ঈশপের একটি উপকথা এইরকম—ঝরনার ধারে জলপান করিতেছিল একটি হরিণ শাবক। বনের প্রতাপশালী সিংহটি হরিণশাবককে দেখিয়া অজুহাত খুঁজিতে লাগিল কী করিয়া বধ করা যায়। বলিল, ‘রে পুচকে! এতবড় সাহস, আমার পানি ঘোলা করিস!’ হরিণশাবক বলিল, ‘আমি তো ভাটিতে, স্রোতে আপনার পানি আমার নিকট আসিতেছে।’ সিংহ বলিল, ‘আজ না হোক গত বত্সর আমার পানি তুই ঘোলা করিয়াছিলি।’ হরিণশাবক বলিল—‘আমার তো তখন জন্মই হয় নাই।’ সিংহ বলিল, ‘বেশ! তুই ঘোলা না করিস, তোর মা করিয়াছিল। এই অপরাধে এখন তোকে আমি খাইব।’ কথাটির আরও একটি সহজ প্রকাশ আছে—খলের ছলের অভাব হয় না। ফিলিস্তিন ভূূখণ্ডে গত ৮ জুলাই ইসরাইলের সর্বশেষ হামলার সূত্রপাত ঘটে এই ধরনের একটি অজুহাতে। ইসরাইলি তিন কিশোরকে অপহরণ ও হত্যার জন্য ইসরাইল দায়ী করে হামাসকে। হামাস তাহা অস্বীকার করে। ইহার পর ইসরাইল অভিযোগ করে গাজা হইতে তাহাদের দিকে রকেট ছোঁড়া হইতেছে। অতঃপর ‘অপারেশন প্রটেক্টিভ এজ’ শুরু করে ইসরাইল। বলা যায়, বারুদ জমানোই ছিল, একটুখানি স্ফুলিঙ্গের ছুতা পাইয়া তাহাকে দাউ দাউ করিয়া জ্বলিবার সুযোগ দেওয়া হইল। ১৯৪৮ সালের পর, বত্সরের পর বত্সর এই হানাদারি সমানে চলিতেছে। ইতিহাসটা যেহেতু গত সপ্তাহে শুরু হয় নাই। সর্বশেষ গতকাল শনিবার ইসরাইলের নূতন হামলায় নিহত গাজায় নিহতের সংখ্যা তিন শত পার হইয়াছে!
এইসব হামলায় কাহারা মরিতেছে, আহত হইতেছে? তাহারাই—যাহাদের সহিত এই হানাহানির সশস্ত্র অংশের কোনো সংশ্রব নাই। এবং আরও ভয়াবহ কথা হইল—তাহাদের মধ্যে শিশুর সংখ্যা মর্মান্তিকভাবে বেশি। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধক্ষুব্ধ নানান অঞ্চলে জন্ম নেওয়া শিশু যে পরিবেশে বড় হইতেছে, তাহা কালিমালিপ্ত করিতেছে বিশ্বমানবতার মুখ, আঁধারে ঢাকিয়া দিতেছে মনুষ্যত্বের আলোকশিখাকে। ইতিহাসের নির্মম শ্লেষ হইল—এই ইসরাইলের অধিবাসীরা ৬৬ বত্সর পূর্ব অবধি নিজেরাও শিকার হইয়াছিল নৃশংসতার, গণহত্যার। আজ তাহারাই ‘গণহত্যাকারী’দের ভূমিকায় অবতীর্ণ হইয়াছে। ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইহুদিদের জন্য ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর হইতেই স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবিতে ফিলিস্তিনিদের সংগ্রাম শুরু হয়। অনেক রক্তনদী সৃষ্টি হইলেও আজও তাহাদের সেই স্বপ্ন পূরণ হয় নাই। আর তাহা পূরণ না করিতে যাহা যাহা করা দরকার, যেই সব কৌশল অর্জন করা দরকার—তাহার সব কিছুই করিতেছে ইসরাইল। তাহাদের পক্ষাবলম্বী শক্তিশালী গণমাধ্যমে তাই এই নৃশংসতাকে দেখানো হয় ভিন্ন চোখে—ইতিহাসে সর্বাধিক ‘সংযত’ দেশ হিসাবে ইতিমধ্যেই নিজেকে নাকি প্রতিষ্ঠিত করিয়াছে ইসরাইল! বিশ্বমিডিয়ার বড় একটি অংশের বয়ানে হামাস ‘জঙ্গি’ মাত্র, এবং তাহারা বেসামরিক ফিলিস্তিনিদের ‘মানব-ঢাল’ হিসাবে ব্যবহার করে। সুতরাং গাজায় শিশু ও নারী এবং সাধারণ মানুষ নিহত হইলে তাহার দায় ইসরাইল হামাসের ওপরেই চাপাইয়া দেয়। গাজায় বার বার জনজীবন শুধু বিপর্যস্তই হয় না, জাতিসংঘের ত্রাণ-শিবিরে অন্তত ১৭ হাজার শরণার্থী রহিয়াছে, যাহাদের ভবিষ্যত্ সম্পূর্ণ অনিশ্চিত। অভিযোগ রহিয়াছে, এমন একটা সময় এই যুদ্ধোন্মাদনা শুরু করা হইল যখন মাহমুদ আব্বাসের নেতৃত্বাধীন ফিলিস্তিনীয় ন্যাশনাল অথরিটি এবং হামাসের মধ্যে মিলনচুক্তি সম্পাদিত হইয়াছে গাজা ও ওয়েস্ট ব্যাংক লইয়া একটি অভিন্ন নির্বাচিত ফিলিস্তিনীয় সরকার গড়ার জন্য। ইসরাইল ওই চুক্তি ও তাহাদের ঐক্যের ঘোর বিরোধী। ফিলিস্তিনীদের ঐক্য ইসরাইলের আকাঙ্ক্ষিত নহে।
তবে কথা আরও রহিয়াছে। সম্ভবত কাহারো কোনো ঐক্যেই ইসরাইলের কিছু যায় আসে না। তাহাদের কৌশলের গভীরতা অতলস্পর্শী যেন। যাহা বাহ্যত বোঝা যায়, তাহাই বড় সত্য নহে। আসল সত্য হইল, যাবতীয় কৌশলে তাহারা নির্মূল করিতে চাহে ফিলিস্তিনিদের, দখল করিতে চাহে সম্পূর্ণ ভূমি। সেই অভিলক্ষ্যে যেইভাবে অগ্রসর হওয়া দরকার তাহারা—কখনও থামিয়া, কখনও পিছাইয়া, কখনও আপোস করিয়া, আবার কখনও ক্ষিপ্ত হিংস্রতায় ঝাঁপাইয়া পড়িয়া কার্যহাসিল করিতেছে। তাহাতে মানবতার হরণ ঘটিলে, বিশ্ববিবেক আহাজারি করিলে তাহাদের কিছুই আসে যায় না। এ-বিষয়ে এই সম্পাদকীয় কলামটিও কোথাও আঁচড় কাটিতে পারিবে না এক বিন্দু। সেই ক্ষেত্রে আমরা যেন দর্শক মাত্র।
