হাওরে ভাড়ায় ধান রোপণ ও কর্তনযন্ত্র

আপডেট : ১৯ জুলাই ২০১৪, ২১:০৬
সময়ের বিবর্তনে অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে অনেক। অধিক উত্পাদন ব্যয়, ফসলের কম দামে বর্তমানে কৃষকের অবস্থা নাকাল। ধান চাষে কৃষক আগ্রহ হারিয়ে ফেলার উপক্রম। হাজার হাজার শ্রমিক দেশের বিভিন্ন প্রান্ত হতে হাওরে ধান রোপণ, পরিচর্যা ও কর্তনের জন্য আসতো। কিন্তু বর্তমানে সর্বত্রই কর্মসংস্থান সৃষ্টি হওয়ায় সেভাবে হাওরে শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। এ অবস্থায় ধানের উত্পাদনশীলতা (Productivity) এবং মোট উত্পাদন (Production) কমে যাবার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। ভয়াবহ শংকা, আতঙ্কে এবং অনন্যোপায় হয়েই তারা ধান চাষ করে। মান্ধাতার আমলের কৃষি পদ্ধতি দিয়ে ক্রমবর্ধমান উত্পাদন ব্যয় এবং পরিবেশ, প্রতিবেশ পরিবর্তনের কারণে কৃষকের অস্তিত্ব বিলীন হবার উপক্রম। জলবায়ুজনিত পরিবর্তনেও হাওরের কৃষি এখন অনেক জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ। প্রতিনিয়ত তাদের আগাম বন্যা, খরা, শিলাবৃষ্টি ও রোগবালাইয়ের মুখোমুখি হতে হয়। এক মুহূর্তের বিলম্বে ঘটে যেতে পারে ভয়াবহ ক্ষতি; তলিয়ে যেতে পারে পাকা ফসল। কৃষকের চোখের লোনা জল আর বানের গোলা জল একাকার হয়ে যায়। বন্যা হতে ফসল রক্ষায় আগাম বীজতলা করলে ধান চিটা হয়। আবার দেরিতে বপন করলে বন্যায় ডুবে যায়। শাখের করাতের নিচে হাওরের ফসল; এ যেন বেঁচে থাকার জন্য মৃত্যুর দিকে ধাবিত হওয়াসম। শ্রমিকেরও প্রচণ্ড অভাব। সঠিক সময়ে কৃষি কার্যাদি সম্পাদনের মাধ্যমে এসব আপদ-বালাই হতে ফসল রক্ষার জন্য কৃষি যান্ত্রিকীকরণ ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। কৃষি যান্ত্রিকীকরণ ব্যতীত প্রতিযোগিতামূলক উত্পাদন বাস্তবতায় টিকে থাকাই দায় হবে। সরকার কৃষি ক্ষেত্রে বিভিন্ন রকম প্রণোদনা দিচ্ছে। উত্পাদন বৃদ্ধি, উত্পাদন খরচ হ্রাস, কর্তনোত্তর ক্ষতি কমানো, ফসলের মান ও গুণ বজায় রাখা ও ফসলের নিবিড়তা বাড়াতে কায়িক শ্রম নির্ভরতা কমিয়ে যন্ত্র ও প্রযুক্তি নির্ভরতা বাড়াতে হবে। এ অতিরিক্ত শ্রমশক্তি আমরা অন্য ক্ষেত্রে নিয়োজিত করতে পারবো। এ উপলব্ধি থেকে বর্তমান সরকার কৃষি যান্ত্রিকীকরণের উপর অনেক গুরুত্ব দিয়েছে। ব্যক্তি ক্ষতি বা কম উত্পাদনে জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তায় বড় রকমের প্রভাব ফেলবে। তাই, সরকার বিভিন্ন রকম প্রণোদনা দিচ্ছে। প্রথম দফায় যন্ত্রের মূল্যের উপর ২৫% হারে ভর্তুকি বাবদ প্রায় ১৬০ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। ‘খামার যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে ফসল উত্পাদন