আলোকপাত

আর যেন উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে না পড়ে

আপডেট : ১২ জুলাই ২০১৪, ২১:৩৯
বছর দুই আগের কথা। আমি এবং আমার এক সহকর্মী অফিসের গাড়ি ধরার জন্য রাস্তার পাশে একটা ছোট কাঠবাদাম গাছের সামান্য ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকতাম। গাড়ি আসলে চলে যেতাম। গাছটা ছিল একটা মসজিদের দেয়ালের সঙ্গে লাগোয়া। একদিন আমার সহকর্মীটি নেই, আমি একা দাঁড়িয়ে আছি। প্রচণ্ড রোদ্দুর। খুব চেষ্টা করছিলাম ছায়া অনুযায়ী দাঁড়াতে। এমন সময় একজন লোক এসে আমাকে বললো — ‘এখান থেকে সরে দাঁড়ান।’ প্রথমে আমি কথাগুলো বুঝতে পারিনি। দ্বিতীয়বার যখন বললো, তখন তার মর্মার্থ খুব ভালো করেই বুঝতে পারলাম। সঙ্গে সঙ্গে মন বিদ্রোহ করে উঠলো — কী এমন অপরাধ করেছি আমি? মেয়েমানুষ, তাই? মসজিদ অপবিত্র হয়ে গেছে? কাজেই আমি যেমন ছিলাম, তেমনই দাঁড়িয়ে রইলাম। এরপর লোকটা বেশ কিছুক্ষণ আমাকে নিরীক্ষণ করে চলে গেল। কিন্তু পরদিন সকালে এসে যখন গাছটার নিচে দাঁড়াতে যাচ্ছি, তখন দেখি গাছটা সম্পূর্ণ ন্যাড়া। অর্থাত্ তার শাখা-পল্ল¬ব সব ছেঁটে দেয়া হয়েছে। কোথাও ছায়া নেই। আমি হতভম্ব হয়ে গাছটার দিকে তাকিয়ে আছি — হায় গাছ, কার দোষে কে মার খায়? আমি যদি জানতাম, আমার কারণে তোর এই পরিণতি হবে, তাহলে কখনই তোর ছায়ায় আশ্রয় নিতাম না। ধর্মের নামে যারা এ ধরনের ভণ্ডামি করে, গ্রাম দেশে তাদেরকে বলা হয় কাঠমোল্ল¬া। ধর্মের বহিরঙ্গ নিয়ে অহংকারী এসব কাঠমোল্ল¬াদের দৌরাত্ম্য সমাজ থেকে যে এখনও ফুরিয়ে যায়নি, এটা তারই প্রমাণ। আমি অবশ্য ধান ভানতে শিবের গীত গাইছিনে। ঘটনাটা মনে পড়ে গেল বর্তমানে প্রশ্ন ফাঁস রোধে যেসব ব্যবস্থা গ্রহণের কথা ভাবা হচ্ছে, তার একটি সম্পর্কে অর্থাত্ ছাত্রদের পরীক্ষার মাঝে যে বিরতিগুলো থাকতো, তা বন্ধ করে দেয়া প্রসঙ্গে। যারা প্রশ্ন ফাঁস করে, তাদের বিরুদ্ধে কোন শাস্তির ব্যবস্থা নেই, উল্টো শাস্তি পাবে ছাত্ররা। ঐ গাছটার ন্যাড়া হয়ে যাওয়ার মতো নয় কি? সব ছাত্রই তো নকল করে পরীক্ষা দেয় না বা সব ছাত্রই প্রশ্ন ফাঁস হওয়া প্রশ্ন দিয়েও পরীক্ষা দেয় না। তাহলে এদের জন্য এই সুবিধাটুকু কেন থাকবে না ? যারা প্রশ্ন ফাঁস করে, তারা কি এতই শক্তিশালী? তারা কি প্রশাসনের চাইতেও বড়? শিক্ষামন্ত্রীর হাতে কি ঢাল-তলোয়ার কিছুই নেই? মোকাবেলা করতে এতই অপারগ? যে-কারো জন্য এটা অত্যন্ত লজ্জার বিষয়। আমরা অভিভাবক হিসেবেও লজ্জিত। আমরা আমাদের সন্তানদের একটি নিরাপদ ও নিরুদ্বেগ শিক্ষার পরিবেশ দিতে পারছিনে, পারছিনে নতুন কোন আশার আলো দেখাতে। যে শিক্ষাকে বলা হয় জাতির মেরুদণ্ড, তার গোড়াতেই যদি এই গলদ থাকে, তাহলে সে জাতির ভবিষ্যত্ চিন্তা করতেও ভয় হয়। আজকাল বিজ্ঞাপন দিলে প্রয়োজনীয় সংখ্যক যোগ্য প্রার্থী পাওয়া যায় না। তার কারণও এই গলদ। বাধ্য হয়ে অযোগ্য দিয়েই কাজ চালাতে হয়। ফল কী হয়, তা অনুমান করা কঠিন নয়। ছাত্রদের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় শেষ হয়ে গেছে কিনা, তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও এটা তো সত্যি যে, এমন কিছু সংখ্যক ছাত্র আছে, যারা অত্যন্ত মেধাবী। সুযোগ পেলে তারা পারে না এমন কোন কাজ নেই। দেশ-বিদেশ সর্বত্র তাদের পদচারণায় মুখরিত। তাদের যথাযথভাবে লালন করে সামনের দিকে এগিয়ে দিতে হবে। অন্তত যারা পড়ে পাশ করতে চায়, তাদেরকে সেই পরিবেশ দিতে হবে। প্রত্যেক পরীক্ষার মাঝখানে ন্যূনতম একদিন বিরতি রাখা অত্যাবশ্যক। অবশ্যই শিক্ষামন্ত্রীকে এ বিষয়টি স্মরণ রাখতে হবে। যাহোক, আমরা আশা করবো, এদেশে আর প্রশ্ন ফাঁস হবে না। ছাত্ররা আর বিভ্রান্তিতে পড়বে না, হতাশায় ভুগবে না। এরজন্য চাই শুধু একটু সদিচ্ছা। সদিচ্ছা থাকলে যে-কোন কাজে সফলতা অর্জন সম্ভব। আর না থাকলে যতো রকম কৌশল বা ডিজিটাল কৌশলই অবলম্বন করা হোক না কেন, তা ব্যর্থ হতে বাধ্য। আমাদের শিক্ষামন্ত্রী নিশ্চয়ই কাঠমোল্লাদের স্বগোত্রীয় নয়। শুধু শিক্ষার বহিরঙ্গ নয়, অন্তরঙ্গভাবেই অন্তরঙ্গ। শিক্ষা কী? নকল কী? প্রশ্ন ফাঁস কী? প্রশ্ন ফাঁসের ফলাফল কী? ছাত্রদের সুবিধা-অসুবিধা কী? তাদের জ্ঞানের জগেক প্রসারিত করতে হলে এবং দেশের প্রকৃত নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হলে কী ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা প্রয়োজন — আমরা সেটুকুরই প্রত্যাশী। এর মধ্যে অবশ্য শিক্ষামন্ত্রী কথা দিয়েছেন, তিনি ছাত্রদের পরীক্ষার মাঝের বিরতি বন্ধ করবেন না। এতে আমরাও আশাবাদী, তিনি তার কথা রাখবেন। শুধু পরীক্ষার মাঝে বিরতি দিলেই চলবে না, সেইসঙ্গে নকল বন্ধ, প্রশ্ন ফাঁস বন্ধ একটি উপযু্ক্ত পরিবেশ দেখতে চাই। লেখক:সহকারী অধ্যাপক, ভাষা-যোগাযোগ ও সংস্কৃতি বিভাগ, গণবিশ্ববিদ্যালয়, সাভার, ঢাকা

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন