রাজনীতির বর্তমান হালচাল

আপডেট : ১৪ জুলাই ২০১৪, ২১:২০
খুব সহজ করে রাজনীতি নিয়ে একটি কথা বলতে ইচ্ছা করছে। রাজনীতির বর্তমান হালচাল দেশের জন্য সুখকর নয়। রাজনীতি এখন শুধু রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করেই শান্ত থাকছে না, বরং সমাজের সকল দিকই নিয়ন্ত্রণ করছে। এমনটা হওয়াতে দেশ বেশি করে বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। রাজনীতি যদি শুধু রাজনীতির জায়গায় থাকতো, তাহলে তার সমস্যা নিয়ে অতটা বিচলিত হওয়ার প্রয়োজন ছিল না পুরো সমাজের। কানাডা ও অষ্ট্রেলিয়ার রাজনীতি নিয়ে সেখানকার পুরো সমাজ বিচলিত হয় না। শুধু যারা রাজনীতির সঙ্গে জড়িত তারাই সেখানে রাজনীতির ভালমন্দ নিয়ে ভাবে এবং বিচলিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি বেশ বিস্তৃত এবং শক্তিশালী। কিন্তু তারপরও সেখানে রাজনীতি দখল করতে পারেনি সমাজের অন্য জায়গাগুলো। দক্ষিণ এশিয়ার ভারত, পাকিস্তান কিংবা শ্রীলংকাতে রাজনীতির প্রকাশ শক্তিশালী হলেও সেই দেশগুলোর রাজনীতির বিস্তৃতি বাংলাদেশের মতো এতোটা বিস্তৃত নয়। বাংলাদেশে মূলত: ধর্মের প্রভাবের পরই রাজনীতির প্রভাবের বিষয়টি দৃশ্যমান। গত কয়েক দশক ধরেই বাংলাদেশের রাজনীতি দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলের হাতে বন্দি হয়ে আছে। এক দলের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ এবং অন্য দলের নেতৃত্বে বিএনপি। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পাকিস্তান আমলেই অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিশালী রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছিল। আতাউর রহমান, ভাসানীর মতো প্রভাবশালী নেতাদের পিছনে ফেলে বাঙালির নেতৃত্ব তুলে নেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। বঙ্গবন্ধুর জনপ্রিয়তার ঢেউয়ে তত্কালীন আওয়ামী লীগের অবস্থান হয়ে পড়েছিল বাঙালির একমাত্র মঞ্চ হিসাবে। স্বাধীনতার স্বপ্নে লালিত বাঙালি জাতি তাদের স্বপ্ন পূরণের অবলম্বন হিসাবে বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগকে খুঁজে নিয়েছিল। এ কথা বললে অযুক্তি হবে না যে, আওয়ামী লীগই বাঙালিকে সর্বাত্মকভাবে রাজনীতি করতে শিখিয়েছিল। তাদের স্লোগান ‘জয় বাংলা’ বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের স্লোগানে পরিণত হয়েছিল এবং এই স্লোগান পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসাবে কাজ করেছিল। বঙ্গবন্ধুর পর আওয়ামী লীগের দুর্দিনের এক সময়ে এর হাল ধরেন বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা। ভাঙ্গা-গড়ার মধ্য দিয়ে সেই আওয়ামী লীগ বর্তমান সময় পার করছে। বিএনপির নির্বাচন বর্জনটি সরকারকে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করার ক্ষেত্রে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছিল। এটা মেনে নিয়েও অন্তত এটুকু বলা যায়, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করার বিকল্প রাজনৈতিক পথ খুঁজে বের করার গবেষণায় তখন সরকার কিংবা আওয়ামী লীগ সময় ব্যয় না করে বরং জাতীয় পার্টির এরশাদকে নিয়ে খেলায় সময় ব্যয় করতেই বেশি পছন্দ করেছে। রওশন এরশাদের নেতৃত্বাধীন বিরোধী দল সংসদে আছে কিনা তা অনেক সময়ই অনুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে দেখতে হয়। জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া বিএনপির রাজনৈতিক চর্চা যেটুকু হয়েছে তার সবটুকুই জিয়াউর রহমানের সময়েই হয়েছে। জিয়াউর রহমানের পর বেগম জিয়া ডিজিটাল পদ্ধতিতে বোতাম টিপেই দলীয় প্রধান এবং সরকার প্রধান হয়েছেন। কখনও তার রাজনীতি করার প্রয়োজন ছিল না। কেননা বিএনপি খালেদা জিয়ার হাতে এসে জেনারেল জিয়ার রেখে যাওয়া জনপ্রিয়তা এবং আওয়ামী লীগের প্রতি নেগেটিভ ভোটের জোরেই সবসময় সমুদ্র পার করে দিয়েছে। ঠিক রাজনীতি করে খালেদা জিয়ার বিএনপি কখনও জনগণের কাছে যেতে পারেনি। তারা যে রাজনীতি করার সংগঠন নয়, সেই প্রমাণই এবার তারা দিল। আওয়ামী লীগ সরকারের শক্ত অবস্থানের কাছে তারা তাদের রাজনীতি নিয়ে মাঠে নামতে পারেনি একবারও। পরপর পাঁচটি সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে ভাল ফল করেও বিএনপি ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে ব্যর্থ হল। তারা না পারল নির্বাচনটি ঠেকাতে, না পারল নির্বাচনে অংশ নিতে। এটা তাদের রাজনীতি জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল। পরবর্তীতে তারা সরকারের বিরুদ্ধে মাঠের রাজনীতি দূরে থাকুক, ঘরোয়া রাজনীতি করতেও ব্যর্থ হল। সরকারের রাজনৈতিক কৌশলের কাছে তারা রীতিমত ধরাশায়ী হয়ে পড়ল। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির রাজনীতির বর্তমান হালচাল তুলে ধরলাম; অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের উল্লেখ করলাম না। কেননা দেশে অনেক রাজনৈতিক দল থাকলেও দেশের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করার শক্তি শুধু আওয়ামী লীগ এবং বিএনপিরই আছে। স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিকে দূরে সরিয়ে নেয়ার জন্য এই দু’টি রাজনৈতিক দলই সবচেয়ে বেশি দায়ী। স্বাভাবিক রাজনীতির সুযোগ না থাকলে রাজনীতি সচেতন মানুষের দেশ বাংলাদেশের ভবিষ্যত্ অন্ধকারে ছেয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংগঠনগুলো এবং রাজনৈতিক কমিটিগুলো শুধু রাজনীতি করে না, বরং অনেক ক্ষেত্রে রাজনীতিবিদদের থেকেও বেশি রাজনীতি করে এদেশের সরকারি কর্মকর্তা, আইনজীবী, সাংবাদিক, শিক্ষকসহ সকল ধরনের পেশাজীবী। আর এই অবস্থার ফলে দেশের শহর থেকে গ্রাম-গঞ্জের সকল মহলেই রাজনীতির পক্ষ-বিপক্ষ বিদ্যমান। রাজনীতিপাগল এমন একটি দেশে স্বাভাবিক এবং সুস্থ রাজনীতির চর্চা না থাকলে পুরো সমাজটিই অসুস্থ হবে এটাই স্বাভাবিক। যে দু’টি রাজনৈতিক দলের সুস্থ রাজনীতি উপহার দেয়ার দায়িত্ব ছিল সবচেয়ে বেশি, তারা দু’জনেই পাল্লা দিয়ে অসুস্থ রাজনীতি উপহার দিচ্ছে। আর আশঙ্কার জায়গাটি ঠিক সেখানেই। লেখক: সাবেক সেনা কর্মকর্তা [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন