ফিটনেসবিহীন নৌযান ও নৌদুর্ঘটনা

আপডেট : ০৯ জুলাই ২০১৪, ২১:১২
‘দুইদশকে লঞ্চ দুর্ঘটনায় প্রাণহানি’ শীর্ষক এক প্রতিবেদন সমপ্রতি প্রকাশ করিয়াছে একটি অনলাইন সংবাদ সংস্থা। তাহাতে দেখা যায়, সারাদেশে ফিটনেসবিহীন নৌযানের সংখ্যা ১১ হাজার ২১৭। মোট নৌযানের সংখ্যা ৩৫ হাজার। এই অনুযায়ী প্রায় এক তৃতীয়াংশ নৌযানের ফিটনেস নাই। ফিটনেসবিহীন নৌযান নৌদুর্ঘটনার অন্যতম বড় কারণ। কিন্তু এই ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কতটা উদাসীন, তাহা এই তথ্যই প্রমাণ করিয়া দেয়। অনুমোদনহীন নৌযানের ক্ষেত্রে আরও শোচনীয় অবস্থা। মাত্র ২ হাজার ১৮৮টি নৌযান রেজিস্ট্রেশন প্রাপ্ত বলিয়া জানা যায়। বিষয়টি হতাশাজনকই বটে। বলাবাহুল্য, ফিটনেস ও অনুমোদনহীন নৌযানই অনেক সময় আমাদের জন্য কাল হইয়া দাঁড়ায়। একই প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে যে, ১৯৯৪-২০১৩ সাল পর্যন্ত ২০ বত্সরে বাংলাদেশে ৬৫৬টি লঞ্চ দুর্ঘটনা ঘটিয়াছে। ইহাতে প্রাণ হারাইয়াছে ৫ হাজার ২৯০ জন। এখন পর্যন্ত নিখোঁজ রহিয়াছে ১ হাজার ২৬৬ জন। এই লঞ্চ দুর্ঘটনায় স্বজন হারাইয়া অসহায় ও ছিন্নমূল হইয়াছে প্রায় ৬৫৬টি পরিবার। সব সদস্যের মৃত্যুর কারণে নিশ্চিহ্ন হইয়াছে ৩৯৩টি পরিবার। ইহাছাড়া আহত ও পঙ্গুত্ব বরণকারী লোকের সংখ্যা অগণিত। গত দুই দশকের যে চিত্র এখানে ফুটিয়া উঠিয়াছে তাহাতে উদ্বিগ্ন হইবার যথেষ্ট কারণ আছে। আসলে নৌপথের সমস্যার সমাধান ও উন্নয়ন আশানুরূপভাবে হইতেছে না । প্রতি বত্সর গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালের সময় নৌদুর্ঘটনা বাড়িয়া যায়। এক একটি বড় দুর্ঘটনা দেশের জন্য ট্রাজেডির কারণ হইয়া দাঁড়ায়। এইরূপ কোন কোন দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে দেখা যায়, উদ্ধার তত্পরতা শেষ করিতেই আমাদের কয়েকদিন লাগিয়া যায়। ইহাতে প্রতিদিন নদীপাড়ে এক করুণ দৃশ্যের অবতারণা হয়। বাড়ে হতাহত ও নিখোঁজের সংখ্যা। ফিটনেসবিহীন ও অনুমোদনহীন নৌযান ছাড়াও চালকের অদক্ষতা, বেপরোয়া গতি, অতিরিক্ত যাত্রী ও মালামাল বহন, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় অসতর্কতা ইত্যাদি কারণেও নৌদুর্ঘটনা ঘটিতে দেখা যায়। অনেক সময় সতর্ক সংকেত দেওয়ার পরও অনেক লঞ্চ মালিক তাহা মানিয়া চলার প্রয়োজনবোধ করেন না। তাহাছাড়া অনেক সময় নৌযানে প্রয়োজনীয় সংখ্যক লাইফ জ্যাকেট থাকে না। এইসব সমস্যা ও সীমাবদ্ধতা ধীরে ধীরে কাটাইয়া উঠিতে হইবে। প্রতিটি আলোচিত নৌদুর্ঘটনার পর কিছুদিন যাবত্ এই লইয়া সর্বত্র আলোচনা চলে। তাহার পর আবার আগের মত অবস্থার সৃষ্টি হয়। নৌদুর্ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হইলেও সেই কমিটির প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখে না বা সেই অনুযায়ী সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হয় না। দোষী সারেং কিংবা লঞ্চ মালিকের বিরুদ্ধে প্রায়শ গ্রহণ করা হয় না কোন ব্যবস্থা। যাহা হউক, এই বর্ষাকালে নৌদুর্ঘটনা প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট সকলকে সচেতন ও দায়িত্বশীল হইতে হইবে। নৌপথে পর্যাপ্ত বয়াবাতি, সাইন-সিম্বল ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করিতে হইবে। রুট পারমিট ও ফিটনেস সার্টিফিকেট দেওয়ার সময় আরও সতর্ক হইতে হইবে। ইহাছাড়া নৌযানের নকশা যথাযথভাবে প্রণয়ন করা বাঞ্ছনীয়। নির্মাণকাজেও কঠোরভাবে তদারকি করা দরকার। পরিবেশবান্ধব, ব্যয়সাশ্রয়ী ও আরামদায়ক নৌ ও রেল যোগাযোগকে অধিক গুরুত্ব দেওয়ার সময় আসিয়াছে। এইজন্য বেপরোয়া নদীদখল ও দূষণ বন্ধ করিতে হইবে। নৌপথের নাব্যতা সংকট দূর করিবার জন্য গ্রহণ করিতে হইবে কার্যকরী ব্যবস্থা। সর্বোপরি আমরা নৌখাতে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন দেখিতে চাই। এই ব্যাপারে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সবিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করি।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন