নিরাপদ পোল্ট্রি মুরগি ও ইহার ডিম

আপডেট : ১৮ জুলাই ২০১৪, ২১:৩৭
পোল্ট্রি মুরগি ও ইহার ডিম নিয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণা প্রতিবেদন আলোচনায় উঠিয়া আসিয়াছে। প্রতিবেদনটি রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ আবুল হোসেন ও তাহার ছাত্র জুবাইর হাসানের যৌথ গবেষণার ফসল। ইহাতে দেখা যায়, যেই পোল্ট্রি মুরগিকে চামড়া শিল্পের বর্জ্য হইতে উত্পাদিত খাবার খাওয়ানো হয় এবং অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়, তাহার এক কেজি মাংসে ক্রোমিয়ামের পরিমাণ পাওয়া গিয়াছে ২৪৯ হইতে ৪৫৬১ মিলিগ্রাম। অথচ খাদ্যে এই রাসায়নিক পদার্থটির কাম্য উপস্থিতি ১০ হইতে ৬০ মিলিগ্রাম মাত্র। এই সীমা অতিক্রম করিলেই তাহা বিষাক্ত খাদ্যে পরিণত হয় এবং ইহা মানব স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হইয়া পড়ে। সমপ্রতি এই গবেষণা প্রতিবেদনটি একটি অনলাইন ভিত্তিক আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হইয়াছে। ঢাকাস্থ হাজারীবাগের ট্যানারি শিল্প-কারখানার বর্জ্য এবং একটি সিটি মার্কেটের পোল্ট্রি মুরগির মাংস পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়া এরূপ ফলাফল পাওয়া গিয়াছে বলিয়া জানা যায়। অবশ্য ইহাই এই সংক্রান্ত প্রথম গবেষণা নহে। ইহার আগে ২০১২ ও ২০১৩ সালে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা সংস্থার রিপোর্টে বলা হয়, প্রায় ৪৮ ভাগ পোল্ট্রি খাদ্যে ট্যানারির বর্জ্যের অস্তিত্ব বিদ্যমান। তাহারা মুরগির ডিম ও মাংসে মাত্রাতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতিও খুঁজিয়া পান। ট্যানারির বর্জ্য খাদ্য হিসাবে ব্যবহারের কারণে পোল্ট্রি মুরগির দাম হয় সস্তা। তবে দীর্ঘমেয়াদে তাহা গ্রাহকের জন্য স্বাস্থ্য ঝুঁকির কারণ হইয়া দাঁড়ায়। অন্যদিকে ফার্ম পর্যায় হইতে বিক্রয় অবধি একাধিকবার অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করা হয় মুরগির উপর। ইহার উদ্দেশ্য মুরগিকে রোগ ও যথাসম্ভব মৃত্যুর হাত হইতে রক্ষা করা। কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত মাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহারে হিতে বিপরীত হয়। এরকম মুরগির মাংস ও ডিম নিয়মিত খাইবার কারণে পাঁচ হইতে ছয় বত্সরের মধ্যে যে কাহারও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হারাইয়া ফেলার আশঙ্কা তৈরি হয়। এই অভিমত বিশেষজ্ঞদের। শুধু তাহাই নহে, এরূপ মুরগি ও মুরগির ডিম ভক্ষণের মাধ্যমে একসময় মানবদেহে নানা অসুখ-বিসুখ বাসা বাঁধিতে পারে। যেমন-ক্যান্সার, আলসার, লিভার সিরোসিস, কিডনির অকার্যকারিতা ইত্যাদি। ইতোমধ্যে আমাদের সমাজে এসব রোগের প্রকোপ বাড়িয়া গিয়াছে বলিয়া প্রতীয়মান হইতেছে। তাই এ ব্যাপারে সতর্ক হওয়া জরুরি হইয়া পড়িয়াছে। অবশ্য পোল্ট্রি শিল্পের সহিত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা পোল্ট্রিখাদ্যে ট্যানারি বর্জ্য মিশাইবার কথা অস্বীকার করিয়াছেন। তাহার পরও ইহার বাস্তবতাকে উড়াইয়া দেওয়া যায় না। সাধারণত পোল্ট্রি খাদ্যে ব্যবহূত প্রোটিন আমদানি করা হয় বিদেশ হইতে। যেহেতু এসব প্রোটিনের দাম ইদানীং বাড়িয়া গিয়াছে, তাই তাহাতে ভেজাল দেওয়ার প্রবণতাও বাড়িয়াছে। এই প্রবণতা হইতেই ট্যানারি বর্জ্য মিশানো হইতেছে পোল্ট্রি খাদ্যে। ইহা আদৌ মুরগির খাদ্য হইতে পারে কিনা, তাহা বিশেষজ্ঞরা আরও ভাল বলিতে পারিবেন। তবে ইহার দীর্ঘমেয়াদে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া না থাকাটাই অস্বাভাবিক। আমাদের জানা মতে, দুই শতাধিক ট্যানারি ফ্যাক্টরি আছে হাজারীবাগে। সেখানে কোন পোল্ট্রি ফিড ফ্যাক্টরি নাই। এ সংক্রান্ত ৫৮টি রেজিস্ট্রীকৃত ফিড মিল আছে ঢাকা জেলার অন্যত্র গাজীপুরে তাহলে সাধারণভাবে প্রশ্নও উঠিতে পারে, ট্যানারি বর্জ্যের মিশ্রণ চলে কিভাবে? রেজিস্ট্রীকৃত ফিড মিলগুলিই কি কোন কারসাজি করিতেছে নাকি সত্যিই কোন অবৈধ কারখানার অস্তিত্ব আছে, তাহা অনুসন্ধান করিয়া প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্ব প্রশাসনের। যেহেতু এভাবে পোল্ট্রি খাদ্য তৈরির কোন বিধান নাই, নাই এই সংক্রান্ত কারখানার কোন অনুমোদন, তাই এই ধরনের ব্যবসার অস্তিত্ব থাকাও কাম্য নহে। লক্ষণীয় যে, আমরা যখনই জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি স্বরূপ কোনকিছুর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানাই, তখন প্রায়শ সরকারের তরফ হইতে জনবল বা লজেস্টিক সাপোর্টের অভাবের অজুহাত তুলিয়া ধরা হয়। তবে এখন এইসব অভিযোগ আর মানুষ শুনিতে চাহেন না। কেননা বিষমুক্ত খাবারের ব্যাপারে কোনপ্রকার আপোষ চলে না ও চলিতে পারে না। তাই পোল্ট্রি মুরগিকে স্বাভাবিক ও নিরাপদ খাবার-দাবার দিতে হইবে। রোগ-বালাইয়ে ঔষধ প্রয়োগ করিতে হইবে চিকিত্সকের পরামর্শ ও মাত্রা অনুযায়ী। এ ব্যাপারে সকলকে সচেতনতারও পরিচয় দিতে হইবে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন