মশার নূতন কৌশল ও ম্যালেরিয়া

আপডেট : ১৩ জুলাই ২০১৪, ২১:৪২
‘মশা মারিতে কামান দাগানো’র কথাটি যতই ‘সামান্য কাজে ব্যাপক কর্মপন্থা’কে নির্দেশ করুক, মশার কারণে ফি-বত্সর বিশ্বে যত সংখ্যক মানুষের মৃত্যু ঘটে, যত সংখ্যক মানুষ রোগশয্যায় শায়িত থাকেন—তাহার পরিসংখ্যান আমাদের চমকাইয়া দেয়। বর্ষাকাল মশক বংশবৃদ্ধির উর্বর সময়। আর ম্যালেরিয়ার প্লাজমোডিয়াম পর্বের জীবাণুরাও তাহাদের জীবনচক্র সম্পূর্ণ করিবার মোক্ষম সুযোগ পায় এই সময়ে। জীবাণুর এই জীবনচক্রের অংশ হইয়া মানুষের জীবনও বিপন্ন হইয়া ওঠে। সমপ্রতি বাংলাদেশের পূর্ব সীমান্তবর্তী ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পাঁচটি জেলায় মহামারী আকারে ম্যালেরিয়া দেখা দিয়াছে। সেখানে মৃতের সংখ্যা তিন ডিজিটে পৌঁছাইয়াছে। ত্রিপুরার সীমান্তবর্তী বাংলাদেশের জন্য এই ব্যাপারে রেড অ্যালার্ট জারি করা হইলেও আমাদের প্রধান নজর দিতে হইবে মশার বংশবিস্তার রোধের দিকে। রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি জেলায় ম্যালেরিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা হ্রাস করিবার প্রকল্পে জুমচাষিদের মধ্যে ম্যালেরিয়া প্রতিরোধক জ্যাকেট বিতরণ করা হইলেও কিংবা কীটনাশকযুক্ত মশারির ব্যবহার বৃদ্ধি করিলেও তাহা সাময়িক ব্যবস্থা মাত্র। তাহার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেহায়েত্ সামান্য নহে। মশককুলকে প্রতিহত করিতে বহুজাতিক কোম্পানিদেরও রহিয়াছে কোটি কোটি ডলারের ব্যবসা। কিন্তু এইসব কোনো কিছুই প্রকৃত সমাধান নহে। মশার বংশবৃদ্ধির অনুকূল পরিবেশ বহাল রাখিয়া ম্যালেরিয়া বা ডেঙ্গুকে ঠেকাইয়া রাখা অসম্ভব। ম্যালেরিয়াকে প্রতিরোধ করিতে ব্যর্থ হইয়া ওষুধ দ্বারা রোগ প্রতিকারে মৃত্যুর লাগাম কিছুটা টানিয়া ধরা সম্ভব হইলেও মূল বিষয়টি প্রতিরোধের। আর সেই প্রতিরোধের বিষয়ে নূতন আশঙ্কার কথা জানা গিয়াছে। তাহা হইল মশার জিন পরিবর্তন। প্রকৃত চিত্র বলিতেছে, ম্যালেরিয়া কিংবা ডেঙ্গুর কাছে আমরা কার্যত ‘অসহায়’। যেটুকু ‘সহায়’ আমরা সচেতনতার মাধ্যমে পাইতে পারি, প্রতিরোধ করিতে পারি অ্যানোফিলিস (ম্যালেরিয়ার জন্য দায়ী) বা এডিস (ডেঙ্গুর জন্য দায়ী) মশার বংশবিস্তার—সেই ‘সহায়’টুকু হারাইয়া যায় মশার নূতন নূতন কৌশলে। আমরা যদি মশা নিধনে চলি ‘ডালে ডালে’ মশককুল চলে ‘পাতায় পাতায়’। সত্তরের দশক পর্যন্ত এই উপমহাদেশ এবং অন্য দেশসমূহে ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণের অন্যতম হাতিয়ার ছিল ডিডিটি। ডিডিটি ছড়াইয়াই ষাটের দশকে ভারতীয় উপমহাদেশকে ম্যালেরিয়ামুক্ত করা সম্ভব হইয়াছিল। সত্তরের দশকের পর নিয়মিত ডিডিটি ছড়াইবার পরও ম্যালেরিয়া ফিরিয়া আসিতে থাকে। শুধু এই উপমহাদেশই নহে, আফ্রিকা এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশেও ম্যালেরিয়া ফিরিয়া আসে প্রবলভাবে। তাহার কারণ অত্যন্ত উদ্বেগের। চিকিত্সা বিজ্ঞানীরা জানাইলেন, জিন পরিবর্তন করিয়া অ্যানোফিলিস মশা দিব্যি তাহাদের মারণবাণ ডিডিটি’কে হজম করিয়া ফেলিতেছে! বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইহার পর ডিডিটি-এর ব্যবহার বন্ধ করিয়া দেয়। কী আশ্চর্য, পরবর্তীকালে ডিডিটি-র পরিবর্তে কীটনাশক পাইরেথ্রয়েডও মশককুলকে দিব্যি হজম করিয়া ফেলিতে দেখা গেল! জিনগতভাবে পরিবর্তিত করিয়া জিএম মশা বলিয়া এক ধরনের মশা ছাড়া হইল, যাহারা বন্ধ্যা। এবং তাহাদের সংস্পর্শে আসিয়া বন্ধ্যা হইবে মশকবংশও। কী বিচিত্র! তবে ইহাও খুব বেশি সাফল্যের মুখ দেখিল না। ফলত, ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি মুখ থুবড়াইয়া পড়িল বিভিন্ন দেশে। ম্যালেরিয়া ফিরিয়া আসিল তাহার পুরাতন মারণরূপ লইয়া। মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হিসাবে এইবার মশার অনুকূলে রহিয়াছে বিশ্বের জলবায়ুর পরিবর্তন। গবেষকরা দেখিতে পাইয়াছেন, সমপ্রতি বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাইবার কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠ হইতে উঁচুতে অবস্থিত এলাকাসমূহেও ম্যালেরিয়া ছড়াইয়া পড়িতেছে। এমন আশঙ্কার কথাও বলা হইয়াছে, তাপমাত্রার এহেন বৃদ্ধি অব্যাহত থাকিলে ম্যালেরিয়ামুক্ত কিছু কিছু অঞ্চলেও ভবিষ্যতে লাখ লাখ বাড়তি মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হইতে পারে। সুতরাং ‘মশা মারিতে কামান দাগাইবার’ অর্থাত্ নূতন কার্যকর উপায় বাহির করা ভিন্ন অন্য পথ নাই।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন