আষাঢ় শ্রাবণ এই দুই মাস বর্ষাকাল অর্থাত্ বর্ষা ঋতু। এ ঋতুর প্রধান বৈশিষ্ট বৃষ্টি ঝড়া আকাশ, কর্দমাক্ত মাঠ, নদ-নদী, খাল-বিল, পুকুর-ডোবা পানিতে পরিপূর্ণ হওয়া, গাছপালার সতেজ রূপ,গরম আবহাওয়া ইত্যাদি ইতাদি। কিন্তু গ্রীষ্ম ঋতুতেই অর্থাত্ চৈত্রে বৈশাখে কালবোশেখীর সাথেই শুরু হয়ে যায় বৃষ্টির আনাগোনা। জ্যৈষ্ঠে কখনো কখনো অঝোরে বর্ষার মতো ঝরতে থাকে বৃষ্টি— যা বর্ষার আগমনী বার্তা জানিয়ে দেয়।
জ্যৈষ্ঠের প্রচণ্ড গরম— আম জাম কাঁঠাল পাকার মরশুম। জ্যৈষ্ঠের দমফাটা গরম যেমন অস্বস্তিকর তার বিপরীতে আছে বাহারী ফলের সমাহারে মনভুলানো প্রকৃতি। এ সময়টায় বাজারে প্রায় সব ধরনের ফল পাওয়া যায়। কবির ভাষায় “পাকা জামের মধুর রসে রঙিন করি মুখ”। জ্যৈষ্ঠের মধুমাস পেরিয়ে গাছে গাছে কদম ফুল ফোটে। জানিযে দেয় আষাঢ় আসছে। বসন্তের অবসান, ১ শ্রাবণ, শুরু হয় বর্ষাঋতু।
রুদ্র গ্রীষ্মের দাবদাহন শেষে প্রকৃতির রাণী চিরসুন্দর শ্যামলী বর্ষার আগমনে ঘটে। কিন্তু কোনো কোনো বছর বৃষ্টির কোন দেখা যায় না, গরম পড়ছে অবিরাম। সবাই যেন মন প্রাণ উজাড় করে সৃষ্টিকর্তার কাছে বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করছে। আবার কোনো কেনো এলাকায় বৃষ্টির আগমনের জন্য ব্যঙের বিয়ের আয়োজন করছে। সাধারণ মানুষের বিশ্বাস ব্যঙের বিয়ে দিলে বৃষ্টির আগমন ঘটবে। ডাহুক আপন মনে ডাকতে ডাকতে বর্ষার আগমনবার্তা জানিয়ে দেয়।
বর্ষাকালে বৃষ্টিপাত প্রাকৃতিক নিয়মেই হয়। বাতাসে মৌসুমী বায়ুর উপস্থিতি বেশি থাকার কারণে বৃষ্টিপাত বেশি হয়ে থাকে। সমুদ্র এলাকায় মৌসুমী বায়ু সক্রিয় থাকে। বর্ষাকালে এই মৌসুম বায়ু আস্তে আস্তে সারা দেশে প্রভাাব বিস্তার করে। মৌসুমী বায়ুর আগমনে জ্যৈষ্ঠের গুমোট গরমের ভাবটা কেটে গিয়ে প্রশান্তির একটা হাওয়া বয়ে যায়। আষাঢ়ে-শ্রাবণে অঝোর বর্ষণ গোটা পরিবেশটাকেই আরো প্রাণবন্ত করে তোলে।
বর্ষার কোমলতায় গ্রীষ্মের ঋতুর নিমর্মতা অর্থাত্ ঘাম ঝড়ে দর দর গ্রীষ্মের দুপুরে; মাঠ ঘাট চৌচিড় জল নেই পুকুরে এ ধরনের বাস্তবতার অবসান ঘটে। বর্ষায় আকাশে ভেসে বেড়ায় সাদা কলো মেঘ। কখনো বৃষ্টি, কখনো রোদ্র। কখনো সারাদিন অঝোরে বর্ষণ ঝড়ছে তো ঝড়ছেই। বর্ষার আকাশ ফর্সা হয় না। এই মেঘ, এই বৃষ্টি। মাঝে মাঝে সাদা কালো মেঘের ফাঁক দিয়ে সুর্য্যি মামা উকি মারে। রাতে মাঝে মাঝে চাঁদ মামার স্নিগ্ধ আলো এসে পড়ে গাছের চূড়ায়। এ অবস্থাকে বলা হয় প্রাকৃতিক বৈচিত্র। ষড়ঋতুর অন্যতম বর্ষা ঋতু যা বাংলাদেশের আবহাওয়া, পরিবেশ আর মনোজগতকে একেবারে বদলে দেয়। অধোর ধারায় বৃষ্টিস্নাত হয়ে ধরিত্রী, রোদে ঝলসে যাওয়া গাছপালা সবুজ হয়ে ওঠে।
বর্ষার প্রকৃতি আর পাচঁটি ঋতুর মত নয়। বৃষ্টির মর মর ধ্বনি তীব্রভাবে আমাদের পঞ্চেন্দ্রিয়কে আভিভূত করে। এ কারণে এ দেশের কবি-সাহিত্যিকগণ বর্ষাকে নিয়েই সর্বাধিক সাহিত্য রচনা করেছেন। আষাঢ় নিয়ে রবীন্দ্রনাথের লেখা শিশু কবিতা ্উচ্চারিত হয় শিশুদের মুখে মুখে-
নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে
তিল ঠাঁই আর নাহিরে
ওগো আজ তোরা যাসনে গো
যাসনে ঘরের বাহিরে।
[কবি ফররুখ আহমদের শিশু কবিতায় রচনা করেছেন-
“বিষ্টি নামে রিমঝিমিয়ে
রিমঝিমিয়ে
গাছের ডালে টিনের চালে
বিষ্টি নামে হাওয়ার তালে
বাদলা দিনের একটানা সুর
বৃষ্টি নামে ঝুমুর ঝুমুর।”
