ইহা শান্তিরই বারতা

আপডেট : ০৯ জুলাই ২০১৪, ২১:১২
বৃহত্ প্রতিবেশী প্রায় সর্বক্ষেত্রেই তুলনামূলক ক্ষুদ্র প্রতিবেশীর প্রাপ্য-অংশটুকু হইতে যতটুকু পারা যায় একটু বাড়াইয়া লইতে চাহে। এই মানসিকতার পরিচয় আমরা দেখিতে পাই মানব-সভ্যতার ছত্রে ছত্রে। এই আধুনিক কালেও তাহার ব্যত্যয় ঘটে না খুব বেশি। তাই মূল ভূখণ্ডের অনুপাতে প্রাপ্য সমুদ্রসীমা বুঝিয়া পাইতে আমাদের বারংবার সমস্যায় পড়িতে হইয়াছে। এই সমুদ্রসীমার সার্বভৌমত্ব লইয়া বঙ্গোপসাগরে প্রতিবেশী মিয়ানমার ও ভারতের সহিত আমাদের বিরোধ ছিল যথাক্রমে প্রায় ৮০ হাজার ও ২৫ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকার। আমাদের প্রাপ্য সমুদ্রসীমা লইয়া আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে যাইবার পূর্বে বহু বত্সর ধরিয়া, ক্রমাগতভাবে, দ্বিপক্ষীয় ভিত্তিতে ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নির্ধারণের চেষ্টা চলিয়াছে। কৌশলগত ও অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই বিপুল সমুদ্রসীমার অধিকার প্রতিষ্ঠা করিবার কম চেষ্টা হয় নাই। এবং তাহা যদি শেষাবধি শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের রেখা অঙ্কন করে, তবে তাহার চাইতে ভালো আর কি-ইবা হইতে পারে? বঙ্গোপসাগরের সীমা, অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং মহীসোপানের নিম্নভাগের সার্বভৌম অধিকার লইয়া বাংলাদেশ ও ভারতের দাবির শুনানি শেষে নেদারল্যান্ডসের স্থায়ী সালিশি আদালত বা পার্মানেন্ট কোর্ট অব আর্বিট্রেশন (পিসিএ) কর্তৃক গত সোমবার প্রদান করা রায়টি এই কারণেই আমাদের নিকট অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ। ন্যায্যতা নিশ্চিত করিবার জন্য এই স্থায়ী সালিশি আদালত উভয় দেশের বিরোধপূর্ণ আনুমানিক ২৫ হাজার ৬০২ বর্গ কিলোমিটার সমুদ্র এলাকার মধ্যে ১৯ হাজার ৪৬৭ বর্গ কিলোমিটার সমুদ্র এলাকা বাংলাদেশকে দিয়াছে। ইহার পূর্বে ২০১২ সালে আরেকটি রায়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ মিয়ানমারের সহিতও সমুদ্রসীমার নিষ্পত্তির রায় পায়। মিয়ানমারের সহিত বাংলাদেশের বিরোধ ছিল ৮০ হাজার বর্গ কিলোমিটারের, তাহার মধ্যে বাংলাদেশ পাইয়াছিল ৭০ হাজার বর্গ কিলোমিটার। বাংলাদেশের নীতি যেহেতু প্রতিবেশীর সহিত শান্তি ও সৌহার্দ্য বজায় রাখা এবং এতদাঞ্চলের মানুষের মঙ্গলার্থ নিরন্তর সহযোগিতার হাত আগাইয়া দেওয়া—তাহা হইলে প্রতিবেশীদের সহিত আর কীরূপে এই সমস্যার শান্তিপূর্ণ মীমাংসা সম্ভব হইত? আমাদের বিজয় এইখানে যে, ভারতের সহিত আমাদের দাবিকৃত অংশের ৭৬ শতাংশই আমরা পাইয়াছি। ২০১২ সালে মিয়ানমারের সহিত বিরোধপূর্ণ এলাকার ৮৭.