ব্যান্ডউইথ রপ্তানির চুক্তি আগামী মাসে

আপডেট : ১৭ জুলাই ২০১৪, ১৯:৩৩
গত বছরের মাঝামাঝি সময় থেকেই বাংলাদেশ থেকে ভারতে ব্যান্ডউইথ রপ্তানির বিষয়টি প্রযুক্তি খাতের আলোচনার অন্যতম শীর্ষে অবস্থান নিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ব্যান্ডউইথ রপ্তানির প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। ব্যান্ডউইথ রপ্তানির বিভিন্ন তথ্য নিয়ে লিখেছেন মোজাহেদুল ইসলাম তথ্যপ্রযুক্তির এই জোয়ারের যুগে ইন্টারনেট একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে রেখেছে। মধ্য আয়ের বাংলাদেশ গড়ার যে লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করে যাচ্ছে, তার পেছনেও অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবেই কাজ করবে ইন্টারনেট। ইতোমধ্যেই দেশের অর্থনীতিতে অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে জায়গা দখল করে নিয়েছে তথ্যপ্রযুক্তি। গত কয়েক বছরে সফটওয়্যার ও আইটি খাতে বাংলাদেশের অর্জন প্রশ্নাতীত। সফটওয়্যার ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সাথে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের বৈদেশিক আয়ের অন্যতম মূল খাতে পরিণত হবে এই খাত। আর তার জন্য দেশব্যাপী উচ্চগতির ইন্টারনেট নিশ্চিত করতে হবে। ইতোমধ্যেই ওয়্যারলেস ইন্টারনেটে দেশজুড়ে ওয়াই-ফাই, থ্রিজি এবং ওয়াইম্যাক্সের প্রসার আশানুরূপ। তবে দেশের ব্রডব্যান্ড সংযোগ এখনও বিস্তৃত নয় দেশজুড়ে। শুধু তাই নয়, বড় বড় শহর এবং এমনকি খোদ রাজধানী ঢাকাতেও উচ্চগতির ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগ সুলভ নয়। এমন পরিস্থিতিতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে দেশব্যাপী অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে উচ্চগতির ব্রডব্যান্ড সংযোগ পৌঁছে দেওয়ার দাবি রয়েছে তথ্যপ্রযুক্তি বিশেজ্ঞদের। এমন পরিস্থিতিতে গত বছরের শেষের দিকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ব্যান্ডউইথ রপ্তানির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। মূলত বাংলাদেশে যে পরিমাণ ব্যান্ডউইথ রয়েছে তার বড় একটি অংশই অব্যবহূত থাকার প্রেক্ষিতে ব্যান্ডউইথ রপ্তানির মাধ্যমে বড় অংকের অর্থ আয় করা সম্ভব মনে করেই ব্যান্ডউইথ রপ্তানির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। ব্যান্ডউইথ রপ্তানির সিদ্ধান্ত অনেক আগেই বাংলাদেশ থেকে ব্যান্ডউইথ কেনার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছিল সিঙ্গাপুর। এ ছাড়া ভারত, নেপাল, ভূটান এবং মায়ানমারও বাংলাদেশ থেকে ব্যান্ডউইথ কেনার বিষয়ে আগ্রহ দেখায়। তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ব্যান্ডউইথ রপ্তানির বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়নি। গত বছরের জুলাইয়ে বাংলাদেশে ভারত সরকারের একটি প্রতিনিধি দল সফরে আসলে সেসময় ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সাথে একটি বৈঠকে তারা বাংলাদেশ থেকে ব্যান্ডউইথ আমদানির আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেয়। মূলত এই প্রস্তাবের পর থেকেই বাংলাদেশ ব্যান্ডউইথ রপ্তানির বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করতে শুরু করে। দীর্ঘদিন ধরে বিবেচনার পর অবশেষে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে সিদ্ধান্ত আসে মন্ত্রণালয়ে। আন্তঃমন্ত্রণালয় ওই বৈঠকে ২০২১ সাল পর্যন্ত দেশের সম্ভাব্য চাহিদা নিরূপণ করে তবেই অবশিষ্ট ব্যান্ডউইথ রপ্তানি করা যেতে পারে নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে ভারতের একটি প্রতিনিধি দলের ঢাকা সফরে এ বিষয়ে উভয় দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়। ব্যান্ডউইথ রপ্তানি হবে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যে বাংলাদেশ থেকে মূলত ভারতের ‘সেভেন সিস্টার্স’খ্যাত পূর্বাঞ্চলীয় সাতটি রাজ্যে ব্যান্ডউইথ রপ্তানি করা হবে। আসাম, ত্রিপুরা, মিজোরাম, মেঘালয়, নাগাল্যান্ড, মনিপুর ও অরুণাচল প্রদেশের জন্যই মূলত ভারত বাংলাদেশ থেকে ব্যান্ডউইথ কিনতে চায়। ভারতে ১৬টি সাবমেরিন ক্যাবল সংযোগ থাকলেও এর সবই ভারত মহাসাগর ও আরব সাগরের পাড়কেন্দ্রিক রাজ্যগুলোর সাথে সংশ্লিষ্ট। এসব ক্যাবলগুলোর ল্যান্ডিং স্টেশন থেকে ‘সেভেন সিস্টার্স’ রাজ্যগুলোর দূরত্ব অনেক বেশি এবং এসব এলাকায় এসব স্টেশন থেকে ইন্টারনেট সংযোগ দিতে গেলে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। ফলে ইন্টারনেট সংযোগের খরচ অনেক বেড়ে যায়। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ থেকে এসব রাজ্যের জন্য ব্যান্ডউইথ কিনতে পারলে অবকাঠামো নির্মাণ ও পরিবহন খরচ দু’টোই কমে যায়। বাংলাদেশ থেকে একাধিক রুটে ব্যান্ডউইথ ভারতে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে ভারতের। বাংলাদেশের ব্যান্ডউইথ সক্ষমতা বর্তমানে বাংলাদেশের ব্যান্ডউইথের পরিমাণ ২৫০ গিগাবাইট। এর মধ্যে বাংলাদেশ সাবমেরি ক্যাবল কোম্পানি লিমিটেডের (বিএসসিসিএল) রয়েছে ২০০ গিগাবাইট। আর ইন্টারন্যাশনাল টেরেস্ট্রিয়াল ক্যাবল (আইটিসি) অপারেটরসহ অন্যদের রয়েছে ৫০ গিগাবাইট। মোট ২৫০ গিগাবাইটের মধ্যে এখন পর্যন্ত দেশে ব্যবহূত হয় মাত্র ৪২ গিগাবাইট। বাকি ২০৮ গিগাবাইট পুরোটাই অব্যবহূত থেকে যায়। আগামী কয়েকবছরে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের প্রসারের হারকে বিবেচনায় রাখলেও এই পুরো ২৫০ গিগাবাইট দেশের মধ্যে ব্যবহার করা সম্ভব হবে না বলে মনে করেন তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা। ফলে অব্যবহূত ব্যান্ডউইথ ভালো দাম পেলে রপ্তানি করা যায় বলেই মন্তব্য তাদের। রপ্তানি হবে ৪০ গিগা বাংলাদেশ থেকে ভারতে ব্যান্ডউইথ রপ্তানি করবে মূলত বিএসসিসিএল। তাদের ২০০ গিগাবাইট ব্যান্ডউইথ থেকে দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ১০০ গিগাবাইট ব্যান্ডউইথ রপ্তানি সম্ভব হবে বলে আশা করছে প্রতিষ্ঠানটি। বিএসসিসিএল-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মনোয়ার হোসেনের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে ১০ গিগা ব্যান্ডউইথ দিয়ে শুরু হবে এই রপ্তানি কার্যক্রম। পর্যায়ক্রমে তা ৪০ গিগায় উন্নীত করা হবে।’ ব্যান্ডউইথ রপ্তানি শুরুর জন্য ইতোমধ্যে রুটও ঠিক করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দেশের সাবমেরিন ক্যাবলের ল্যান্ডিং স্টেশন কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রাম হয়ে কুমিল্লা পর্যন্ত আসবে ফাইবার অপটিক ক্যাবল লাইন। এরপর কুমিল্লা থেকে আখাউড়া সীমান্ত পেরিয়ে আগরতলা হয়ে ত্রিপুরা পর্যন্ত পৌঁছে যাবে ইন্টারনেট সংযোগ। এর জন্য নতুন করে প্রায় ৩২ কিলোমিটার নতুন লিংক লাইন তৈরি করতে হবে। আমাদের নিজস্ব এনটিটিএন লাইসেন্স নেই বলে এই লিংক আমরা নিজেরা তৈরি করতে পারব না। এর জন্য বিটিসিএল কিংবা ফাইবার অ্যাট হোমকে দায়িত্ব দেওয়া হবে।’ সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো থেকে জানা গেছে, ব্যান্ডউইথ রপ্তানির জন্য আরও একটি রুট ঠিক করা হয়েছে। এই রুটে কুমিল্লা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া হয়ে সিলেটের তামাবিল সীমান্ত হয়ে মেঘালয়ের রাজধানী শিলং পর্যন্ত বিস্তৃত হবে সংযোগ। সেখান থেকে বিএসএনএল নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় আসামে পৌঁছে যাবে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হওয়া ব্যান্ডউইথ। বিএসসিসিএল আশা করছে, দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবলের সাথে বাংলাদেশ সংযুক্ত হলে আগামী দুই বছরের মধ্যে ভারতে অন্তত ১০০ গিগাবাইট ব্যান্ডউইথ রপ্তানি সম্ভব হবে। আগস্টেই চুক্তি স্বাক্ষর গত মাসে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের সফরেই ব্যান্ডউইথ রপ্তানির চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা