বিবেক ও সুশাসন

আপডেট : ১৬ জুলাই ২০১৪, ২০:৪১
অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান যেমন মানুষের বাঁচার জন্য অপরিহার্য ও মৌলিক অধিকার, তেমনি অন্যায়, নির্যাতন, নিপীড়নের প্রতিকার হিসাবে বিচার পাওয়াও জনগণের মৌলিক অধিকার। দু’চার দিন কিছু না খেয়েও মানুষ বাঁচতে পারে কিন্তু অমানুষিক, বর্বর, ক্ষমার অযোগ্য অপরাধের বিচার না পেলে মানুষ মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে অগ্রসর হতে থাকে। তাই যুগে যুগে সমাজ ও রাষ্ট্র অপরাধের যথাযথ বিচার নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে কাজী, পঞ্চায়েত, আদালত, হাইকোর্ট, সুপ্রিমকোর্টে বিচারের ব্যবস্থা করেছে। রাষ্ট্র পুলিশ, র্যাব, সেনাবাহিনী দিয়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করে। সুশাসনের সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা হলো “দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালন”। তাই রাষ্ট্রের প্রথম ও প্রধান কর্তব্য হলো দুষ্টের দমন অর্থাত্ চোর-চামার, ডাকাত, সন্ত্রাসী, ছিনতাই, ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ, খুনীদের শাস্তি বিধান করা যাতে একজন অপরাধীর শাস্তি দেখে অন্যান্য অপরাধীরা ভয় পায় এবং অন্যায় কাজে বিরত থাকে। এ কাজে প্রথম ভূমিকা রাখে পুলিশ ও তাদের সহযোগী বাহিনী। পুলিশের হাতে যে ব্যাপক ক্ষমতা, আধুনিক অস্ত্র ও ডিজিটাল কলা-কৌশল পদ্ধতি দেয়া থাকে অপরাধীর হাতে তা থাকে না। পুলিশের ক্ষমতা বাস্তবে প্রয়োগ হলে ও অপরাধীরা সময় মতো যথাযথ শাস্তি হলে অপরাধীরা ভয়ে সন্ত্রস্ত থাকতো এবং অন্যায় অপরাধ করার পূর্বে দশবার ভাবতো। সব সরকারের আমলেই অপরাধ সংঘটিত হয়েছে এবং পুলিশী কার্যক্রম প্রয়োগ হয়েছে। তবে ইদানিং দেশে অপরাধের মাত্রা একটু বেড়ে গেলেও সে অনুপাতে পুলিশী একশন তাত্ক্ষণিক এবং কার্যকরভাবে বাড়েনি। তার অনেক কারণ থাকতে পারে যা আমরা সাধারণ জনগণ অবগত নই। তবে পুলিশকে ক্ষমতা প্রয়োগের স্বাধীনতা দেয়া হলে এবং প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ না হলে পুলিশ অসাধ্য সাধন করতে পারে। তার প্রমাণ সুড়ঙ্গ পথে সোনালী ব্যাংকের চুরি করা ষোল কোটি টাকা কয়েক ঘন্টার মধ্যে উদ্ধার করা। শুধু পুলিশ কেন প্রশাসনের প্রতিটি বিভাগে কিছু লোভী, সুযোগ সন্ধানী অথবা অদক্ষ কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকে। তারা প্রশাসনিক দুর্বলতা, জনগণের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে অবৈধ অর্থ উপার্জন করে। আর অদক্ষ চাকুরেগণ এদিকেও নেই, ওদিকেও নেই, কিন্তু প্রশাসনিক কঠোর শৃঙ্খলা এবং চাপ প্রয়োগ করলে, অদক্ষও দক্ষ হয়ে ওঠে, লোভী, দুর্নীতিবাজ পুলিশও অসাধ্য সাধন করতে পারে। এর প্রমাণ এ দেশে বহুবার মিলেছে। কিন্তু এটাতো নিয়ম নয়। রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি শাখা ও অংশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে যথাসময়ে নিজ দায়িত্ব পালন করলেই রাষ্ট্র দক্ষভাবে চলবে। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার খবর পেলেই পুলিশের কর্তব্য উপরের আদেশের অপেক্ষা না করে, মামলা রুজু হওয়ার অপেক্ষা না করে বা জনতার মানব বন্ধনের জন্য অপেক্ষা না করে সন্দেহজনক আসামিকে আটক করা । প্রত্যেকটি থানার নিজস্ব এলাকায় পুলিশের ক্ষমতা প্রয়োগ করা কর্তব্য। কারুর চাপে বা অর্থলোভের বশবর্তী হয়ে পুলিশ যদি তা করতে ব্যর্থ হয় তখনই রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ করা উচিত আর রাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করতে ব্যর্থ হলে তাকে ব্যর্থ রাষ্ট্রের বদনাম মাথা পেতে নিতে হয়। ইদানিংকালের কিছু খুন, গুম ও অপহরণের ঘটনায় পুলিশী এ্যাকশন সময় মতো হয়নি। মানুষ এখন আতঙ্কগ্রস্ত, ঘরে, বাইরে, কর্মক্ষেত্রে, জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে শংকিত। তাই সময় এসেছে পুলিশের বিবেক ও কর্তব্যপরায়ণতাকে জাগিয়ে তোলা। অপরাধীর জন্য একটি মৃত্যু ঘটানো সহজ, কিন্তু পুলিশের জন্য একটি জীবন বাঁচানোই কৃতিত্ব। পুলিশকে এখন জীবন বাঁচানোর বা স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি দেয়ার মহত্ কাজটি সম্পাদন করতে হবে। কিছু কিছু জঘন্য অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে যা সচরাচর হয় না, একটি বাচ্চাকে খুন করে তার দু’টি কিডনি শরীর থেকে কেটে নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা, এ কুকর্মের সংগে জড়িত স্বয়ং অর্থলোভী কসাই ডাক্তার যার কাজ জীবন বাঁচানো। ধর্ষণকারী বাচ্চার মাকে ধর্ষণ করতে ব্যর্থ হয়ে মাকে ও বাচ্চাকে খুন করার চেষ্টা করে, তাতে মা বেঁচে যায় কিন্তু সন্তান মৃত্যুবরণ করে। পরকীয়ার খারাপ দৃশ্য দেখে ফেলেছে বলে মা নিজের বাচ্চাকে গলাটিপে মেরে ফেলে। নেশাখোর নেশার টাকা না পেয়ে মা-বোনের গলাটিপে ধরে। ব্যবসায়ী খাদ্যপণ্যে বিষ ও ভেজাল মিশিয়ে ধীরে ধীরে মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এসব অপরাধ অর্থলোভ, সামাজিক অবক্ষয়ের কুফল হলেও সময় মতো শাস্তি হলে এসব অপরাধ কমে যেতো। সময়মতো বিচার ও রায় কার্যকরি করা হলে অপরাধের মাত্রা কমে যেতে বাধ্য। কিন্তু মনে হচ্ছে ইদানিং দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলার সংখ্যা কমে যাচ্ছে। সঠিকভাবে চার্জশীট তৈরি করার প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব পুলিশের। পুলিশের হাতেই জনমানুষের জীবন ও মৃত্যু নির্ভরশীল। পুলিশের চার্জশীটের ভিত্তিতেই মাননীয় আদালত বিচারিক কার্য সম্পাদন করেন। অথচ পুলিশের পবিত্র দায়িত্ব হলো প্রকৃত অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করা ও নিরপরাধকে রক্ষা করা। মানুষের জীবন পুলিশের হাতে, পুলিশের বিভাগটি বড় পবিত্র। এখানে দুর্নীতি, রাজনৈতিক চাপ, ঘুষ, গড ফাদারদের দৌরাত্ম্য থাকলে ভুক্তভোগী ন্যায় বিচার পাবে না, অপরাধী শাস্তি পাবে না। কারণ পুলিশের চার্জশীট ও তদন্ত রিপোর্টের ওপরই বিচারকার্য সম্পন্ন হয়। শাস্তি ছাড়া অপরাধ কমে না, অপরাধীদের বিবেক কখনও জাগে না। তাই পুলিশের বিবেককে মানবিক কারণে জাগিয়ে তোলা দরকার। পুলিশের বিবেক একটু জেগে উঠলেই নিরপরাধ, নিরীহ মানুষ বিচার পাবে। লেখক :এফসিএ ও কথাশিল্পী

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন