অনেক তো হলো, আর কত, এবার মন টানছে শেকড়ের পানে। ভাল করে মনে নেই কবে, কখন বাবা-মার হাত ধরে শহরমুখী হয়েছিলাম। আমাদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করার মানসে তারা ভিটে-মাটি ছেড়ে শুধুমাত্র শিক্ষাগত যোগ্যতাকে পুঁজি করে শহরবাসী হয়েছিলেন। তারপর থেকেই তাদের ভাড়াটিয়া হয়ে জীবন শুরু। কত চড়াই-উত্রাই পেরিয়ে আমাদের সুশিক্ষিত করে গড়ে তোলা, আর এজন্য উপার্জনের শেষ কড়িটি পর্যন্ত ব্যয় করে তারা হয়েছিলেন রিক্ত-নিঃস্ব। অঢেল উপার্জন ছিল না বিধায় বাড়ি-গাড়ি কিছুই করতে পারেননি এই জীবনে। আমরা যখন কালের পরিক্রমায় প্রবেশ করলাম সংসার জীবনে, শিক্ষাজীবন শেষ করে, ছড়িয়ে পড়লাম কর্মক্ষেত্রের টানে নানান শহরে, আমাদেরও লক্ষ্য স্থির ছিল সন্তানের সুশিক্ষার দিকেই। কিছুটা অপরিণামদর্শিতা, আর্থিক টানাপোড়েন ও সুযোগের অভাবে আমাদের মত অনেকেই শহরে জীবনের একটা দীর্ঘ সময় পার করে দিলেও পায়ের নিচের মাটি শক্ত করতে পারিনি। সম্পদের পাহাড় গড়তে পারিনি, সন্তানের ভবিষ্যত্ গড়ে দিয়েছি যতটুকু সাধ্য ছিল তা দিয়ে। এভাবে চলতে চলতে কখন যে বেলা পড়ে গেল, বুঝতেই পারিনি, হঠাত্ দেখি অবসরের ঘন্টা বাজতে আর বেশি দেরি নেই। এমনি এক মুহূর্তে এক অন্য ধরনের ভাবনা মনে এসে ভিড় করল। ভাবলাম, অবসর-পরবর্তী বাকি জীবনটা আমরাতো আমাদের গ্রামের বাড়ির শান্ত পরিবেশে কাটাতে পারি। জানি সন্তানরা আমাদের এ ভাবনায় প্রথমটায় সায় দেবে না, হয়তো তাদের কাছে রাখতে চাইবে, কিন্তু কেন জানি আর ঐ ব্যস্ততম শহরের আধুনিকতা আমাদের ধূসর মনকে টানতে পারছে না। মনটা কেবলই চাইছে একটি ছায়া-সুশীতল শান্ত নীড়। যে নীড়টি আমরা আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে গড়ে তুলব। যেখানে শহরের দূষিত ও দুর্গন্ধময় পরিবেশ ও উচ্চ কোলাহল পৌঁছাবে না।
আমরা মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ, আমাদের আয় কখনই ব্যয়ের রেখা অতিক্রম করতে পারে না। হয়তো হিসেব করে চলি বলে ঋণগ্রস্ত হই না, কিন্তু বড় বড় দালান-কোঠা নির্মাণের ক্ষমতা আমাদের নেই। তাই ভাবছি অবসর-পরবর্তী প্রাপ্ত অর্থের কিছুটা দিয়ে যদি কিছুটা মানসম্মত একটি বাড়ি তৈরি করতে পারি, যেখানে আমাদের শেকড় রয়েছে, তাহলে বোধহয় মন্দ হবে না সেটা। ইটের দেয়ালবেষ্টিত একটি ছোট্ট দ্বিতল বাড়ি, মাঝে ছাদের বদলে কাঠের পাটাতন, শুধু ছাদ হবে সামনের বারান্দাটুকুর উপর, যেটি হবে আমাদের স্বপ্নের খোলা বাতায়ন, যেখান থেকে আমরা সুনির্মল আকাশ দেখবো, বৃষ্টি কিংবা জ্যোত্স্নায় হবো স্নাত। চারপাশের টবে লাগানো সুগন্ধী ফুলের সুবাস নেবো। আমাদের প্রতিটি কক্ষের দেয়ালে গাঁথা সাদামাটা আলমারিগুলোর কোনটিতে থাকবে বই, কোনটিতে থাকবে বাসন-পত্র, কোনটিতে বা খাদ্য-সামগ্রী। আর রান্নাঘরটি হবে প্রশস্ত এবং আলো-বাতাস পূর্ণ। পুরো বাড়িটার চারদিকে থাকবে উঁচু দেয়ালের বেষ্টনী, বেষ্টনীর ভেতরে একটি খোলা চত্বরে থাকবে একটি গভীর নলকূপ, যেটি মটরের সাহায্যে আমাদের পানি দেবে।
খোলা বাতায়নের পূর্বপাশে থাকবে আমাদের ঠাকুরঘর, যেখানে সকালে ও সন্ধ্যায় আমরা পরম করুণাময়ের নাম নেবো, তাঁর মহিমা কীর্তন করবো। ঘর গুছানোর পর আমি নেমে আসবো মাটিতে, বাড়ির অন্যান্য শরীকদের সাথে সমঝোতা ও সমন্বয় করে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো করে যাবো। যেসব পুকুর, ডোবা বা বাড়ি সংলগ্ন খাল, যেগুলো নোংরা ও অপরিচ্ছন্ন হয়ে আছে, সেগুলো সবাই মিলে সংস্কার করে পরিকল্পিত উপায়ে সেখানে মাছ চাষ করব, হাঁস-মুরগি ও কবুতরের খামার গড়ে তুলব। সবজি লাগাবার উপযোগী স্থানগুলো খুঁজে বের করে সেখানে সুশৃংখলভাবে নানা ধরনের সবজি লাগাব সবাই মিলে। আমাদের টার্গেট থাকবে, আমরা বাড়িতে যত শরীক আছি, তারা কেউ মাছ-তরকারি-ডিম কিনে খাবো না। নিজেরা পরিশ্রম করে চাষ করবো, উপযুক্ত পারিশ্রমিক দিয়ে শক্ত-সমর্থ লোক নিয়োগ করবো, যাকে দিয়ে আমরা কয়েকটি গরুও পালন করতে পারি। যা থেকে আমরা দুধ পাব, আবার গোবর দিয়ে বায়োগ্যাস তৈরি করে তার সুফল ভোগ করতে পারব।
পরিশেষে বলছি সব কথার সারকথা—আর তাহলো, এভাবে যদি আমরা একটি গ্রামকেও আদর্শ গ্রাম হিসেবে পরিণত করতে পারি, তাহলে একদিন সারা বাংলাদেশের সমস্ত গ্রামই আমাদের কর্মে, আমাদের আদর্শে উজ্জীবিত হবে, আর তার উজ্জ্বল আভায় সমগ্র বাংলাদেশই আলোকিত হয়ে উঠবে।
লেখক:প্রভাষক, প্রাণীবিদ্যা বিভাগ,
বাউফল কলেজ, পটুয়াখালী
[email protected]