৫ শতাংশ সমুদ্রভাগ বাংলাদেশের পক্ষে রায় দেওয়া হইয়াছিল। উভয় ক্ষেত্রেই, বাংলাদেশের অন্যপক্ষ—ভারত ও মিয়ানমার তাহাদের দাবির যথাক্রমে ২৪ ও ১২.৫ শতাংশ মাত্র পাইয়াছে। সর্বশেষ মামলায় ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের দাবি ছিল—বঙ্গোপসাগর ও বাংলাদেশের ভূমির মূলবিন্দু হইতে সমুদ্রের দিকে ১৮০ ডিগ্রির সরলরেখা অনুসারে প্রসারিত হইবে। অন্যদিকে ভারতের দাবি ছিল—সমুদ্রতট বিবেচনায় এই রেখা হইবে ১৬২ ডিগ্রি। স্থায়ী সালিশি আদালত রায় দিয়াছে ১৭৭.৩ ডিগ্রি। অর্থাত্ উভয়ের দাবির মধ্যকার ১৮ ডিগ্রি ব্যবধানে বাংলাদেশের পক্ষে আসিয়াছে ৮৫ শতাংশ, অন্যদিকে ভারত পাইয়াছে মাত্র ১৫ শতাংশ। ১৯৭০ সালের একটি ঘূর্ণিঝড়ে জাগিয়া ওঠা দক্ষিণ তালপট্টি, যাহা ১৯৮৫ সালের আরেকটি ঝড়ে পুনরায় সমুদ্রজলে তলাইয়া গিয়াছে, বাংলাদেশের ভাগে পড়ে নাই বটে। হয়তো সেই দ্বীপটি বর্তমানে দৃশ্যমান থাকিলে, সালিশি আদালতের আইনানুযায়ী, বাংলাদেশের ভূভাগের তুলনামূলক সন্নিহিত বলিয়া সম্ভবত আমাদের ভাগেই পড়িত। কিন্তু তাহা পানিতে নিমজ্জিত থাকায় সম্ভবপর হয় নাই। তথাপি সব মিলিয়া এই রায়ের ফলে বাংলাদেশ শেষাবধি ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গ কিলোমিটারের অধিক টেরিটোরিয়াল সমুদ্র পাইয়াছে। ২০০ নটিক্যাল মাইল একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং চট্টগ্রাম উপকূল হইতে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপানের তলদেশে অবস্থিত সবধরনের প্রাণিজ ও অপ্রাণিজ সম্পদের উপর সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠা করিতে পারিয়াছে। অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ উপায়ে এই অতি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার মীমাংসা করা এবং বাংলাদেশের দাবির সিংহভাগ অর্জন করা দেশের প্রধান নির্বাহীর জন্য এক বিরল বিজয় নিশ্চয়ই। ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত পার্বত্য চুক্তির কথাও একই কারণে স্মরণ করা যাইতে পারে। ওই চুক্তির ফলে সেই সময় অস্থিরতাপূর্ণ পার্বত্য অঞ্চলে যে নূতন শান্তির বাতাবরণের বাতায়ন উন্মোচিত হইয়াছিল, তাহার ইতিবাচক ফল বহুলাংশে এখন দৃশ্যমান। শান্তির পথে হাঁটিয়া রাষ্ট্রনায়কোচিত কৌশলগত নীতি-অবস্থানের মধ্য দিয়া যাঁহারা যুগে যুগে দেশ ও জাতিকে আগাইয়া দেন, অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেন, তাঁহারা ইতিহাসের পাতায় প্রাতঃস্মরণীয় হইয়া থাকিবেন, তাহাতে সন্দেহ কী? বাংলাদেশ সরকারের প্রধান নির্বাহী আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে শান্তির পথের এই সফল অভিযাত্রার স্বীকৃতি তথা পুরস্কার পাইবার দাবি রাখেন বৈকি।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন