’-এর নজরদারির দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীর একটি অসাধু অংশের যোগসাজশে কিছু অসত্ মত্স্যজীবী অভয়াশ্রমের নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখাইতেই থাকিবে। এবং এই সংক্রান্ত সংবাদও আমরা ফি-বত্সর পত্রিকায় প্রকাশ হইতে দেখিব। তাহার পর ইহাও শুনিব যে, প্রজনন ঋতুতে ডিমওয়ালা মা ইলিশ নিধনে ইলিশশূন্য হইয়া পড়িতেছে উপকূলীয় নদ-নদী।
মাছে-ভাতে বাঙালির চিরায়ত পরিচয়টি মুছিয়া যাইবে যদি কার্যকর ব্যবস্থাপনা ও সুষ্ঠু পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব না হয়। সুতরাং মত্স্য প্রজননের প্রাকৃতিক উত্সগুলো রক্ষা করিবার বিকল্প নাই। বিভিন্ন প্রজাতির মাছ যাহাতে বর্ষার প্লাবনভূমিতে নির্ভয়ে ও নির্বিঘ্নে বংশবিস্তার করিতে পারে, তাহার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ শুধু পরিকল্পনা করিয়া ও কাগজে-কলমে কার্যসম্পাদন করিবেন না নিশ্চয়ই। সুন্দরবন উপকূলীয় এলাকাসমূহে নিয়োজিত শত সহস্র মত্স্যজীবীর যথার্থ ডেটাবেইজ তৈরি করিয়া আইডি কার্ডের ব্যবস্থাদি সত্বর সম্পন্ন করা দরকার। কেননা, এতদাঞ্চলের প্রতিটি বিষয় বাস্তুতন্ত্রের মতো একটির সহিত অন্যটি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
