তৈরি পোশাক শিল্পের অন্যতম ব্যস্ত এলাকা সাভারে বকেয়া বেতন ও ঈদ বোনাসের দাবিতে কয়েকটি কারখানায় শ্রমিক আন্দোলন চলিতেছে। প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, কর্মবিরতির একপর্যায়ে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের লোকজনের সহিত সাধারণ শ্রমিকদের সংঘর্ষ বাঁধিয়া যায়, যাহা সামাল দিতে রীতিমত হিমশিম খাইতে হয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। গার্মেন্টস শিল্পে এই ধরনের ঘটনা অবশ্য ইহাই প্রথম নহে। ঈদ সামনে রাখিয়া এইরূপ ঘটনা প্রায় প্রত্যেক বত্সরই ঘটিয়া থাকে। লক্ষ্যণীয় যে, শ্রমিকদের প্রাপ্য বেতন-ভাতাদি প্রদান করিবার ক্ষেত্রে অনিয়ম করিয়া থাকে—এমন শিল্প প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা খুব বেশি নয়। কিন্তু আন্দোলন শুরু হইলে তাহা শুধু এক বা একাধিক প্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেও আন্দোলন ছড়াইয়া পড়িতে দেখা যায়। অনেকক্ষেত্রে আন্দোলন সহিংসরূপ পরিগ্রহ করিয়া থাকে। তুলনামূলক বিচারে ভাল এবং নিয়মমাফিক চলিতেছে—এমন কারখানাতে আন্দোলন-সংগ্রামের আঁচ লাগা অসম্ভব নহে। ঈদ সমাগত, এই সময় শ্রমিকদের বেতন-ভাতার জন্য আন্দোলন করিতে হইতেছে—ইহা সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক।
তৈরি পোশাক শিল্প দেশের স্বল্প শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বিরাট ভূমিকা রাখিয়া চলিয়াছে। বিগত বিশ বত্সরে কুড়ি লক্ষাধিক লোকের শ্রম সংস্থান হইয়াছে এই শিল্পখাতে, এই সংখ্যা ভবিষ্যতে আরও বাড়িবে নিঃসন্দেহে। দেশের জিডিপিতেও গার্মেন্টস শিল্পের অবদান বোধগম্য কারণেই অনস্বীকার্য। কেননা দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত এটি। কিন্তু এই খাতের শ্রমিকদের জীবনমান যে খুব একটা উন্নত হইয়াছে তাহা বলা যায় না। অস্বাস্থ্যকর আবাসন ব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় পুষ্টির অভাব এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার অভাব সম্ভাবনাময় এই শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিকদের নিত্যসঙ্গী। শ্রমিকদের এহেন করুণ অবস্থার নিরসনকল্পে একশ্রেণির শিল্প মালিক বরাবরই দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়া আসিতেছেন। শ্রমিক নিরাপত্তার এই নিম্নমান তাহাদের উত্পাদনশীলতা ও কর্মদক্ষতায়ও নেতিবাচক প্রভাব ফেলিতেছে। ইহাতে মালিকও যে কাঙ্ক্ষিত মুনাফা হইতে বঞ্চিত হইতেছেন, তাহা বলিবার অপেক্ষা রাখে না।
যেকোনো শিল্প-কারখানার উত্পাদন ও উত্পাদিত পণ্যের মান মালিক-শ্রমিক সম্পর্কের উপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। শ্রমিকের স্বার্থ যথাযথভাবে রক্ষিত হইলে তাহা যে ঐ প্রতিষ্ঠানের জন্যই মঙ্গল বহিয়া আনে তাহাতো আর নূতন কিছু নহে। অন্যদিকে, কোনো প্রতিষ্ঠান শ্রমিক বঞ্চনার যন্ত্রে পরিণত হইয়া পড়িলে আখেরে তাহা কোনো সুফল আনিয়া দেয় না। ঈদ উত্সবে শ্রমিকদের প্রাপ্য বেতন, বোনাস ও ছুটির ব্যাপারে বিশেষ প্রস্তুতি গ্রহণ করা যে কর্তৃপক্ষের অলঙ্ঘনীয় কর্তব্য তাহা ভুলিয়া গেলে চলিবে না। আবার সামান্য কারণে প্রতিষ্ঠানের ক্ষতিসাধনও কাম্য নহে। বিনিয়োগকারিগণ ইহাতে নিরুত্সাহিত হইতে পারেন যাহার সুযোগ লইতে পারে এই শিল্পের প্রতিযোগী অন্যান্য দেশ, সকল পক্ষেরই ইহা মনে রাখা দরকার। সম্ভাবনাময় এই শিল্পটিকে আগাইয়া নিতে মালিক, শ্রমিকসহ সবারই দায়িত্ব রহিয়াছে। প্রতিযোগিতামূলক এই শিল্পের বাজারে টিকিয়া থাকিতে হইলে ধৈর্য, সমঝোতা ও দায়িত্বশীলতার কোনো বিকল্প নাই। কাজেই যত দ্রুত সম্ভব বিদ্যমান এই অনিশ্চিয়তা দূর করিতে হইবে।