বর্ষা ঋতুতে ছোট-বড় সরোবরে, ডোবা নালায় অজস্র শাপলা ফুল ফুটে। কদম কেয়া শাপলা স্নিগ্ধ হাসি কবিমনকে বিচিত্রতা ভাবনায় ভরে তোলে। বাস্তবে রূপ পায় কবিতা, গান ও বিভিন্ন ছন্ধে ছন্ধে। কতই না কবিতা-ছড়া কবির লেখনীতে প্রকাশ পায়। তাইত কবি গুনগুন করে বলছেন-
রিম ঝিম বিষ্টিটা, কোথায় মিষ্টিটা
দিন রাত ঝরছে,নদী নালা ভরছে।
বর্ষার সুশীতল বর্ষণ প্রকৃতির সকল চাওয়া- পাওয়াকে তৃপ্ত করে। বর্ষার আগমনে শুকনো ফাটা ফাটা ফসলের খেত পরিপূর্ণ হয় পানিতে। খাল বিল সব তলিয়ে কানায কনায় পানিতে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। নদীগুলোর দুই পাড় পানিতে ভসে যায়। অনেক সময় উপচে পড়ে বন্যাও দেখা দেয়। বন্যা হয় আমাদের ক্ষতির কারণ। শ্রাবণ মাস যখন আসে তখন আমাদের দেশের অধিকাংশ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। গ্রামীণ জনপদ বর্ষার পানিতে টইটম্বুর হয়ে ওঠে, বাড়িগুলো সব বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত হয়।
এরপরও ক্রমাগত বৃষ্টি আর নদীর পানির স্রোতধারা আমাদেরকে ভিন্ন একটি আমেজ এনে দেয়। বৃষ্টিতে ভিজতে শিশু কিশোরদের মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে। বৃষ্টি আমাদের প্রকৃতিকে যেমন ফলে ফসলে ভরিয়ে দেয় তেমনি আমাদের মন-মানসকেও স্পর্শ করে। গুরু গুরু মেঘের ডাকে ধান ক্ষেতে বিচরণ করতে শুরু করে কই, শিঙ অরো কতো ছোট আকৃতি ও প্রকৃতির মাছ। গৃহস্থরা ছুটাছুটি করে মাছ ধরার উপকরণ নিয়ে, কেউই জাল, কেউবা খুচন, কেউবা কোচ, কেউবা বড়শী নিয়ে। এযেন বর্ষা ঋতুর এক অফুরন্তলীলা বৈচিত্র। ব্যাঙেরা দলবেঁধে ডাকতে থাকে মেঘ হ মেঘ হ, শুরু হয় নবজীবনের আনন্দমেলা ।
বর্ষা ঋততুে কদম ও কেয়া ফোটার সময়। কদম বর্ষার প্রতীক। বর্ষার সাথে কদমের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবির। কদম ছাড়া বর্ষার রূপ বর্ণনা করা যায় না। বাতাসে ভেসে আসে কদমের গন্ধ। কদম ফুটলেই মানুষ বোঝে যে বর্ষা এসেছে। হলুদ সাদা মিশ্রিত কদম ফুলের হাসি ছোট ছোট ছেলেময়েদেরকে আকৃষ্ট করে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের কদম ফুল নিয়ে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায।
বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। কৃষির উপর নির্ভর করে বেঁচে আছে এ দেশের আশি ভাগ মানুষ। বর্ষায় আমন ধানসহ অন্যান্য ধান ও বিভিন্ন ধরনের ফসলের করা হয় বৃষ্টির পানিতে পাট গাছগুলো বড় হয়ে ওঠে। বর্ষার পানি পেয়ে পাটের আবাদ ভালো হয়। এ ছাড়াও এ ঋতুতেই এসব অর্থকরী ফসল ফলাতে হয়। তাই বর্ষা অতি প্রয়োজনীয় ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঋতু। বর্ষার আমনের খেত কৃষকের মুখে হাসি ফোটায়, নিয়ে আসে সুখ, শান্তি ও প্রগতি। বর্ষা যেমন আনন্দ বয়ে আনে তেমনি দুঃখ-কষ্টও বয়ে আনে।
আষাঢ়-শ্রাবণ দু’মাস বর্ষাকাল হলেও বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে এর পরেও বর্ষার প্রভাব থাকে। থাকে বৃষ্টিপাত। ফলে বর্ষা আর শরত্ যেন একাকার হয়ে যায়। হেমন্তে কার্তিক মাসে পানি সরে যাওয়ার পর ক্ষেত পাথার যখন আবার জেগে ওঠে তখনই আসলে বর্ষার প্রভাব শেষ হয় প্রকৃতি থেকে।
বর্ষা প্রকৃতিকে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে দিয়ে যায়। হ্রাস পায় ফসলী জমিতে পোকা মাকরের আক্রমণ, জমিতে জমে থাকা কীটনাশক ওষুধ। ফসলের খেতে রেখে স্তরে স্তরে পলি জমে যা কৃষকের জন্য হয়ে উঠে আগামী দিনের স্বপ্ন। বর্ষায় জমিতে পলি পড়ার ফলে জমি উর্বরা শক্তি ফিরে পায়।