থাকলেও অনিবার্য কারণে তা সম্ভব হয়নি। আসছে ঈদের পরে দ্রুততম সময়ে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে বলে আশাবাদ জানিয়েছেন বিএসসিসিএল ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তিনি বলেন, ‘এই বিষয়ে ইতোমধ্যেই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। আমরা আশা করছি ঈদের পরে আগস্টের মধ্যেই এই বিষয়ে চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে। ইতোমধ্যেই তারা চুক্তিপত্র আমাদের কাছে পাঠিয়েছে। আমরাও এতে কিছু সংশোধনীর কথা তাদের কাছে জানিয়েছি। তারা এই সংশোধনীগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেই চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে।’ ব্যান্ডউইথ রপ্তানির ক্ষেত্রে দাম কত ধরা হবে সেই তথ্য এখনও জানাতে রাজি নয় বিএসসিসিএল। মনোয়ার হোসেন বলেন, ‘চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার আগেই মূল্য প্রকাশ করা ঠিক হবে না। তবে আমরা আশা করছি, ৪০ গিগাবাইট ব্যান্ডউইথ রপ্তানি করতে পারলে মাসে ৩ কোটি ২০ লাখ টাকা আয় হবে।’ আখতারুজ্জামান মঞ্জু সভাপতি, আইএসপিএবি তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলাদেশ যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, তাতে করে আগামী দিনগুলোতে আমাদের দেশে ইন্টারনেটের ব্যবহার আরও বাড়বে। তাই ভবিষ্যতে আরও বেশি ব্যান্ডউইথ দরকার হবে আমাদেরই। তবে আমাদের বর্তমান সক্ষমতার চাইতে অনেক বেশি ব্যান্ডউইথ রয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে আমাদের কী পরিমাণ ব্যান্ডউইথের প্রয়োজন হবে সেটা সঠিকভাবে নিরূপণ করে অব্যবহূত ব্যান্ডউইথের কিছু অংশ রপ্তানি করাই যায়। তবে সেক্ষেত্রে ৩ বছরের জন্য ব্যান্ডউইথ রপ্তানি করা যেতে পারে। এতে কোনো সমস্যা নেই। তবে দেশের মধ্যে উচ্চ ট্রান্সমিশন খরচ, কনটেন্টের স্বল্পতা এবং সব জায়গায় ফাইবার অপটিকস না পৌঁছানোর কারণে তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার অনেকটাই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এই দিকগুলোতে নজর দেওয়া জরুরি। ০০০ আব্দুল্লাহ এইচ কাফি চেয়ারম্যান, অ্যাসোসিও আমাদের নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ ব্যান্ডউইথ সংরক্ষণ নিশ্চিত করার পরেও যদি ব্যান্ডউইথ বাড়তি থাকে, তা রপ্তানি করতে কোনো সমস্যা নেই। কোন দেশের কাছে ব্যান্ডউইথ রপ্তানি করা হচ্ছে সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। বরং এর চেয়ে বেশি মনোযোগী হতে হবে যেন গোটা প্রক্রিয়াটা আমাদের জন্য লাভজনক হয়। সবচেয়ে বড় কথা আমাদের দেশে ইন্টারনেটের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরের মধ্যে আমাদের কী পরিমাণ ব্যান্ডউইথ প্রয়োজন, তার হিসাব করেই কেবল বাড়তি ব্যান্ডউইথ রপ্তানি করা যায়। তবে এর জন্য সংশ্লিষ্ট স্টেক হোল্ডারদের সাথে সরকার আগে থেকেই মতবিনিময় করে নিতে পারলে বিষয়টি নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াত না। আমরা যাই কিছু করি না কেন, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। ০০০ সুমন আহমেদ সাবির চিফ স্ট্র্যাটেজিক অফিসার, ফাইবার অ্যাট হোম আমাদের দেশের সবখানে এখনও ইন্টারনেট পৌঁছেনি। আমাদের ব্যান্ডউইথের যে সক্ষমতা রয়েছে তাতে করে আগামী ২-৩ বছরেও আমরা পূর্ণ ব্যান্ডউইথ ব্যবহার করতে পারব না। বলতে গেলে আমাদের প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি ব্যান্ডউইথ অব্যবহূত পড়ে রয়েছে। কাজেই আমাদের প্রয়োজনের তুলনায় বাড়তি যে ব্যান্ডউইথ রয়েছে, সেখান থেকে কিছু অংশ রপ্তানি করে যদি রাজস্ব আয় হয়, তাতে সমস্যা নেই। বরং ব্যান্ডউইথ রপ্তানিকে লাভজনক করতে পারলে সেখানকার লভ্যাংশকে কাজে লাগিয়েই আমাদের অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোর অনেক কাজই করা যায়। আর আগামী দিনে প্রয়োজন হলে আমাদের সক্ষমতাও বাড়ানো সম্ভব।