বৃদ্ধি-২য় দফা প্রকল্পের আওতায়’ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ১৭২ কোটি ১৯ লক্ষ ২৫ হাজার টাকা। বাস্তবায়নকাল ২০১৩-১৮ সাল। এ প্রকল্পের পরিচালক কৃষি প্রকৌশলী নাজিম উদ্দিন শেখ জানান, এ প্রকল্পের আওতায় ২৫% হারে ২৫ হাজার পাওয়ার টিলার, ৫ হাজার পাওয়ার থ্রেসার, ৭০০টি কম্বাইন হার্ভেস্টার (বড় ১০০, মাঝারী ৬০০), রাইস ট্রান্সপ্লান্টার ২০০টি এবং ১,০০০টি ফুট পাম্পের উপর ভর্তুকি প্রদান করা হবে। এর সাথে থাকবে পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রদর্শনী প্লট ও মাঠ দিবসের (১২৫+১৩,০২০টি) আয়োজন। রাইস ট্রান্সপ্লান্টার ব্যবহার করতে ট্রে’তে বিশেষভাবে তৈরি উত্পাদিত ধানের চারা লাগবে। আবার কম্বাইন হার্ভেস্টারে ধান কাটার সুবিধার জন্য রাস্তার পাশের জমি আগে রোপণ করে ভিতরে যেতে হবে। সে লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার আয়োজন (৩৯৮টি) যেমন থাকবে, তেমনি যন্ত্রপাতি মেরামতের জন্য থাকবে মেকানিজ (৫০)। এ প্রকল্প হতে একটি কৃষি যন্ত্রপাতি শুমারীও করা হবে। সেই সাথে করা হবে কৃষি যন্ত্রপাতির প্রভাব নিয়ে একটি গবেষণা মূল্যায়ন। একটি কম্বাইন্ড হার্ভেস্টার বা একটা রাইস ট্রান্সপ্লান্টারের দাম পড়বে যথাক্রমে প্রায় ১০- ২৭ লক্ষ টাকা ও সাড়ে ৩ লক্ষ টাকা। আমাদের অধিকাংশ কৃষক ক্ষুদ্র কৃষক, জমিগুলো খণ্ড বিখণ্ড। যৌথ ও বড় কৃষক পরিবারগুলো ভেঙে যাওয়ায় আর্থিক অবস্থাও দুর্বল। সে ভর্তুকি মূল্যেই হোক বা বাকিতেই হোক ! ক’জনের সামর্থ্য আছে এ যন্ত্রগুলো কেনার ? হাওরে বছরে মাত্র একটি ফসল উত্পাদন হয়। তাই একটি কম্বাইন্ড হার্ভেস্টার বা রাইস ট্রান্সপ্লান্টার মাত্র স্বল্প ক’দিন কাজে নিয়োজিত থাকবে। অধিক বিনিয়োগের মূল্যবান এ যন্ত্রগুলো বাকি সময় অলসভাবে পড়ে থেকে নষ্ট হবার আশঙ্কার পাশাপাশি বিনিয়োগ উঠে না আসার সম্ভাবনা থেকেই যাবে। যন্ত্রের কার্যকারিতা বা গোলযোগের মতো বড় বিষয়টির দায়বদ্ধতা কি কৃষক বহন করতে পারবে ? ব্যাংক লোন পাওয়ার কোনো নিশ্চয়তা নেই। কয়েকজনে মিলে কিনে নিজেরা ব্যবহার বা ভাড়া খাটাবে, সেটাও জটিল কাজ। সমবায় কালচার এখনো আমাদের মাঝে সেভাবে গড়ে উঠেনি। ব্যক্তি উদ্যোগে অন্যত্র নিয়ে গিয়ে ব্যবহার করাও সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে কৃষকের পক্ষে সরকারের টাকায় কেনা কম্বাইন্ড হার্ভেস্টার এবং রাইস ট্রান্সপ্লান্টার ভাড়ায় ব্যবহারের সুযোগ দাবি করা অযৌক্তিক হবে না। এটা বরং অধিক যুক্তিযুক্ত এবং জনগুরুত্বপূর্ণ। এ ব্যবস্থা থাকা উচিত। লেখক: কৃষি প্রকৌশলী ও সার্ক এগ্রিকালচার সেন্টার, ঢাকা। niazpasha¦yahoo.com ; www.saarcagri.org

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন