অবশেষে সাঙ্গ হইল ক্রীড়া বিশ্বের বৃহত্তম মিলনমেলার। শেষ হইল ফুটবল তীর্থ ব্রাজিলে ফুটবলেরই মহোত্সব—ফিফা বিশ্বকাপ, ২০১৪। একমাস পূর্বে সাও পাওলো শহর হইতে যে উত্সব শুরু হইয়াছিল, রবিবার রিও ডি জেনেরিওতে আলোক উত্সবের মধ্য দিয়া তাহা সমাপ্ত হইল। ৩২টি দলের হাসি-উচ্ছ্বাসের মাধ্যমে যে বিশ্বকাপ যাত্রা শুরু করিয়াছিল, একটি দলের বিজয়োত্সব ও অপরটির স্বল্পের জন্য না পাওয়ার কান্নার মধ্য দিয়া তাহার পরিসমাপ্তি ঘটিল।
বিশ্বকাপ শেষ হইল বটে, ফুরাইল না। ফুটবল বিশ্বকাপের বিশালত্ব এই যে, ইহা চার বত্সরে একবার আয়োজিত হয়; তবে বাকি চার বত্সর ধরিয়া তাহার রেশ থাকিয়া যায়। মাত্র এক মাসের এই টুর্নামেন্টে কে কতো গোল করিলেন, কে সফল হইলেন, কে প্রত্যাশা পূরণ করিতে পারিলেন না, কে মন কাড়িয়া লইলেন; এসব বিষয়ের চুলচেরা বিশ্লেষণ চলিবে অনাগত বছরগুলিতেও। এভাবেই চার বত্সরের পরিক্রমায় চলিতে থাকিবে নূতন নূতন বিশ্বসেরার সন্ধান। এভাবেই শেষ হইয়াও চলিতে থাকিবে বিশ্বকাপ। এই চলমান বিশ্বকাপের আপাত শেষ হইল বর্তমান বিশ্বের অন্যতম যোগ্য দল জার্মানির বিশ্ব শিরোপা জয়ের মধ্য দিয়া। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সফল এই দলটি তাহাদের ঐহিত্যবাহী গতিময় নৈপুণ্যের পাশাপাশি এবারে শৈল্পিক প্রদর্শনী দ্বারাও মুগ্ধ করিয়াছে ফুটবল বিশ্বকে। তাহাদের এই বিশ্বকাপ জয় কেবলই জার্মানদের এক জয় নয়; ইহা যেন ফুটবলেরই এক অসামান্য বিজয়!
এই বিশ্বকাপ যেমন দেখিল বিজয়ীদের আনন্দোত্সব; তেমনই মাস জুড়িয়া পরাজিতের কান্না দেখিল। ব্রাজিলের মতো সর্বকালের সেরা ফুটবল দলের কান্না, নেদারল্যান্ডসের মতো ধারাবাহিক দলের আরও একটি অশ্রুপাতের সাক্ষী হইল বিশ্ব। বিশ্ববাসী হতবাক হইয়া দেখিল আগের আসরেরই সেরা দল স্পেন, ফুটবলের জনক ইংল্যান্ড এবং আরেকটি সফল দল ইতালির প্রথম পর্ব হইতেই বিদায়। তাহাদের এই অপ্রত্যাশিত ও অসময়ের বিদায়ে সারা বিশ্বই ব্যথিত হইয়াছে। ব্যথিত হইয়াছে আর্জেন্টিনার শেষ লগ্নের পরাজয় দেখিয়াও। দীর্ঘকাল পর এই ঐতিহ্যবাহী দলটি ফাইনালে উঠিয়া শিরোপার স্বপ্ন দেখিতেছিল। তাহাদের সেরা খেলোয়াড়, বর্তমান পৃথিবীর অন্যতম সেরা ফুটবলার লিওনেল মেসি এবারের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার পাইলেও পুড়িলেন বিশ্বকাপ না পাইবার যন্ত্রণায়।
এই সকল না পাওয়ার বিপরীতে অনেক অপ্রত্যাশিত ও প্রত্যাশিত পাওয়ার উপাখ্যানও দেখিল বিশ্ব। কলম্বিয়ার জেমস রদ্রিগেজ সর্বোচ্চ গোলদাতা হইলেন, জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসা আরেক কিংবদন্তী ব্রাজিলের রোনালদোর গোলের রেকর্ড ভঙ্গ করিলেন, ছোট ছোট দলের বড় বড় গোলরক্ষকদের উত্থান ঘটিল। মোটের উপর হাসি-কান্নায় কাটিয়া গেল আনন্দে ভরপুর একটি মাস। সারা বিশ্বের মতোই, অথবা বিশ্বের কোনো কোনো দেশের তুলনায় অধিক উত্তেজনায় এই বিশ্বকাপ অতিবাহিত হইল বাংলাদেশে। মূলত ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সমর্থনে বিভক্ত এই বাংলাদেশে জার্মানি, ইতালি, ফ্রান্স, স্পেনের সমর্থকবৃন্দও কম আনন্দ করেন নাই। যদিও বাংলাদেশ ফুটবল দল অদ্যাবধি বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে পৌঁছানোর লড়াইয়েই মগ্ন; তথাপি এই আয়োজনে বাংলাদেশি সমর্থকদের আনন্দের কমতি ছিল না।
কিন্তু এই বিশ্বকাপ কী কেবলই আনন্দ আর উচ্ছ্বাসের আয়োজন? তা নয়। আয়োজক সংস্থা ফিফাই বলিয়া থাকে, বিশ্বকাপ হইলো সারা বিশ্বের মানুষকে এক ফুটবলসূত্রে বাঁধিবার আয়োজন। বলা হইয়া থাকে, ফুটবল এক সর্বজনীন ভাষা। যাহা কিনা পৃথিবীর সকল প্রান্তের মানুষকে দেশ ও কালের সীমা ছাড়াইয়া একাকার করিয়া দিতে পারে। সেই ভাষার অনুপমতম প্রদর্শনী বিশ্বকাপ যে পৃথিবীকে একত্রিত করিবে, তাতে সন্দেহ কী!
