স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বাণিজ্য সহায়তা দেয়া এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর রফতানি আয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৯৭৬ সালে জিএসপি (জেনারালাইজ্ড সিস্টেম অব প্রেফারেন্স) ব্যবস্থা চালু করে। জিএসপি সুবিধার আওতায় বর্তমানে উন্নয়নশীল দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার পণ্য এবং স্বল্পোন্নত দেশগুলো অতিরিক্ত আরও ১ হাজার ৫০০টি পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাচ্ছে। এ সুবিধার আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের যতগুলো পণ্য রফতানি হয়ে থাকে তার ৯৭ শতাংশ পণ্য শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধায় আওতায় পড়লেও সে তালিকায় গার্মেন্টস পণ্য নেই। ফলে বাংলাদেশের মতো যেসব দেশের মূল রফতানি পণ্য তৈরি পোশাক, তাদের জন্য এ সুযোগ সদ্ব্যবহারের সুযোগ খুবই সীমিত।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র্রে বাংলাদেশের বাত্সরিক মোট রফতানির আর্থিক মূল্য প্রায় ৪৯০ কোটি ডলার, যার মধ্যে প্রায় ৯৩ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক রফতানি থেকে। হিসেব অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রে যে সকল পণ্য রফতানিতে বাংলাদেশ শুল্কমুক্ত সুবিধা পেয়ে থাকে তা মোট রফতানিকৃত পণ্যের কেবল শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ। যা শুভঙ্করের ফাঁকি ছাড়া আর কিছুই নয়। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রে রফতানিতে বাংলাদেশকে যে ৯৭টি পণ্যে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা দেয়া হয়েছে তার অধিকাংশ পণ্য বাংলাদেশ থেকে রফতানি হয় না। অথচ তৈরি পোশাকে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা পাওয়া গেলে দেশের রফতানি আয় কয়েকগুণ বেড়ে যেত। কারণ দেশের মোট রফতানি পণ্যের ৭৬ শতাংশই তৈরি পোশাক শিল্প খাতের।
বাংলাদেশে সামপ্রতিককালে ঢাকার আশুলিয়ার তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ড ও সাভারের রানা প্লাজা ধসে ১৩শ’র বেশি শ্রমিক নিহত হওয়ার প্রেক্ষাপটে গত বছরের ২৭ জুন বারাক ওবামা সরকার বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা সাময়িকভাবে স্থগিতের ঘোষণা দেয়। সাথে সাথে জিএসপি সুবিধা ফিরে পেতে পোশাক কারখানা ভবনের অবকাঠামো উন্নয়ন ও শ্রমিক নিরাপত্তা, কর্ম পরিবেশের উন্নতি এবং শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করাসহ বাংলাদেশ সরকারকে ১৬টি শর্ত জুড়ে দেয়। বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের জিএসপি সুবিধা ফিরে পেতে দেশটির বেঁধে দেয়া কর্মপরিকল্পনার শর্ত পূরণে গুরুত্বপূর্ণ কিছু অগ্রগতি হয়েছে। তবে এখনো উল্লেখযোগ্য শর্ত বাস্তবায়ন করতে পারেনি সরকার। অতি সমপ্রতি ইউএস ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভ (ইইএসটিআর) তাদের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানান। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির মতে, কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি হলেও মূল কিছু শর্ত বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে বাংলাদেশ সরকার। যেগুলোর মধ্যে রয়েছে, শ্রম আইন সংশোধন ও শ্রমিকের বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধ, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ঝুঁকিযুক্ত কারখানাগুলোকে ঝুঁকিমুক্ত করা, কারখানায় অতিরিক্ত পরিদর্শক নিয়োগ, প্রতিনিয়ত শ্রমিক সহিংসতা হলেও সরকার কর্তৃক তা আমলে না নেয়াসহ শ্রমিক ইউনিয়নের অনুমতি না দেয়া। যুক্তরাষ্ট্র জিএসপি উপকমিটি, ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশের অগ্রগতির পরবর্তী পর্যবেক্ষণ করবে বলেও জানান এ প্রতিবেদনে।
২০০৫ সালে ডব্লিউটিও’র (ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশন) হংকং ঘোষণা অনুযায়ী উন্নত দেশ স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে তাদের প্রায় সব পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশের সুযোগ দিয়েছে। ওই ঘোষণা অনুযায়ী ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা দেয়। সর্বশেষ বালি ঘোষণায়ও স্বল্পোন্নত দেশের রফতানিতে জিএসপি সুবিধা দেয়ার কথা বলা হয়েছে। অথচ একটি যৌক্তিক দাবি পূরণে বিগত এবং বর্তমান সরকার ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের বহুল আলোচিত টিকফা (ট্রেড এ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কো-অপারেশন ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট) চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও সরকার এটাকে ট্রেডমার্ক হিসেবে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছে। টিকফা চুক্তি স্বাক্ষরের আগে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক পণ্য শুল্কমূল্যভাবে প্রবেশ করাতে যে কর্মপরিকল্পনা সরকারের ছিল তা সম্পূর্ণ ভেস্তে গেছে। এক্ষেত্রে সরকার কূটনৈতিক ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।
বাংলাদেশের বাজারে ২ শতাংশ শুল্ক দিয়ে আমেরিকান পণ্য প্রবেশ করছে। অথচ আমেরিকার বাজারে পণ্য প্রবেশের ক্ষেত্রে ১৫ দশমিক ২ শতাংশ শুল্ক গুনতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। এই ফারাকটা সরকারকে উপলব্ধি করতে হবে। বাংলাদেশ সরকারকে এটা বিবেচনা করে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। দেশের রফতানি আয়ের সবচেয়ে বড় খাত তৈরি পোশাককে জিএসপির অন্তর্ভুক্ত করতে যা যা করা দরকার সরকারকে তা করতে হবে।
আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সবচেয়ে বড় খাত পোশাক শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের ন্যায্য ভাতা আদায়ে বিভিন্ন উত্সবের আগে রাস্তায় আন্দোলন করতে দেখা যায়। এটা যেমন সত্য ও দু:খজনক তেমনি তা অগ্রহণযোগ্য। পোশাক শিল্প রক্ষায় শ্রমিকদের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া যেমন যৌক্তিক তেমনি মানবিকও বটে। তাই মার্কিন পরামর্শে শর্তপূরণ করে তাদেরকে সন্তুষ্ট করা নয় বরং সরকারকে স্বউদ্যোগে নিজস্বার্থে দেশের সম্ভাবনাময় পোশাক শিল্প রক্ষায় শ্রমিকদের অধিকার ও ন্যায্যতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে শ্রমিক আইন সংশোধনসহ পোশাক কারখানায় শ্রমিকদের অনুকূল পরিবেশ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সাথে সাথে একটি শক্তিশালী কমিশন গঠন করে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোকে সামনে নিয়ে এসে নিজেদের স্বার্থ সুরক্ষায় একটি যৌক্তিক পরিবেশ সৃষ্টির উদ্যোগ বর্তমান সরকারকেই নিতে হবে। নতুবা সুবিধার নামে জিএসপি আমাদের জন্য শুভঙ্করের ফাঁকি হয়েই থাকবে।
লেখক : এলএলএম, আইন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
