সোস্যাল মিডিয়ায় বাংলাদেশ

আপডেট : ১৭ জুলাই ২০১৪, ১৯:৩৫
‘পুড়ছে গাজা-/আমার কেমন ‘লিশা’ ‘লিশা’ লাগে,/ ওদের কাছে গাজার অর্থ যা,/ আমার কাছে অন্যরকম লাগে।/রাজায়-গাজায় অর্থ বদল-/ শর্ত বদল হয়,/ মানুষ পোড়ার গন্ধ কেবল/ একই রকম রয়।’ ফুটবল বিশ্বকাপের উন্মাদনা কাটতে না কাটতেই এমনই তীক্ষ নানা অভিব্যক্তিতে সরব হয়ে উঠেছে আমাদের ভার্চুয়াল আকাশ। প্রতিবাদ, নিন্দা, সহমর্মিতা প্রকাশের বিম্বিত প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে সামাজিক যোগাযোগ প্ল্যাটফর্ম। একের পর এক নতুন নতুন ইস্যুতে সোচ্চার থাকছে এই ভার্চুয়াল জগত। এভাবেই ফেসবুক, টুইটার, বেশতো, গুগল প্লাস, লিংকড ইন, লক্ষ্মী, ফ্রেন্ডসার্কেল, সামহোয়্যার ইন ব্লগ, শিক্ষক ডটকম, ইউটিউব, ফ্লিকার ইত্যাদি সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের সমাজ-সংস্কৃতিকে যেমন প্রভাবিত করছে, তেমন অবদান রাখছে অর্থনৈতিক উন্নয়নেও। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি ব্যবহূত হয় ফেসবুক। এই ফেসবুকের নানামাত্রিক ব্যবহারের কয়েকটি ঘটনার মাধ্যমে বুঝা যাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো কতটা গভীরে পৌঁছে গেছে আমাদের নাগরিক জীবনে। ঘটনা-১ :বিশ্বকাপ তো শেষ। বিশ্বকাপে প্রিয়দলের জন্য বানানো পতাকা নিয়ে কী করা যায়, তা নিয়েই অফিসের সহকর্মীর সাথে আলোচনা করছিলেন মিজানুর। সহকর্মী শহীদুজ্জামানের উত্তরের অপেক্ষা না করে নিজেই গরগর করে বললেন, ‘ফেসবুকে নতুন একটি উদ্যোগ নিয়েছে ‘পরিবর্তন চাই’ নামের এক ফেসবুকভিত্তিক সংগঠন। ‘আপনার পতাকা, আমার শীতের কাঁথা’ নামে পেজ খুলেছে তারা।’ পতাকা, কাঁথা—এসব কী বলছেন, জানতে চান শহীদুজ্জামান। উত্তরে মিজানুর জানান, ফেসবুকের মাধ্যমে পতাকা সংগ্রহ করে সেই কাপড় দিয়ে কাঁথা বানিয়ে শীতে দুঃস্থদের মধ্যে বিতরণ করবে ফেসবুক গ্রুপটি। ঘটনা-২ :গ্রাহক পর্যায়ে ইন্টারনেটের খরচ নিয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে বেশ কয়েক বছর ধরে সোচ্চার ফেসবুকভিত্তিক বেশ কয়েকটি গ্রুপ। ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের এমন আন্দোলনের মুখে এবার ফেসবুকেই অনুসারি-বন্ধুদের মতামত জানতে পোস্ট করেছেন সরকারের আইসিটি বিভাগের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। ঘটনা-৩ :‘বন্ধু, ছবিটা কবে পাব?’, ছবিয়াল নাজমুল হাসানের কাছে জানতে চায় এক সময়ের স্কুলের সহপাঠী তৌহিদ। ‘টেনশন নিও না, মামা, আজ রাতেই পেয়ে যাবা। ফেসবুকে আপলোড করে দিবোনে’, প্রত্যুত্তর নাজমুলের। ঘটনা-৪ :ব্যক্তি উদ্যোগে ফেসবুকে ‘জুনিস ওয়ারড্রোব’ নামে একটি পেজ খুলেছেন রুবানা আলম। এখানেই হাতের কারুকাজের পর্দা, সালোয়ার-কামিজ, ভ্যানিটি ব্যাগ, অর্নামেন্ট ইত্যাদির পসরা সাজিয়ে বেশ ব্যবসায় করছেন ঘরে বসেই। ঘটনা-৫ :মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধের প্রথম রায়ে অসন্তুষ্ট হয়ে অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরা জড়ো হন শাহবাগে। গত বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি এখানেই গড়ে ওঠে গণজাগরণ মঞ্চ। তারপরের ঘটনা সবার জানা। অবশ্য এর বাইরে ঢাকার খিলক্ষেতে ইভটিজারকে খুঁজে বের করে শাস্তি দেওয়া, উত্তরায় ফেসবুক থেকে পুলিশি সেবা কার্যক্রম শুরু করা, সাভারের রানা প্লাজা ট্র্যাজেডিতে আহতদের জন্য রক্তদান, ঢাকার রাস্তার ময়লা কুড়িয়ে ‘দেশটাকে পরিস্কার করি’ আন্দোলন, ধানমন্ডি মাঠের অধিকার ফিরে পাওয়া এবং হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং উপজেলার পুকড়া থেকে নবীগঞ্জের এক পরিবারের হারিয়ে যাওয়া শিশুকে ফিরিয়ে দেওয়ার মতো নানা ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো ইতোমধ্যেই নজির সৃষ্টি করেছে। ইন্টারনেট আর স্মার্টফোন ব্যবহারের সাথে বাড়ছে সামাজিক যোগাযোগের সাইটে মানুষের আনাগোনা। বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য বলছে, বাংলাদেশে প্রায় ৪৮টি বাংলা ব্লগ আছে, আড়াই লাখ নিয়মিত ও অনিয়মিত ব্লগার আছেন। ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় তিন কোটির সামান্য বেশি। এর মধ্যে ২৮ লাখ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ফেসবুক ব্যবহার করে। অনলাইন সামাজিক যোগাযোগ প্লাটফর্মে বন্ধু বা অনুসারী হয়ে থাকেন প্রশাসনিক ও রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা থেকে শুরু করে পারিবারিক স্বজন এবং শৈশব ও একাডেমিক বন্ধুরা। ফলে এখানে ব্যক্তিগত বিষয়ের পাশাপশি রাজনীতি, খেলাধুলা, সামাজিকতা, ধর্ম, চলমান বাস্তবতায় নিজস্ব অনুভূতির প্রকাশ ঘটে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাব বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃ-বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. রাহমান নাসির উদ্দিন মনে করেন, এর মাধ্যমে একদিকে যেমন সামাজিক যোগাযোগের একটি ‘স্পেস’ তৈরি হয়েছে এবং কানেক্টিভিটির সীমানা সম্প্রসারিত হয়েছে; অন্যদিকে ‘যোগাযোগ’ যে একটি শক্তিশালী সামাজিক ‘প্রোর-গ্রুপ’ হতে পারে এবং সে মোতাবেক একটি ‘রাজনৈতিক শক্তি’ হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে, তারও ক্রমান্বয়ে নজির স্থাপন করে চলেছে। রাজনীতির ওয়াচডগ বাধাহীন অভিব্যক্তির নিকোনো উঠোন হয়ে উঠেছে আমাদের অনলাইন যোগাযোগ মাধ্যমগুলো। এই প্লাটফর্মটি এখন রাষ্ট্র পরিচালনাকারী থেকে শুরু করে উঠতি রাজনীতিক এবং নৈমিত্তিক কাজে ব্যস্ত সাধারণ নাগরিকের মিলনকেন্দ্র। এখানে অনায়াসে দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের। ফলে এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে রাজনৈতিক বক্তব্য যেমন বেগবান হয়, তেমনি মুক্তবুদ্ধির চর্চার পথও উন্মুক্ত হচ্ছে। বহুমতের এই মিলন মেলায় সহজেই উন্মোচিত হয় আনালোকিত অনেক তথ্য, গণমানুষের অভিব্যক্তি। সমকালীন বাংলাদেশের রাজনীতিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, বিচারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা শাহবাগের ব্যাপক গণজাগরণ, আস্তিক-নাস্তিকতার রাজনৈতিক প্রচারণা, হেফাজতে ইসলাম, জন্ম, দশম জাতীয় নির্বাচনে ভোট চলাকালে নানা অনিয়ম, নারয়ণগঞ্জের সেভেন মার্ডারে রাষ্ট্রীয় সম্পৃক্ততার অভিযোগ, এএসপি বশিরের বক্তব্য ইত্যাদি নানা বিষয়ে সোচ্চার দেখা গেছে আমাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোকে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে গণতন্ত্রের সহযাত্রী মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘এই মাধ্যমটির কারণেই আজ স্বাধীনতাবিরোধীরা অপপ্রচার চালাতে পারে না। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর পিতার নাম ও পরিচয় নিয়ে বিতর্কের জন্মদাতারা সহজেই পরাস্ত হয়েছেন। মিথ্যা বলে কেউ আজ রক্ষা পাচ্ছে না। গণতন্ত্র ও জনমতের বিকাশে খুবই ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এই সুযোগ নিয়ে আমিও সম্প্রতি ইন্টারনেটের মূল্য কত হওয়া উচিত তা জানতে চেয়ে ফেসবুকে পোস্ট করেছি। ফেসবুক এখন গণমানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার অন্যতম বাহন। আসলে এটাই গণতন্ত্র।’ সমাজের আয়নায় আমাদের হেঁসেল আর বৈঠকখানার মধ্যে দারুণ একটি সংযোগ তৈরি করে দিয়েছে অনলাইন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো। জন্মদিনের শুভেচ্ছা থেকে শুরু করে বিপদে-আপদে সবাইকে একই প্ল্যাটফর্মে দাঁড় করাচ্ছে। ইভেন্ট পেজ জাতীয় দিবসে, আইলার কিংবা রানা প্লাজা ট্র্যাজেডিতে সহাযোগিতায়, চিকিত্সা সহযোগিতায় বিগত সময়ে দারুণ ভূমিকা রেখেছে এই সামাজিক মাধ্যমগুলো। এ বিষয়ে বাংলাভাষীদের প্রথম অনলাইন সামাজিক নেটওয়ার্ক ‘বেশতো’র প্রতিষ্ঠাতা প্রধান নির্বাহী ফাহিম মাশরুর বললেন, ‘গত দুই বছরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো অ্যাকটিভ রোল প্লে করলেও এখন তা ক্রমেই কমে যাচ্ছে। মিসরে ফেসবুক থেকে ‘আরব বসন্ত’ শুরু হলেও সেখানে এখন জান্তা সরকার। এই মাধ্যমটি ক্ষণস্থায়ী রাজনৈতিক প্রভাবের জন্য কাজ করলেও দীর্ঘমেয়াদে সাস্টেইন করে না। আসলে সংগঠনিক সমর্থনের অভাবে এমনটা হচ্ছে। সামাজিক সচেতনত তৈরির পাশপাশি উন্নাসিকতা বাড়ছে। তাই অনলাইন যোগাযোগ মাধ্যমে দেশের মানুষ সোচ্চার হলেও বাস্তবে তারা মাঠে নামে না।’ ব্যবসায় দুনিয়ায় বর্তমানে ব্যবসায় প্রসারের সেকেন্ড ফ্রন্ট হিসেবে কাজ করছে অনলাইন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। এই মাধ্যমটিতে ফ্যানপেজ খুলে নিজের তৈরি কিংবা সংগৃহীত পণ্যের পসরা সাজিয়ে ঘরে বসেই ব্যবসায় পরিচালনা করছেন অনেক তরুণ। ভোক্তা ধরতে এক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই প্রভাবশালী কোম্পানিগুলোও। এর মাধ্যমে তৈরি হচ্ছে কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র। পণ্য নিয়ে ভোক্তাদের নানা আলোচনা-সমালোচনা থেকে বাঁচতে পণ্যমান নিয়ন্ত্রণ করতে সচেতন থাকতে বাধ্য হচ্ছে উত্পাদকেরা। তবে এ ক্ষেত্রে যতটা সুফল আনা সম্ভব সেই প্রত্যাশিত অর্জন এখনও সম্ভব হয়নি বলে মনে করেন অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ও ব্লগার আরিফ জেবতিক। তিনি বলেন, ‘রাজনীতি আমাদেরকে এতটাই আষ্টেপৃষ্ঠে বেধেছে যে আমরা এই মহাসমুদ্র থেকে অর্জন করতে পারছি না। আসলে রাজনীতি এখন বিনোদনে রূপান্তরিত হয়েছে।’ এই জায়গা থেকে উত্তরণের জন্য দেশের মোটিভেশন স্পিকার এবং কর্পোরেট সেক্টরকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে বাংলা ভাষার ব্যবহার বাড়ানো হলে দেশটার উন্নতি হতে সময় লাগবে না।’  মোজাহেদুল ইসলাম