সর্বমোট ২৮৪ জন যাত্রী ও ক্রুসমেত মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্সের উড়োজাহাজ এমএইচ-৩৭০ নিখোঁজ হইয়াছিল গত ৮ মার্চ। রহস্যজনকভাবে লাপাত্তা হইয়া যাওয়া সেই উড়োজাহাজটির কোনো হদিস মিলে নাই অদ্যাবধি। শুকায় নাই স্বজনহারা অসংখ্য নারী-পুরুষ ও শিশুর হূদয় বিদীর্ণ করা শোকাশ্রু। ইহার মধ্যেই বিশ্ববাসীকে শুনিতে হইয়াছে আকাশ ভাঙিয়া পড়ার মতো বিপর্যয়কর আরেকটি দুঃসংবাদ। এইবার নেদারল্যান্ডস হইতে মালয়েশিয়া আসার পথে গত বৃহস্পতিবার ইউক্রেনের আকাশসীমায় বিধ্বস্ত হইয়াছে মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্সের উড়োজাহাজ এমএইচ-১৭। ক্রু ও যাত্রী মিলাইয়া তিন শতাধিক আরোহীর কেহই বাঁচিয়া নাই। মর্মান্তিক এই ঘটনায় সারা বিশ্বের মানুষ যখন শোকে রুদ্ধবাক, অন্যদিকে তখন চলিতেছে পরস্পরকে দোষারোপের চিরাচরিত খেলা। কারণ ইতোমধ্যেই স্পষ্ট হইয়া গিয়াছে যে, ইহা কোনো দুর্ঘটনা নহে, ইহা একটি ঠাণ্ডা মাথার হত্যাকাণ্ড। সভ্য সমাজের সকল রীতিনীতি লঙ্ঘন করিয়া ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে বিমানটিকে ভূপাতিত করা হইয়াছে। জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাসহ বিশ্ব নেতৃবৃন্দ এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানানোর পাশাপাশি স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক তদন্তের কথা বলিয়াছেন। কিন্তু কোনোকিছুই যে এই ক্ষতি পূরণ করিতে পারিবে না এবং যাহারা প্রিয়জন হারাইয়াছেন তাহাদের হূদয়ের অন্তহীন হাহাকারের ক্ষতে বিন্দুমাত্র সান্ত্বনার প্রলেপ হিসাবে কাজ করিবে না—তাহা বলার অপেক্ষা রাখে না। শুধু এইটুকুই বলা যাইতে পারে যে, ঘৃণ্য ও কাপুরুষোচিত এই হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানাইবার ভাষাও আমাদের জানা নাই।
বিশ্ব নেতৃবৃন্দ বলিতেছেন বটে যে, স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক তদন্তের মাধ্যমে দোষী ব্যক্তিদের খুুঁজিয়া বাহির করা হইবে; কিন্তু বিশ্ব জুড়িয়া যাহা ঘটিতেছে সেই জটিল বাস্তবতা যদি আমরা ধর্তব্যের মধ্যে নাও রাখি—অন্তত ইতঃপূর্বে নিখোঁজ মালয়েশিয়ার উড়োজাহাজটির অভিজ্ঞতার নিরিখেও বলা যায় যে, তাহাদের এই বক্তব্যের ওপর ভরসা রাখা কঠিন হইয়া পড়িয়াছে। অবশ্য ইহাতে কোনো দ্বিমত নাই যে, দায়ী ব্যক্তিদের শুধু খুঁজিয়া বাহির করাই যথেষ্ট নহে—বিশ্ববাসীর নিরাপত্তার স্বার্থেই তাহাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া দরকার। স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়া দরকার এই ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনার পুনরাবৃত্তি। ইহা যে মানবতার বিরুদ্ধে এক ধরনের অপরাধ তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই। এই জাতীয় অপরাধের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র-জাতি-ধর্ম-বর্ণ ও মতাদর্শ নির্বিশেষে সকলেরই একাট্টা হওয়া দরকার। আমরা আশা করি, যাহাদের আকাশসীমায় এই জঘন্য অপরাধটি সংঘটিত হইয়াছে সেই রাশিয়া এবং ইউক্রেনের নেতৃবৃন্দও এই একটি ক্ষেত্রে অন্তত অকপটে সর্বাত্মক সহযোগিতার হাত প্রসারিত করিবেন। প্রসঙ্গত যেই কথাটি না বলিলেই নয় তাহা হইল—মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষও কোনোভাবেই তাহাদের দায় এড়াইতে পারিবেন না। বিশেষত মাত্র চারমাস আগে তাহাদের একটি উড়োজাহাজ নিখোঁজ হইবার পর যেই ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করা অত্যাবশ্যক ছিল—এই ক্ষেত্রে তাহার পরিচয় দিতে তাহারা শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হইয়াছেন। কারণ যেই এলাকায় উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত হইয়াছে ইউক্রেনের সেই সংঘাতপূর্ণ আকাশসীমায় বিমান চলাচলের ব্যাপারে ইতঃপূর্বেই সতর্কবার্তা জারি করা হইয়াছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের কয়েকটি সংস্থার পক্ষ হইতে। ইহাও নিশ্চিত করা হইয়াছিল যে, গত ২৩ এপ্রিল জারিকৃত ওই সতর্কবার্তা ২০১৫ সালের ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত বহাল থাকিবে। মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ কেন তাহা গ্রাহ্য করিলেন না—তাহা আমাদের বোধগম্য নহে।
এই মুহূর্তে আমরা গভীরভাবে শোকাহত। যাহারা মনুষ্যসৃষ্ট এই ট্র্যাজিডির শিকার হইয়াছেন তাহাদের শোকাহত স্বজন এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলির জনগণ ও সরকারের প্রতি জানাই আমাদের নিবিড় একাত্মতা ও গভীর সহমর্মিতা।
