আলোকপাত

রমজান ও দ্রব্যমূল্য

আপডেট : ১৩ জুলাই ২০১৪, ২১:৪৩
রমজান মাসের রোজা উপলক্ষে যে অতিরিক্ত বিশেষ কেনা-কাটার ধুম লেগে যায় তা-ই আমাদের দেশে রোজার বাজার বলে পরিচিত। রমজান মাস আসার দুই তিন সপ্তাহ আগে থেকেই এদেশের জনগণের এক বিরাট অংশ অতিরিক্ত জিনিজপত্র বা ভোজনসামগ্রী অতিমাত্রায় ক্রয় করা শুরু করেন। এসব ভোজন-বিলাসী কর্মকাণ্ড দেখে মনে হয় রোজা একটি ভোগের মাস। রোজাকে আমরা পালন করছি, আহ্বান করছি দৃশ্যত ভোগ্যসামগ্রী দিয়ে। বস্তুত রোজা একটি গোপন ইবাদত। এজন্য আল্লাহ নিজ হাতে এর পুরস্কার দিবেন বলেও ঘোষণা এসেছে পবিত্র কুরআনে। কিন্তু এই অপ্রকাশ্য সিয়াম সাধনার বিষয়টি দেখা যায় না। তাই রমজানকে কে কীভাবে পালন করছেন তা জানা সম্ভব নয়। কিন্তু রোজার জাহেরী দিক অর্থাত্ প্রকাশিত আচরণ হিসেবে যে বিষয়গুলো দেখা যায় তার মধ্যে অধিকাংশ মানুষের বাজারে হুমড়ি খেয়ে পড়া, সব কিনে ফেলতে হবে, এমন ধরনের কাণ্ড-কারখানা অন্যতম। কেউ কিনছে, কেউ কেনার চেষ্টা করছে। আবার কেউ আক্ষেপ করছেন। এই হচ্ছে রমজানের বাজার চিত্র। কিন্তু কেন? রমজানের বাজারের সাথে অন্য মাসের বাজারের তেমন পার্থক্য থাকবে কেন? পার্থক্য তেমন থাকার কথা নয়। অন্তত কাঁচাবাজার নিয়ে থাকার কথা নয়। পোশাক-পরিচ্ছদের বাজারে কিছু আলোড়ন থাকতে পারে। কিন্তু রোজার সময় বিশেষ কিছু খাদ্য খাওয়া কিন্তু ফরজ বা ওয়াজিব নয়। অন্যদিকে সুন্নত বলে যে সকল খাবার খাওয়া হচ্ছে— তাও অনেকটা ভুল ব্যাখ্যার শিকার। যেমন—খেজুর দিয়ে ইফতারি করা অত্যন্ত ভালো বলে আমাদের দেশে এক ধরনের প্রচারণা আছে। কেননা এটি নবীজী (স.) করেছেন। কিন্তু এটা ভেবে দেখতে হবে তিনি কোথায় বসবাস করতেন। আরব দেশের প্রধান সুপ্রাপ্ত ফল হলো খেজুর। রসূল (স.) যদি তাই দিয়ে ইফতার করে থাকেন তাহলে আমাদের দেশেও যা সুপ্রাপ্য, সহজলভ্য এবং কমদামী তা দিয়েই ইফতার করা শ্রেয়। এর সাথে দেশীয় সংস্কৃতির কিছু মন্দ দিকও যোগ হয়। যেমন—বেগুনি, পিঁয়াজু, ছোলা ইত্যাদি খেতেই হবে—এগুলোও কি সুন্নত? পৃথিবীর কোন দেশে এমন বাধ্যবাধকতার পর্যায়ের মত খাদ্যাভ্যাস আছে কিনা আমার জানা নেই। প্রিয় পাঠক হয়তো ভাববেন আমি নিজে এগুলো খাই না। তা কিন্তু নয়, আমিও এই সংস্কৃতির শিকার। তবে একে বাধ্যবাধকতার পর্যায়ে আমি নিতে চাই না। এবং তা নেয়া উচিত নয় বলেও আমি মনে করি। আমার নীতি হল:“মধ্যভ্যাবে গুরং দেদং” মধু যদি দুষ্প্রাপ্য হয়, তাহলে গুড় দিয়েই কাজ চালিয়ে নিতে হয়। বেগুনের বাজারে আগুন। আসুন বেগুন থেকে দূরে থাকি। রোজা নষ্ট হবার কোন সম্ভাবনা নেই। পিঁয়াজু, ছোলা ইত্যাদি ভাজা-পোড়া এমনিতেই শরীরের জন্য মঙ্গলজনক নয় বলে চিকিত্সকরা মনে করেন। তাহলে বেশি দাম দিয়ে এগুলো কিনে লাভ কী? আমরা অনেকেই অন্যান্য মাসে বিকালবেলা বা সন্ধ্যাবেলায় কম-বেশি নাস্তা করে থাকি। সেক্ষেত্রে আমরা কিন্তু কোন নির্দিষ্ট আইটেমের বাধ্যবাধকতা দেখাই না। তাহলে, রমজান মাসের ইফতারকে এরকম ভিন্ন ভিন্ন পরিবর্তনশীল আইটেম দিয়ে এ্যারেঞ্জ করলে ক্ষতি কী? আমরা ক্রেতাসাধারণ অত্যন্ত সচেতনভাবে যদি ঐ বিশেষ কিছু পণ্য ক্রয় যথাসম্ভব এড়িয়ে যেতে পারি বা একান্তই পর্যাপ্ত মাত্রায় গ্রহণ করতে পারি তাহলে বাজারের ওপর অনাকাঙ্ক্ষিত চাপ সৃষ্টি হবে না। অসত্ ব্যবসায়ীরাও অমূলকভাবে মূল্যবৃদ্ধি করার সুযোগ পাবে না। “রমজান মাসে যত খুশি খাওয়া যাবে, খাবারের কোন হিসাব দিতে হবে না”। এমন একটি কথা সমাজে প্রচলিত আছে। কিন্তু এটি কোন শরীয়তসম্মত কথা নয় অর্থাত্ হাদীস, কুরআন দ্বারা এ ধরনের কথা সমর্থিত নয়। মধ্যপ্রাচ্যসহ অধিকাংশ মুসলিম দেশে রমজান উপলক্ষে বিশেষভাবে প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রীর মূল্য কমে। সে সকল দেশের ব্যবসায়ীরা রমজানে রোজাদারদের সেবা দিতে চেষ্টা করেন। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি হলো সারাবছর ব্যবসাতো করিই একটি মাস অন্তত ব্যবসার চাইতে সেবাকে প্রাধান্য দেই। ধর্মীয় নৈতিক মূল্যবোধ থেকে তারা এমন করে থাকেন। আমাদের দেশে নৈতিক মূল্যবোধ কমছে পক্ষান্তরে বাড়ছে পণ্যমূল্য। এখানে মূল্যবোধ নয়, মুনাফা অর্জনের কলাকৌশলই অধিকাংশ ব্যবসায়ীর সামগ্রিক চেতনা জুড়ে বিরাজ করে। লেখক:দর্শনের শিক্ষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, চেয়ারম্যান, অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রাকটিক্যাল এথিক্স [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন