পলিথিনের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হইয়াছিল একযুগেরও বেশি সময় আগে। কিন্তু যথারীতি সেই নিষেধাজ্ঞা বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরোতে পরিণত হইয়াছে। পলিথিন শুধু যে সদম্ভে ফিরিয়া আসিয়াছে তাহাই নহে, সেইসাথে পরিণত হইয়াছে শাঁখের করাতে। পলিথিনের পরিবেশ-বিধ্বংসী ভয়ঙ্কর রূপটি বিশ্বব্যাপী সুপরিচিত। পলিথিনের বিনাশ নাই। পানিতে পচে না। মাটিতে মেশে না। ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষের ব্যবহূত বিপুল পরিমাণ পলিথিনের আগ্রাসনে নগরীর নালা-নর্দমা ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হইয়া পড়িতেছে বার বার; সৃষ্টি হইতেছে জলাবদ্ধতার। নদীর তলদেশে পলিথিনের দীর্ঘ আস্তর জমিয়া ইতোমধ্যে মৃতপ্রায় হইয়া পড়িয়াছে বুড়িগঙ্গাসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ বহু নদী। একই কারণে উর্বরতা হারাইতেছে চাষযোগ্য বিস্তর জমি। ইহাই সব নহে। একদা বাংলার সোনালি আঁশ নামে পরিচিত বাঙালির গর্বের ধন পাটেরও গলার ফাঁসে পরিণত হইয়াছে এই পলিথিন। সৈয়দপুর হইতে ইত্তেফাক সংবাদদাতা জানাইয়াছেন যে, প্লাস্টিক ও পলিথিনজাত বস্তার দাপটে স্থানীয় ৪টি ক্ষুদ্র পাটকল বন্ধ হইবার উপক্রম হইয়াছে। ভুক্তভোগী একজন পাটকল মালিক জানাইয়াছেন যে, তাহাদের তৈরি পাটজাত বস্তার ক্রেতা নাই। ফলে উত্পাদন অর্ধেকে নামাইয়া এবং শ্রমিক ছাঁটাই করিয়াও লোকসান ঠেকানো যাইতেছে না। সারা দেশের চিত্রও যে ভিন্ন নহে তাহা না বলিলেও চলে।
অথচ সরকারের নীতি ও অবস্থান সুস্পষ্ট। প্লাস্টিক বা পলিথিনের বস্তা বা ব্যাগ ব্যবহারে যেমন নিষেধাজ্ঞা রহিয়াছে, তেমনি পাটজাত পণ্য প্রসারে রহিয়াছে প্রণোদনামূলক নানান উদ্যোগ। পাটের পক্ষাবলম্বন করিবার যৌক্তিক কারণও রহিয়াছে। শতভাগ পরিবেশবান্ধব হওয়ায় পৃথিবী জুড়িয়াই পাটের কদর বাড়িতেছে। আর আমাদের ক্ষেত্রে ইহার যে অন্যরকম একটি মাত্রা রহিয়াছে—তাহাও সুবিদিত। ঐতিহ্যগতভাবে পাটের সহিত আমাদের নাড়ির বন্ধন। যেই কৃষক মাথার ঘাম পায়ে ফেলিয়া পাট উত্পাদন করেন, যেই শ্রমিক পাটজাত পণ্য তৈরি করেন এবং যেই শিল্পোদ্যোক্তা বিপুল অংকের অর্থ বিনিয়োগ করেন এই খাতে—তাহাদের সকলের জীবন-জীবিকার প্রশ্ন জড়াইয়া আছে ইহার সাথে। অতএব, পলিথিন বর্জন এবং পাটজাত পণ্য ব্যবহারের প্রশ্নে জাতি হিসাবে আমাদের বিন্দুমাত্র শৈথিল্য প্রদর্শনের কোনো অবকাশ নাই। কিন্তু বাস্তবে সেই আত্মঘাতী প্রবণতারই প্রদর্শনী চলিতেছে দেশের সর্বত্র। অথচ ইহার বিরুদ্ধে জনসচেতনতা তৈরির উদ্যোগও তেমন দৃশ্যমান নহে।
আগেই বলা হইয়াছে যে, পলিথিনবিরোধী আইন আছে কিন্তু আইনের প্রয়োগ হইতেছে না। পরিবেশবাদীদের অভিযোগ হইল, পুলিশ ও প্রশাসনের নাকের ডগায় রাজধানীর লালবাগ ও মোহাম্মদপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অবাধে চলিতেছে পলিব্যাগের উত্পাদন। আর পুলিশের কর্মকর্তারা বলিতেছেন, এই ব্যাপারে আইনত তাহাদের তেমন কিছুই করিবার নাই। কাজটি পরিবেশ অধিদপ্তরের। বিদ্যমান আইনের কিছু ফাঁকফোকর যে আছে তাহা অস্বীকার করিবার উপায় নাই। মূলত সেই ফাঁকফোকর কাজে লাগাইয়াই নানা কৌশলে চলিতেছে পলিব্যাগের যথেচ্ছ উত্পাদন, বিপণন ও ব্যবহার। এইসব ফাঁকফোকর অবশ্যই বন্ধ করিতে হইবে। নিষিদ্ধ করিতে হইবে সবধরনের প্লাস্টিক ও পলিথিনজাত বস্তা ও ব্যাগের ব্যবহার। পাশাপাশি, অবকাঠামোগত ও মনিটরিং-এর ক্ষেত্রেও যে ব্যাপক দুর্বলতা রহিয়াছে তাহাও অস্বীকার করিবার উপায় নাই। এই দুর্বলতা দূর না করিয়া যতো কঠোর আইনই করা হউক না কেন—তাহাতে কাজ হইবে বলিয়া মনে হয় না।
