‘নন্দিত নরকে’ বা ‘শঙ্খনীল কারাগার’ থেকে নয়, হুমায়ূন আহমেদকে আমি চিনি ‘এইসব দিনরাত্রি’ থেকে অর্থাত্ তিনি লেখালেখি শুরু করার একযুগ পর থেকে। তখন গ্রামাঞ্চলে বই পাওয়া বা বই পড়ার অত সুযোগ ছিল না। এসএসসি পাস করে শহরে যাবার পর কিছু বই পড়ার সুযোগ পেলেও হুমায়ূন আহমেদের বই পড়ার সৌভাগ্য হয়নি। বিটিভিতে ‘এইসব দিনরাত্রি’ ধারাবাহিক নাটকটির কল্যাণে নাট্যকার হিসেবে হুমায়ূন আহমেদকে প্রথম চেনা বা জানার সুযোগ হয়। নাটকটি আমাদের কাছে এত ভাল লাগত যে আমরা প্রচারকালের ঐ সময়টুকু যে কোনোভাবেই হোক মুক্ত রাখতাম। একটি ঘটনা বলি, তখন আমাদের পরীক্ষা শুরু হল এবং সিদ্ধান্ত হল পরীক্ষা চলাকালীন কমনরুম খোলা হবে না, তার মানে টিভি দেখা বন্ধ। আমি ছিলাম হোস্টেলের মনিটর, চাবি আমার কাছে। নাটক শুরুর আগে কয়েকজন বন্ধু এসে অনুরাধ করল রুম খোলার জন্য। আমি হোস্টেল সুপারের দোহাই দিয়ে তাদের বিদায় দিলাম এই বলে যে পরীক্ষার আগের রাতে টিভি দেখা যাবে না। কিন্তু নাটক শুরু হওয়ার মুহূর্তে নিজেই কমন রুম খুলে ঢুকলাম এবং দরজা চেপে রেখে টিভি অন করলাম যথাসম্ভব কম সাউন্ড দিয়ে যাতে পড়ালেখায় কারও কোনো বিঘ্ন না ঘটে। ইতোমধ্যে এক বন্ধু এসে ঢুকল, মুখে আঙুল চেপে তাকে চুপ থাকার নির্দেশ দিলাম। এভাবে এক এক করে প্রায় সবাই হাজির হল নাটকটি দেখতে। হুমায়ূন আহমেদের নাটকে কী জাদু আছে সেদিন থেকেই বুঝতে পেরেছি। তারপর তো একে একে অয়োময়, বহুব্রীহি, কোথাও কেউ নেই, আজ রবিবার ইত্যাদি জনপ্রিয় সব ধারাবাহিকগুলো প্রচারিত হল। বাংলা সাহিত্যের লেখক হিসেবে একমাত্র হুমায়ূন আহমেদই দর্শককে রাস্তায় নামাতে পেরেছিলেন— বাকের ভাইয়ের ফাঁসি না হবার দাবিতে মিছিল করেছিল দর্শক। তার মানে তিনি বাকের ভাই চরিত্রটির বাস্তব রূপ দিতে পেরেছিলেন। তদ্রূপ মিসির আলি বা হিমু চরিত্র দুটি তাঁর লেখক জীবন সার্থক করেছে। বাংলা কথাসাহিত্যের প্রবাদপুরুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন হুমায়ূন আহমেদ তাঁর অগণিত পাঠকের হূদয়ে। হুমায়ূন আহমেদের প্রিয় বিষয় ছিল জোছনা। তাই তিনি বলেছেন, ‘প্রবল জোছনা আমার মধ্যে একধরনের হাহাকার তৈরি করে। সেই হাহাকারের উত্স অনুসন্ধান করে জীবন পার করে দিলাম।’
হুমায়ূন আহমেদ একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, নাট্যকার, গীতিকার, বিজ্ঞান কল্প-কাহিনিকার, নাট্য পরিচালক, নাট্য নির্দেশক, চলচ্চিত্র নির্মাতা প্রভৃতি বিষয়ে খ্যাতি অর্জন করেছেন। তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্রের মধ্যে দুই দুয়ারি, আগুনের পরশমণি, শ্রাবণ মেঘের দিন, শ্যামল ছায়া, ঘেঁটুপুত্র কমলা অসম্ভব জনপ্রিয়তা পায়। ১৯০১-১৯৭১ পর্যন্ত সময়কে তিনি তিনটি উপন্যাসের (মধ্যাহ্ন, মাতাল হাওয়া, জোছনা ও জননীর গল্প) মাধ্যমে ধারণ করেছেন ‘সেই সময়’ গ্রন্থে। তিনি দুই শতাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন এবং সর্বশেষ ‘দেয়াল’ নামে একটি ইতিহাসনির্ভর উপন্যাস উপহার দিয়ে গেছেন আমাদের। হুমায়ূন আহমেদ ১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলাধীন কুতুবপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা ফয়জুর রহমান আহমদ একজন পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন, লেখালেখি করতেন এবং তিনি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে শহীদ হন। মাতা আয়েশা আখতার খাতুনও লেখালেখি করেন। তিনি বগুড়া জেলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেন এবং রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে সব গ্রুপে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। পরে ঢাকা কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নশাস্ত্রে প্রথম শ্রেণিতে বিএসসি (সম্মান) ও এমএসসি ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর মার্কিন যুক্তরাষ্টের নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে পলিমার রসায়ন বিষয়ে গবেষণার মাধ্যমে পিএইচডি করেন। ১৯৭৩ সালে তিনি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন এবং পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন। ছাত্রদের কাছে অনেক জনপ্রিয় শিক্ষক হলেও লেখালেখির কারণে তিনি অধ্যাপনা পেশা ছেড়ে দেন এবং আমৃত্যু লেখালেখি করেন। তাঁর লেখালেখি ও কৃতকর্মের জন্য অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন।
এই প্রতিভাধর গুণী মানুষটি হাজার হাজার ভক্তকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে ১৯ জুলাই ২০১২ নিউইয়র্কের বেলেভ্যু হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে। আজ তাঁর ২য় মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধা আর ভালবাসা জানাই।
লেখক :কবি ও শিশুসাহিত্যিক
