প্রশাসনের দায়িত্ব ও কর্তব্য

আপডেট : ১০ জুলাই ২০১৪, ২১:৩২
প্রধানমন্ত্রী জনগণের স্বার্থরক্ষায় সকল ভয়ভীতি, চাপ, লোভ-লালসা ও প্রলোভনের ঊর্ধ্বে থাকিয়া আইনানুগভাবে অর্পিত দায়িত্ব পালনের জন্য জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) প্রতি আহ্বান জানাইয়াছেন। সমপ্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত তিনদিনব্যাপী ডিসি সম্মেলনের উদ্বোধনী ভাষণে তিনি এই আহ্বান জানান। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর এই আহ্বান সময়োপযোগী শুধু নহে, অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণও বটে। কেহ কেহ হয়তো বলিতে পারেন যে, ইহা তো কোনো নূতন কথা নহে। সংবিধানের নির্দেশনা ও বিদ্যমান বিধিবিধান অনুযায়ী প্রশাসন নির্ভয়ে নিরপেক্ষভাবে তাহাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করিবেন— ইহাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলির বাস্তবতা সম্পর্কে যাহারা যত্সামান্য খোঁজখবর রাখেন তাহারা ভালো করিয়াই জানেন যে, কাজটি কতোখানি কঠিন। আর ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা তো আরও ভয়াবহ। আইনানুগ দায়িত্ব পালন করিতে গিয়া প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কী নির্মম অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হইতে হয়—তাহা অনুসন্ধান করিবার জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বা গবেষণার প্রয়োজন পড়ে না;—শুধু প্রতিদিনের সংবাদপত্রের পাতায় চোখ বুলাইলেই চলে। এতো ভয়ভীতি ও চাপের মধ্যে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা কীভাবে তাহাদের দায়িত্ব পালন করেন—তাহা ভাবিলে অবাক হইতে হয় বৈকি! কথায় আছে—‘বাঁশের চাইতে কঞ্চি বড়’। কাহারা কীভাবে ভয়ভীতি দেখান কিংবা অন্যায় চাপ প্রয়োগ করেন—তাহাও নীতিনির্ধারক মহলের অজানা থাকিবার কথা নহে। যেই কথাটি না বলিলেই নয় তাহা হইল—কঞ্চিদের এই যে সর্বব্যাপী দাপট ইহার জন্য যেমন কোনো বিশেষ সরকারকে দায়ী করা যাইবে না, তেমনি শুধু আমাদের দেশেই এমনটি ঘটিতেছে তাহা ভাবিলেও ভুল হইবে। তবে ইহা মুদ্রার একপিঠের ছবি মাত্র। অন্যপিঠটিও কোনো অংশে কম কলুষিত নহে। প্রশাসনিক কর্তব্যপালনে নানা রকম চ্যালেঞ্জ থাকিবেই। সাহসিকতার সহিত তাহা মোকাবিলা করার মধ্যেই নিহিত রহিয়াছে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের প্রকৃত সাফল্য। তবে ইহার জন্য মেরুদণ্ডের জোর লাগে। সেই শক্তি বা সাহসের উত্স হইল নীতিনিষ্ঠা, সততা, দক্ষতা এবং সর্বোপরি দায়িত্ব ও আত্মমর্যাদাবোধ। দুর্ভাগ্যবশত আমাদের চতুষ্পার্শ্বে তাহার অভাব যে প্রকট হইয়া উঠিয়াছে—তাহাও অস্বীকার করিবার উপায় নাই। সকলেই যে ভয়ভীতি ও চাপের কারণে নীতিভ্রষ্ট ও কর্তব্যচ্যুত হইতেছেন, তাহা নহে। প্রশাসনে এমন কর্মকর্তার সংখ্যাও একেবারে কম নহে—যাহারা মোসাহেবি, দলবাজি এবং স্থানীয় প্রভাবশালীদের দাসত্বকেই তরক্কি অর্জনের সিঁড়ি হিসাবে গ্রহণ করিয়াছেন। অবশ্য ইহার জন্য তাহারা নিজেরাই দায়ী নাকি দেশের বিদ্যমান বাস্তবতাই দায়ী সেই প্রশ্ন উঠিতে পারে। কাহার দায় কতোখানি সেই বিতর্কে না গিয়াও এইটুকু নিশ্চিতভাবে বলা চলে যে, প্রশাসন তাহার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করিতেছে না বা করিতে পারিতেছে না। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যেও তাহার প্রতিফলন অস্পষ্ট নহে। ফলে শুধু যে করদাতা জনগণের ভোগান্তি বাড়িতেছে কিংবা প্রশাসনের উপর তাহারা ভরসা হারাইতেছে তাহাই নহে, সেইসাথে শ্লথ হইয়া পড়িতেছে জাতীয় উন্নয়নের গতিও। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলিকে প্রতিনিয়ত যেইসব কঠিন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হইতে হয়, তন্মধ্যে প্রশাসনকে স্বচ্ছ ও গতিশীল করা নিঃসন্দেহে অগ্রগণ্য। সরকারপ্রধান হিসাবে এই ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর যে সদিচ্ছার কোনো অভাব নাই উপর্যুক্ত বক্তব্যের মধ্য দিয়া তিনি আবারও তাহার বহিঃপ্রকাশ ঘটাইয়াছেন। প্রশাসন তাহাতে আন্তরিকভাবে সাড়া প্রদান করিবেন এবং সরকার পরিচালনার সহিত যাহারা নানাভাবে সম্পর্কিত তাহারা নিজেরা সীমা লঙ্ঘনে বিরত থাকিয়া এবং অন্যদের বিরত রাখিয়া এই ব্যাপারে যথাযথ ভূমিকা পালন করিবেন ইহাই প্রত্যাশিত।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন