বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি নায়িকা-গায়িকা কানন দেবীর মৃত্যু ১৯৯২ সালের ১৭ জুলাই কলকাতায়।
১৯৮০ সালে কলকাতায় বেড়ানোর কথা খুব করে মনে পড়ে। সে দিনটি ছিল সোমবার। চাঁদনী চক থেকে পাতাল ট্রেন ধরে এলাম টালিগঞ্জ। এখানে নেমে স্কুটার ধরে এলাম আলীপুর। আলীপুর এলাকার রিজেন্ট গ্রোভে কানন দেবীর বাড়ি। গেটে এসে দারোয়ানকে বললাম, বাংলাদেশ থেকে এসেছি প্রিয় নায়িকাকে একনজর দেখবো বলেই। দারোয়ান আমার এ কথাকে বেশ একটা গুরুত্ব দিয়ে বললো, বাবু দাঁড়ান দেখি, বলে-কয়ে দেখা করাতে পারি কি না! দারোয়ান এই বলে গেটটি লাগিয়ে পথ ধরে বাড়িটির দিকে পা বাড়ালেন। বাসার সামনে গাড়ি পৌঁছানোর জন্য কি ই না সুন্দর রাস্তা!
দোতলা সুন্দর বাড়িটির দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। হঠাত্ স্মৃতিতে ভেসে উঠলো—১৯৫৮ সালের কথা। তখন সম্ভবত স্কুলে সবে ভর্তি হয়েছি। এটুকুই মনে আছে নায়িকা কানন দেবী রেলগাড়ি চলে যাওয়ার দৃশ্য দেখে গাইছেন-‘তুফান মেল যায় তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে ময়নামতির হাট এড়িয়ে কাঁশের বনে ঢেউ খেলিয়ে যায়-যায়রে।’ এই গানখানি আমাদের শৈশবকালকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছিলো। তখন তো ফিল্ম দেখে দেখে কানন দেবী, প্রমথেশ বড়ুয়া, যমুনা দেবী, উমাশশী, মঞ্জু দে, উত্তম কুমার, সুচিত্রা সেন— নামগুলোই ছিল সবার মুখে মুখে।
এদিকে পায়ে হেঁটে হেঁটে রাস্তার এ মাথা থেকে ও মাথা পর্যন্ত হেঁটে চলছি। হঠাত্ দেখি, দারোয়ান হাত উঠিয়ে বললেন, বাবু আসুন, চলুন ড্রইংরুমে উনি এসেছেন। ড্রইংরুমে ঢুকেই দেখি এক বৃদ্ধা বসে আছেন। নমস্কার জানালাম। এইতো সেই কানন দেবী। উনি হাসি দিয়ে বললেন, তুমি তো আমার ছেলের বয়সী। বাবা-মা’র সঙ্গে আমার ছবি-টবি খুব দেখেছো বুঝি! হাসলাম। উনিই জানালেন, এখনতো আমার বৃদ্ধ কাল, আমাকে দেখতে এসেছো, খুব দেখতে ইচ্ছে করেছিল বুঝি। তাই এই আসা! বললাম, হ্যাঁ হ্যাঁ। আপনাকে খুব করে মনে পড়ে, মনে পড়ে আপনার গানগুলো। সেই যে গেয়েছিলেন-‘লাগুক দোলা লাগুক দোলা আমার গানেই তোমার মনে লাগুক দোলা।’ বলুন, এ গান ভুলি কেমনে! ভুলি নাই বলেই তো প্রতিদিন প্রতিটি ক্ষণে, প্রতিটি মুহূর্তে মনে পড়ে আপনার নামটি! উনি কথাগুলো শুনে হাসলেন। উনি দেয়ালের দিকে তাকালেন। ‘দেখে বলো তো, ওখানে কার কার ছবি!’ উঠে দাঁড়িয়ে ছবিটির দিকে তাকিয়ে চিনতে ভুল হলো না। বললাম, আপনি ও অশোক কুমার।’
আমার চোখে চোখ রেখে কানন দেবী বললেন, আমি ছাড়া মি.বড়ুয়া কখনো বোম্বে যেতে রাজি হয়নি। ১৯৪৭ সালে ‘চন্দ্রশেখর’ ছবিটি করার পরে সেই সময় আমায় বোম্বে যাবার অনুরোধ করা হলো। তখন তাদের বললাম, আমি কোনদিনই বোম্বে যাব না, আপনারা যদি সত্যি আমাকে দিয়ে অভিনয় করাতে চান তা হলে কলকাতায় এসে ছবি করুন। তারা রাজি হয়ে গেলেন এবং এখানে এসে দু’খানা ছবি করলেন। প্রত্যেক ছবির জন্য ওরা আমাকে এক লাখ পঁচিশ হাজার টাকা করে দিয়েছিলেন। ছবি দুটি হলো-‘ফয়সালা’ এবং ‘কৃষ্ণলীলা’।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা তুলতেই কানন দেবী বললেন, আমার বিয়ের সময় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সই করা একখানা ছবি উপহার হিসাবে পেয়েছিলাম। এই সংবাদ কলকাতার উচ্চমহলের মানুষদের কানে পৌঁছানো মাত্রই তাঁরা দৌড়ঝাঁপ শুরু করে দিলেন। তাঁরা বললেন, অভিনেত্রীর কখনই কবিগুরুর নাম স্বাক্ষরিত ছবি রাখার অধিকার নেই।
একসময় কানন দেবী উঠে দাঁড়ালেন। ‘এখন যে আমাকে ঠাকুর ঘরে যেতে হবে’। বললাম, আবার আসবো। উনি বললেন, হয়তো আর দেখা নাও হতে পারে। ১৯৮০ সালের পরে উনি জীবিত থাকাকালীন সময় পর্যন্ত ৮ কি ৯ বার কলকাতা হয়ে বিভিন্ন রাজ্যে গিয়েছি। কিন্তু কানন দেবীর রিজেন্ট গ্রোভের বাড়িতে আর যাওয়া সম্ভব হয়নি। ১৯৯৩ সালে কানন দেবীর মৃত্যুর সংবাদ শুনে এরই কয়েক মাস পরে কলকাতার রিজেন্ট গ্রোভে বাড়ির সামনে একগুচ্ছ গোলাপ রেখে এসেছিলাম, সে কথা ভুলি কেমনে!
লেখক : ভ্রমণ ও চলচ্চিত্র বিষয়ক লেখক
