আমি আপনাকে ছোট্ট একটা পরামর্শ দিতে চাই। সম্ভবত বহু ধরনের আবেগের তীব্রতা এ মুহূর্তে আপনার চিন্তা ও চেতনাকে ভোতা করে রেখেছে—সন্দেহ নেই যে আপনি রেগে আছেন, হয়তো আতঙ্কিতও। এমন সময় পার করার জন্য অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয় আর প্রয়োজন হয় অবজেক্টিভ থিঙ্কিং। এ বাবদে আপনাকে আমার কিছু দেয়ার আছে। চোখে পড়বে কি না জানি না।
আমি আপনাকে ছোট্ট একটা পরামর্শ দিতে চাই— হয়তো আপনার কাজে দেবে। খুব অল্প বয়সে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ এক ক্রসরোডসে এসে দাঁড়িয়েছেন আপনি। হয়তো আপনার মন বলছে যে ক্রিকেট বোর্ডকে এবার একটা শিক্ষা দেয়া দরকার কিন্তু মাথা বলছে শাস্তিটা মেনে নিই। যাই করুন না কেন আপনার জীবন আর আগের মতো থাকবে না—এটা প্রায় নিশ্চিত। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, যাদের আপনার পাশে থাকার কথা ছিলো তাদের অনেকেই আপনার শত্রু এবং খুব ক্ষমতাবান শত্রু। ঘাবড়াবেন না, খুব ঠান্ডা মাথায় অনেকক্ষণ ধরে চিন্তা করুন। কেবল একটা প্রশ্নের উত্তরই আসলে আপনাকে জানতে হবে। নিজেকে প্রশ্ন করুন— ব্যাপারটা কি আসলে এরকম যে আপনার বাংলাদেশ ক্রিকেটের সাথে থাকা জরুরি না আপনি মনে করছেন যে বাংলাদেশ ক্রিকেটের আপনাকে প্রয়োজন?
এই সামান্য প্রশ্নের চোখা উত্তরই শুধু পারে আপনাকে সঠিক রাস্তা দেখাতে। খোলা মনে চিন্তা করুন। যদি আপনি মনে করেন যে বাংলাদেশ ক্রিকেটের আপনাকে প্রয়োজন— আমি আপনাকে পরামর্শ দেবো যে আজই আপনি রিটায়ার করুন, ক্রিকেট বোর্ডের সাথে সব ধরনের সম্পর্ক চুকিয়ে অন্য কোনো দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করুন এবং আগামী ৭-১২ বছর সর্বোচ্চ চেষ্টা করে সর্বোচ্চ উপার্জন করুন। আমি আপনার চেয়ে বয়স ও অভিজ্ঞতায় একটু বড়, তাই বলছি— কঠিন বাস্তবতা হলো জীবনের বেশিরভাগ সময় আসলে আপনি ক্রিকেট খেলবেন না এবং সেই সময় এখনও শুরুই হয়নি আপনার। সেই লম্বা সময়ে বহু প্রশ্ন আপনাকে কুড়ে কুড়ে খাবে— বিশ্বাস করুন সময়টা সহজ হবে না। আপনি যদি মনে করে থাকেন যে বাংলাদেশের আপনাকে প্রয়োজন, সারা জীবন আপনি বাংলাদেশে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য পস্তাবেন। মনে রাখবেন আপনার প্রতিভা আছে আর প্রতিভার কোনো ন্যাশনাল জার্সি হয় না। বাংলাদেশ যদি আপনার মেধার মূল্যায়ন না করে অন্য কেউ করবে সেটার জন্য প্রস্তুত থাকুন। প্রতিভা প্রস্ফুটিত না হওয়ার চেয়ে প্রতিভা নষ্ট হওয়ার বেদনা বহুগুণ বেশি। এই বেদনা নিয়ে মধ্য বয়স এবং বার্ধক্য পার করা খুব কঠিন হবে। কোনো গ্লানি, কোনো দুঃখ, কোনো নৈতিকতার চাপ বোধ না করে বাংলাদেশ ক্রিকেটের সাথে সম্পর্ক চুকিয়ে ফেলুন এবং অন্য কোনো দেশে দ্রুত থিতু হোন, সেখান থেকেই ক্রিকেট শুরু করুন।
যারা ক্রিকেটকে ভালোবাসার কারণে আপনাকে ভালোবেসে ছিলো তারা আপনার বাস্তবতা বুঝবে—তারা আজ আপনার ফ্যান, কালও আপনার ফ্যানই থাকবে। আর যদি মনে করেন যে না আপনার নিজের প্রয়োজন বাংলাদেশ ক্রিকেটকে এবং এই প্রয়োজন সত্যিই প্রবল, কেবল সেক্ষেত্রেই যুদ্ধ শুরু করুন। সামনে আপনার জীবনে প্রচুর সময়, আবেগ ও জীবনীশক্তি ব্যয় হবে একেবারে অনর্থক কারণে। এর পা ধরতে হবে, ওকে বস বলতে হবে। খুব নগণ্য মানুষদের হুজুর হুজুর করতে হবে, আবার অনেক সাধুর সাথেও বোঝাপড়া করতে হবে মিডিয়ায়। রাজনীতিবিদরাও হয়তো আপনার অবস্থার সুযোগ নেবে—সেগুলোও ডিল করতে হবে। কাজগুলো নোংরা এবং ডিহিউম্যানাইজিং। এই অনর্থক অপচয়ের সাথে আপনার নিজের হূদয়ের বোঝাপড়া শুধু তখনই সম্ভব হবে যখন আপনি মনে করবেন যে বাংলাদেশ ক্রিকেটকে আপনার নিজের খুব প্রয়োজন। এই বোঝাপড়াটা খুব জরুরি, সাকিব।
আপনি যদি প্রশান্ত না হতে পারেন মনের দিক থেকে, অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে দশ রানে দশ উইকেট নিলেও আপনার জীবনের কোনো তাত্পর্য থাকবে না। শুধু মনে রাখবেন, বাংলাদেশ ক্রিকেট কিংবা বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের চেয়ে বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আপনার নিজের মনের শান্তি ও নিজের প্রতিভা। বাংলাদেশ আরেকটা সাকিব খুঁজে পেলেও পেতে পারে কিন্তু আপনি যে আরেকটা জীবন খুঁজে পাবেন না সেটা নিশ্চিত। তাই আপনার নিজের সুখী হওয়াটা জরুরি। আপনি কারো ক্রীতদাস না এবং বাংলাদেশ ক্রিকেটের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার মানে এই না যে বাংলাদেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা। এই পাপবোধ থেকে মুক্ত হয়ে ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করুন, হয়তো কাজে দেবে।
লেখক :গবেষক, দ্য জন কার্টিন স্কুল অব মেডিক্যাল রির্সাচ, ক্যানবেরা, অস্ট্রেলিয়া
