ঐতিহ্যবাহী স্টিমার সার্ভিসকে সচল রাখা হউক

আপডেট : ১০ জুলাই ২০১৪, ২১:৩২
এইবারের রোজার ঈদটি বর্ষা মৌসুমে পড়ায় ঈদে ঘরমুখী মানুষের জন্য অপেক্ষা করিতেছে পদে পদে দুর্ভোগের আশংকা। এমনিতেই ঈদে নিজগৃহে প্রত্যাবর্তন একটি কষ্টযাত্রার বিষয়ে পরিণত হইয়াছে, উপরন্তু বর্ষাকালে সড়ক-মহাসড়কগুলিতে নানান খানাখন্দের সৃষ্টি হইতেছে যাহা ঈদ নাগাদ ভয়াবহ রূপ ধারণ করিবে বলিয়া আশঙ্কা করা হইতেছে। অবশ্য নাকাল হইবার এই সম্ভাবনা সড়কপথেই বেশি, ট্রেন ও জলপথে এইরকম ঘটিবার সম্ভাবনা কম। তবে যাত্রীর বিপুল চাপে কাহারোই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলিবার অবকাশ থাকিবে না। বিশেষত বর্ষাকাল হইবার কারণে নদীগুলি পূর্ণ হইয়া গিয়াছে, বড় বড় নদীগুলি কিছুটা উত্তাল হইয়া পড়িয়াছে, মাত্রাতিরিক্ত মানুষের সহযাত্রী হইয়া লঞ্চযোগে বাড়ি ফিরিবার বিষয়টি সব মিলিয়া দুর্ভোগময় ও ঝুঁকিপূর্ণই হইবে। বিষয়টি বাংলাদেশ আভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষকেও (বিআইডব্লিউটিসি) নিশ্চয়ই ভাবাইতেছে। কিন্তু নৌযান সংকটের কারণে তাহারা দুর্ভাবনায় পড়িয়াছে। যাত্রীর তুলনায় নৌযানের অভাব রহিয়াছে বলিয়া পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হইয়াছে। তবে বিআইডব্লিউটিসি কর্তৃপক্ষ আশা করিতেছে ঈদের পূর্বেই সমস্যার সমাধান হইয়া যাইবে এবং যাত্রীরা নির্বিঘ্নে গৃহে ফিরিতে পারিবেন। লক্ষ্য করিবার বিষয় হইলো, এইরকম পরিস্থিতিতে নদী পাড়ি দিয়া নিরাপদে গৃহে প্রত্যাবর্তনের নির্ভরযোগ্য নৌযান হইতেছে বিআইডব্লিউটিসির প্যাডেল স্টিমার। কিন্তু বৃটিশ আমলে তৈরি প্যাডেল স্টিমারসহ বিআইডব্লিউটিসির অধিকাংশ জাহাজই বিকল হইয়া পড়িয়া আছে। নূতন করিয়া তৈরি জাহাজ এমভি বাঙালি এবং জোড়াতালি দিয়া তিনটি পুরাতন জাহাজ বর্তমানে চলাচল করিতেছে। এই ৪টি জাহাজ দিয়াই ঢাকা-বরিশালসহ চাঁদপুর, মোড়েলগঞ্জ ও মাছুয়া রুট টিকাইয়া রাখা হইয়াছে। দক্ষিণবঙ্গমুখী এই স্টিমারগুলি ব্যতীত বিআইডব্লিউটিসির রহিয়াছে ১৩টি সি-ট্রাক যাহার মধ্যে ৯টি বিকল হইয়া পড়িয়া আছে। বিআইডব্লিউটিসি সূত্র জানিয়েছে, সংস্থার অধীনে থাকা ৪টি প্যাডেল স্টিমারের মধ্যে পিএস অস্ট্রিচ মেরামতের জন্য ২০১৩ সালের ডিসেম্বর মাসে নারায়ণগঞ্জ ডক-ইয়ার্ডে পাঠানো হয়। এখন অবধি উহা সচল হয় নাই। রেলওয়ে হইতে ক্রয় করা দেশের সর্ববৃহত্ জলযান হিসাবে পরিচিত এমভি সোনারগাঁও ৯ কোটি টাকায় ক্রয় করা হয় যাহার মেরামতে খরচ হইয়াছে ১৩ কোটি টাকা। কিন্তু যাত্রী পরিবহনে কখনোই সাফল্য দেখাইতে পারে নাই জাহাজটি। বছরের পর বছর নারায়ণগঞ্জ ডকইয়ার্ডে পড়িয়া থাকার পর গত বছর জাহাজটি বেসরকারি উদ্যোক্তার কাছে ভাড়া দেওয়া হইয়াছে। বর্তমানে জাহাজটি শ্যামপুর ঘাটে ভাসমান রেস্তোরাঁ হিসাবে ব্যবহূত হইতেছে। সংস্থার সবচেয়ে নাজুক জাহাজ হিসাবে পরিচিত এমভি সেলা সদরঘাটে নোঙ্গর করিয়া রাখা হইয়াছে। প্যাডেল স্টিমার যেমন নিরাপদ এক বাহন, তেমনি তাহা ঐতিহ্যের স্মারক। বিশেষত জটিল পরিস্থিতিতে এই ধরনের জলযানের উপযোগিতার বিষয়টি অনুভূত হয়। তাই জলযান হিসাবে স্টিমারকে এবং স্টিমার সার্ভিসকে টিকাইয়া রাখার চেষ্টা করা উচিত। ছোট ছোট লঞ্চকে উত্সাহিত করা হইয়াছে, কিন্তু নিরাপদ জলযানের সংখ্যা সেই তুলনায় বাড়ে নাই। ছোট লঞ্চগুলির মধ্যে যেগুলি ত্রুটিপূর্ণ, সেগুলিই ঝড়ে কিংবা খারাপ আবহাওয়ায় ডুবিয়া যায় এবং প্রায় প্রতি বছরই শত শত মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। তাই নিরাপদ বাহন স্টিমারের সার্ভিস চালু রাখিতে কর্তৃপক্ষের অধিক সচেতন হওয়া প্রয়োজন। এই ঈদের আগেই বিকল জাহাজগুলিকে সচল করিয়া যাত্রীদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করা প্রয়োজন।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন