১১ জুলাই সন্ধ্যা ৭টা। সবে ইফতারের আজান পড়েছে। বরিশালের উজিরপুর বাজারে সবাই তখন ইফতার নিয়ে ব্যস্ত। রাস্তার পাশে টেম্পু, বেবী, রিকশা চালকরা আছেন যাত্রীর অপেক্ষায়। হঠাত্ যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাজারের ভেতরে ঢুকে পড়লো। হানিফ পরিবহনের বেপরোয়া গতির বাসটি পথচারী, দোকানি, যানবাহন চাপা দিয়ে রাস্তার পাশে খাদে পড়ে। এতে ১৭ জন নিহত ও কমপক্ষে ৩০ জন আহত হয়েছেন। কী মর্মান্তিকই না এ মৃত্যু! নিষ্প্রাণ ১৭টি মুখ। ওদের গোটা শরীর জুড়ে রক্তে মাখামাখি। কারো মুখ, কারো হাত-পা থেতলে গেছে। শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পাশেই পরে আছে কোন অঙ্গ। মৃত্যু অমোঘ। কিন্তু এভাবে? এমন দৃশ্য খুবই বেদনাদায়ক। এ যেন প্রতিকারহীন নিয়তি! নিত্যকার ঘটনা। গা সওয়া ঘটনা! ঘটছে, দেখছি আমরা; প্রতিকার পাচ্ছি না। কিন্তু কেন? এজন্য কি সরকারের মোটেও দায় নেই?
এতোগুলো মানব সন্তানের এমন অস্বাভাবিক মৃত্যু কি মেনে নেয়া যায়? দুর্ঘটনা প্রতিনিয়তই ঘটছে; ঘটবেও। কিন্তু একটা অস্বাভাবিক? কেন তা রোধ করা যাচ্ছে না? আইনের সঠিক প্রয়োগ না থাকায় দেশে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। প্রশ্ন হলো এসব দুর্ঘটনার ‘স্রষ্টা’ কে? মূলত বেপরোয়া গতির গাড়ি। গাড়ি চালায় কে? মানুষই! অতএব মানুষরূপী দানবদের কেন রোধ করা যাচ্ছে না? আইনের প্রয়োগ হলে; আমাদের ট্রাফিক, বিআরটিএসহ সংশ্লিষ্টরা যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করলে; জনগণ সচেতন হলে অনেকাংশেই দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব। কিন্তু কার কথা কে শোনে। পয়সা পেয়ে সবাই একদম চুপ্। নগদি নারায়ণে সবার মুখেই কুলুপ আটা থাকে। এসব রুখতে হবে? যে কোনো মৃত্যুই দুঃখজনক। সে মৃত্যু যদি অকাল ও আকস্মিক হয়, তবে তা মেনে নেয়া আরো কঠিন। প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনার কবলে পড়ে একের পর এক অকালমৃত্যু আমাদের শুধু প্রত্যক্ষই করতে হচ্ছে না, এ দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে এক বিভীষিকাময় ও অরাজক পরিস্থিতিও মোকাবিলা করতে হচ্ছে, যা আমাদের কারো কাছেই কাম্য নয়। এর আগে জাতীয় সংসদে অনভিজ্ঞ ও অল্পবয়স্ক হেলপার বাস-মিনিবাস চালানোর ফলে দুর্ঘটনা ঘটে বলে জানালেন যোগাযোগমন্ত্রী। তিনি বলেন গাড়ির সংখ্যা যেহারে বাড়ছে সেহারে দক্ষ চালক বাড়ছে না। ফলে সড়ক দুর্ঘটনায় অনেক অমূল্য প্রাণ অকালে ঝরে যাচ্ছে আমাদের জীবন থেকে।
সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানোর ঘটনা যেমন আমাদের ব্যথিত করে, তেমনিভাবে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে চরম অরাজক পরিস্থিতির উদ্ভবও আমাদের মর্মাহত ও স্তম্ভিত করে। আমরা এর আগেও বহুবার লক্ষ্য করেছি, সড়ক দুর্ঘটনায় কোনো ব্যক্তি নিহত বা আহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে নিহতের ঘনিষ্ঠজন এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার কিছু লোক রাস্তায় নেমে রাস্তা অবরোধ, হামলা, গাড়ি ভাংচুর, অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে এক বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি করেন। এতে কার কী উপকার হচ্ছে তা আমাদের জানা নেই। তবে এর ফলে চরম দুর্ভোগে পড়েন সাধারণ ও নির্দোষ জনগণ যারা কোনোভাবেই এ দুর্ঘটনার সঙ্গে জড়িত নয়। যে কোনো হত্যার বিচার আমরা চাই, তবে কোনো হত্যা বা দুর্ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশের জন্য বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা আমাদের সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়াক তা আমরা চাই না।
এক গবেষণায় দেখা যায়, নানা কারণে দেশে প্রতি ১০ হাজার মোটরযানে ১০০টি ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটছে। উন্নত দেশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী এক হাজার মোটরযানে দুই দশমিক পাঁচ ভাগ থেকে তিন দশমিক পাঁচ ভাগ। অন্যদিকে আমাদের বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রতি এক হাজার যানবাহনে ১৬৩ জন দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন। বুয়েটের এক্সিডেন্ট রিসার্স ইনস্টিটিউট (আইআরআই) পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিবছর ১২ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হচ্ছে। নিহতের ৮০ শতাংশের বয়স পাঁচ থেকে ৪৫ বছর। নিহতদের মধ্যে ৫৩ শতাংশ পথচারী। যাদের ২১ শতাংশের বয়স ১৬ বছরের নিচে। দুর্ঘটনায় আহত ১৫ শতাংশ লোক মারা যায় ঘটনার ১৫ মিনিটের মধ্যে। দেশে ১৬ লাখ রেজিস্টার্ড গাড়ি রয়েছে আর লাইসেন্স পাওয়া ড্রাইভার রয়েছে মাত্র ১০ লাখ। ৪ লাখ ড্রাইভারের ঘাটতি রয়েছে। সুতরাং ড্রাইভিং ট্রেনিং দেয়া ও তাদের জন্য লাইন্সেসের দরকার আছে। তা নাহলে প্রতিনিয়তই এভাবে অকাতরে ঝরবে আমাদের প্রাণ।
নিয়ম ভেঙে সামনের গাড়িকে ওভারটেক করতে যাওয়া, অদক্ষ ড্রাইভারের হাতে গাড়ি চালানোর দায়িত্ব ছেড়ে দেয়া, ড্রাইভারের অনুপস্থিতিতে হেলপারের গাড়ি চালানোর উদ্যোগ গ্রহণ, গাড়ির ফিটনেস পরীক্ষা না করেই রাস্তায় গাড়ি নামানো, দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে শাস্তির আওতায় না আনা এবং সর্বোপরি ট্রাফিক আইন না মানার কারণেই একের পর এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেই চলেছে। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে পরিবহন মালিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকে সমন্বিত আন্তরিক, সচেতন, দৃঢ় ও দায়িত্বশীল ভূমিকা আমরা আশা করি।
লেখক : সাংবাদিক
ই-মেইল[email protected]
