বোদলেয়ারের আশ্চর্য মেঘদলের মধ্যদিয়ে পৃথিবীর দিকে তাকালে মনে হয় মানুষের বসবাসের জন্য জায়গা কী ভীষণ সামান্য! আর সেই তিলার্ধ পরিমাণ আবাসভূমিতে মানুষে-মানুষে কী নির্জলা বৈষম্য! প্লেনের জানালা দিয়ে তাকালেই দেখা যায় আদিগন্ত জলরাশি, নয়তো মরুভূমি। মাঝখানের সামান্য যে বসবাসের জায়গা আছে সেখানে এত আয়োজন করে কত মায়াবী স্বপ্ন নিয়ে মানুষ ঘর বাঁধে, আবার বিদঘুটে সব কারণে-অকারণে সে ঘর ভেঙেও দেয়!
বিমানের জানালার বাইরে এখন দুঃখ জাগানিয়া অন্ধকার। পৃথিবীর যে আকাশে এখন আছি সেখানে রাত। গায়ে কম্বল জড়িয়ে ঘুমাবার চেষ্টা করি। ভারী হয়ে আসা চোখের পাতা আর একটানা প্রপেলারের আওয়াজ আমার কানে গির্জার ঘণ্টার মতো বাজায়। মনে পড়ে হেনিংওয়ের কথা। রিনাউন্ড এ্যালকোহলিক হেনিংওয়ে প্লেন ক্র্যাশ করেছিলেন। ঘুমিয়ে না পড়া প্রায় সব যাত্রী তাদের প্রযুক্তির বিবিধ কারুকাজ নিয়ে ব্যস্ত। ভাবি, এই ‘প্রযুক্তি’ একটা জিনিস বটে! দূরের রহস্য বুঝে নেবার সুযোগটুকু পর্যন্ত কেড়ে নিতে চায়। যখন প্রযুক্তির এত রমরমা প্রসার ছিল না, দূরের যাত্রার সঙ্গে আপনজনের মায়াবী উত্কণ্ঠা উদ্বেগ মিশে থাকত। এই ডট.কম-এর যুগে সে সুযোগও নেই। আমি হয়তো কপালকুণ্ডলার কপালিক যুগের মানুষ, কিংবা জীবনানন্দের ভাষায় পৃথিবীর সমান বয়সী মেয়ে একা ভুল করে এই টাচ স্ক্রিনের চ্যাটিং-এর যুগে চলে এসেছি। কিন্তু মনের মধ্যে সর্বদাই পরিযায়ী এক পাখি মন্ত্র জপে—‘হেথা নয়, হেথা নয়, অন্য কোথাও, অন্য কোন খানে।’ এই অনুভূতি থেকেই অনুমান করি প্রত্যেক অভিবাসীর জীবনেই আছে এক অদ্ভুত স্ববিরোধিতা। হয়তো তাদের রক্তের মধ্যেই মিশে আছে অনিশ্চিত আত্মপরিচয়ের এক ভয়ানক সংকট। দেশের তিক্ত অভিজ্ঞতা আর ভেঙে খান খান স্বপ্নের কোনো একটি টুকরোকে সঙ্গে নিয়ে এক অবসাদগ্রস্ত মন আর বিচিত্র বিবিধ ঝুঁকি নিয়ে লোকে দেশ ছাড়ে। কিন্তু বিমূর্ত দার্শনিকের মতো বলতে পারছি না, যতদূর তোমার চিন্তা পৌঁছায় ততদূর পর্যন্ত তোমার দেশ।
লন্ডনে এসে প্রথমেই মনে পড়ে, তাদের বাহ্যিক বৈভবের পেছনে যে ঔপনিবেশিকতার কালিমা রয়েছে, তা আমার পূর্বপুরুষের পিঠে রক্তজবার মতো ক্ষত তৈরি করেছিল। এই যে পিকাডেলী সার্কাস, ট্রাফালগার স্কয়ার, বাকিংহাম প্যালেস, ব্রিটিশ মিউজিয়াম, হাইড পার্ক, পার্লামেন্ট ভবন, টাওয়ার অব লন্ডন, ওয়েস্ট মিনিস্টার এ্যাবে- এর প্রতিটি ইটে ইটে লেখা আছে অত্যাচার আর অবিচারের ব্লেডিং শোষণ। এখানকার অভিজাত আর রাজ-রাজড়াদের সিংহাসনে আরোহণের অভিষেক, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া—এই সব নানা কিছু মিলিয়েই তো ওয়েস্ট মিনস্টার এ্যাবে।
এর মধ্যে কোন কারণটি এই স্থানটিকে ঐতিহাসিক মর্যাদা দিতে পারে? দাস হিসেবে যারা আমাদের চমত্কার ভেবেছে তাদেরই তো সমাধি এটা! এরাই আমাদের দিয়ে যেমন খুশি কাজ করিয়ে নিতে চেয়েছিলেন। একাদশ শতাব্দীতে এডওয়ার্ড দ্য কনফেসর একে আবার সদম্ভে প্রতিষ্ঠা করেন। মানে এই এ্যাবে কে আর কী। ১৯৬৬ সালে উইলিয়াম দ্য কনকারার প্রথম অভিষিক্ত হন এখানে। ১৯৫৩ তে রাণী এলিজাবেথ। হেনরি দ্য থার্ড থেকে জর্জ দ্য সেকেন্ড। ইংল্যান্ডের অধিকাংশ রাজা-রাণীই এখানে সমাধিস্থ। মানে শোষণের ইতিহাসের সমাপতন আর কী!! অবশ্য রাজা-রাণী ছাড়াও কতিপয় ভাগ্যবান বীর ইংরেজের ভাগ্যে জুটেছে আধিপত্যবাদীদের সঙ্গে সমাধিস্থ হবার বিরল সন্মান। আর সেই বিরল সন্মানেরই নিমিত্তে তৈরি হয়েছে বহু মনুমেন্ট। চ্যাপেলসহ এ্যাবের দৈর্ঘ্য পাঁচশ ফুটের ওপর। সমাধি নয়, সমাধির ইতিহাস তো নয়ই বরং আমরা যারা এই ইতিহাসের শোষণের অংশের ভুক্তভোগী তাদের টানতে পারে ভিতরের স্থাপত্য সৌন্দর্য। ১৯২০ সালে ফ্রান্স থেকে আনামা সৈনিকের মরদেহ এনে এখানে সমাধিস্থ করে প্রথম মহাযুদ্ধের দশ লক্ষ মৃত ব্রিটিশ সৈন্যের প্রতি সন্মান দেখানো হয়েছে। বেলজিয়ামের কালো মার্বেল পাথরে লেখা রয়েছে সেই ইতিহাস। দেখা গেল, ঐতিহ্য সংরক্ষণের বিস্তর আয়োজন আর ব্যবস্থা। ব্রিটেনকে বোধ হয় মিউজিয়ামের শহর বলা যেতে পারে। ইতিহাস আর ঐতিহ্যকে নানান মাত্রায় সংরক্ষণের এই মনস্তত্ত্বের পেছনের কারণ কী? বহুমাত্রিক উপায়ে বিশ্ববাসীর কাছে যাতে তাদের শোষণের গুমর ফাঁস না হয়ে যায়, সেজন্য নিজেদের বীর প্রতিপন্নের অকৃপণ চেষ্টা?
ব্রিটেনকে তার রক্তাক্ত ঔপনিবেশিক ইতিহাসের দায়ভার এখনও বহন করতে হচ্ছে না বটে কিন্তু কে জানে ভবিষ্যতে তা হবে না? শুধু ইতিহাস কেন? বর্তমানও তো প্রবঞ্চনার। এখানে ট্রাক স্যুট পরে কোন শ্বেতাঙ্গ দৌড়ালে পুলিশ ভাবে জগিং করছে আর কালো মানুষ দৌড়ালে ভাবে ছিনতাই করে পালাচ্ছে!
লেখক : কথাসাহিত্যিক
