আপন দর্পণ

বাজলো কিরে ভোরের সানাই

আপডেট : ১৪ জুলাই ২০১৪, ২২:০৭
একটি নিলে আরেকটি পাবেন, অনায়াসে কোন শ্রম বা অর্থ নয়, অপার্থিব অলৌকিক। দূরদর্শনের পর্দায় চোখ গেলো ‘Buy one, get another free’ কি পাচ্ছি এতো সহজে। দেখলাম, একটি সোনার লকেটে একটি নাম। জানি আল্লাহেক পাওয়া খুব সহজ, খালিস দিলে সুবহান আল্লাহ্, আলহামদুলিল্লাহ্ লা ইলাহা মন্ত্রটি আল্লাহ্র প্রিয়। বিশুদ্ধচিত্তে জপ করলেই তিনি চলে আসেন বান্দার অতি কাছে, চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাই তাঁকে, মনের জানালায় তাঁর নিত্য আসা-যাওয়া। তিনি তাঁর রহমতের অংশ হিসেবে সৃষ্টি করেছেন বান্দাকে, তারই জন্যে কুলমাখলুক, তারই জন্যে চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা অগণিত নক্ষত্র, বনের সবুজ আকাশের নীল সমুদ্রের পানি সুমধুর ফল সবই তো তার উপভোগের জন্য। এখানে ক্রয়-বিক্রয় নয়, তাই আমরা একটা কিনে আরেকটা ফ্রিতে নেয়ার নীতিতে বিশ্বাসী নই। যখন দেখি হীরা খচিত সোনার একটি লকেটের বিজ্ঞাপনে উপরোক্ত কথাটি জ্বলজ্বল করছে সোনালী অক্ষরে তখন মনটা কেমন করে ওঠে। এতো আমাদের জন্য নয়, কার জন্য ভাবতে ভাবতে বিনিদ্র রজনী গেলো। গত ক’দিন বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনায় উত্তাল হয়ে উঠেছিল বাঙালি। সেই সুদূর ব্রাজিল, যেন পাশের বাড়ির মাঠ, সবুজ ঘাস গ্যালারীতে বসা অগণিত দর্শক সবই যেন আমরা। ভাষা এক নয়, কখনো স্প্যানিশ, কখনো ফ্রেঞ্চ, কখনো জার্মান, কখনো পর্তুগীজ, তবু বুঝতে অসুবিধে হয় না। মন যেখানে এক, ভাষা সেখানে কোন বাধা নয়, বর্ণ সেখানে কোন আড়াল নয়, কালো সাদা বাদামী খয়েরি সব রঙের মানুষ একই রসে জারিত, সে রস ফুটবলপ্রেমের রস। অন্যান্য বছর রমজান আসে শুধু সিয়ামের বার্তা নিয়ে, আনন্দ উত্সব তখন ম্লান, দিনের বেলা রেষ্টুরেন্টগুলো বন্ধ, পথের পাশে দাঁড়িয়ে কেউ কচি ডাব হাতে পানি পান করেন না, ধুমপান করেন না, পানের রসে টুকটুকে লাল ঠোঁট নিয়ে দাঁড়ান না। একটি শিশুও জানে রোজার দিনে বাইরে কিছু খেতে নেই, এতে যে পবিত্র মাসটির প্রতি সম্মান দেখানো হয় না। এ বছরের রমজানের দিনগুলো আনন্দের ফুলঝুরি ঝরাতে থাকলো, মধ্যরাতে শুরু হয় ওয়ার্ল্ড কাপ, তাতে কি, সারাদিন ভর থাকে তার রেশ, কতো কথা কতো তর্ক-বিতর্ক, কতো বাজি রাখা, যেন আমরা সকলেই উপস্থিত ব্রাজিলের মারাকানা ষ্টেডিয়ামে। ব্রাজিলকে আমার মনে হয় অনেক আপন, বাড়ির কর্তা আব্বাসী সাহেব যখন রোটারি জেলার ডিষ্ট্রিক্ট গভর্ণর ছিলেন তখন রোটারি ইন্টারন্যাশনালের প্রেসিডেন্ট পাওলো ভি সি কস্টা ছিলেন ব্রাজিলের লোক। সদা হাস্য মুখ অত্যন্ত প্রাণবন্ত লোক, দেখা হলেই বলে উঠতেন How are you, my singing governor. সেদিন গত হয়ে গেছে অনেক দিন, কিন্তু তাঁর কণ্ঠ তাঁর সৌজন্য তাঁর স্নেহ এখনো অনুভব করি ব্রাজিল শব্দটি শুনলেই। আসল কথা মনের মাধুরী বিলিয়ে দেয়া, অন্যজনের জন্য দয়ার হাত বাড়িয়ে দেয়া। রাস্তায় বেরুলে যে ভিক্ষুক শ্রেণির সঙ্গে দেখা হয়, তারা তো আমাদেরই মতো দু’টো হাত দু’টো পা দু’টো চক্ষু দু’টো কর্ণের মানুষ। বিভেদ কোথায়, অতি তুচ্ছ একটি জিনিসে সে হলো অর্থ। কেউ বড়লোক, কেউ বা গরীব, কারো ঘরে পোলাও কোর্মা, কারো ঘরে পান্তা ভাত, কেউ ছুটছেন শপার্স ওয়ার্ল্ডে ঝকমকে শাড়ির সন্ধানে, কারো বা পরনে ছেঁড়া শাড়ি। লেইটেষ্ট ডিজাইনের স্যু কারো সন্তানের বায়না, অন্যজন ছেঁড়া স্পঞ্জের স্যান্ডেল পরে হাঁটছেন। ইসলাম বলে সকলের তরে মোরা সবাই সুখ দুঃখ সমভাগ করে নেবো সকলে ভাই কবি নজরুলের রচিত এই অমূল্য বাণীর অর্থ অনুধাবন করে নিজেকে বদলে নেয়ার দিন আজ। আসুন না লাইলাতুল কদরের আগেই আমরা বদলে নেই নিজেকে। লেখক :শিক্ষাবিদ-সাহিত্যিক [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন