স্যাডিস্ট আখ্যান

আপডেট : ১৯ জুলাই ২০১৪, ২১:৫১
এখনকার ‘ইনিড ব্রাইটন’-পড়া শৈশবের কথা বলছি না। বলছি আমাদের সেই সরল মায়াবী অভিমানী শৈশবের কথা—যে শৈশবের অলস দুপুরের (এখনকার বাচ্চাদের কোনো অলস দুপুর নেই) বুকে কান পাতলেই ভেসে আসে সেই আজব রাজার ছড়া—‘আজব দেশের ধন্যি রাজা, দেশজোড়া তার নাম, বসলে বলেন চলরে তোরা, চললে বলেন থাম।’ বিস্ময়শাসিত শিশুমন ভাবতো কেন রাজা এমন ‘আজব’? ভাবনার ধারাবাহিকতায় কৈশোরে এসে বুঝেছিলাম, রাজা আসলে ভীষণ কর্তৃত্বপরায়ণ। আর ডমিনিটিংদের তো সিভিয়ার অ্যাটিট্যুড সমস্যা থাকেই। এখন মনে হয়, না তাও না। ওই রাজা আসলে স্যাডিস্ট—যিনি অন্যকে আঘাত করে আনন্দ পান। যে ভয়ার্ত শিশুমন মনে মনে প্রার্থনা করত কখনও যেন ওই ভয়ংকর রাজার সঙ্গে দেখা না হয়, সেই মনই এখন ছড়ার পাতা থেকে ছবির রাজাকে জীবন্ত মুখোমুখি করে বসতে চায়। পরিবর্তিত মন বুঝেছে, আজব দেশের ধন্যি রাজা যতটা স্যাডিস্ট তারও চেয়ে ঢের স্যাডিস্টদের ঘেরাটোপের মধ্যেই আমাদের বসবাস। ভেবে দেখুন কেনিয়ার আল শাবাব, নাইজেরিয়ার বোকো হারেম, সিরিয়া কিংবা ইরাকের আইসিস গ্রুপের পিউরিটান স্যাডিস্ট জিহাদিস্টদের কাছে আমাদের ধন্যি রাজা তো রীতিমতো লিবারেল স্যাডিস্ট। পত্রিকায় দেখলাম, নিউইয়র্কের হুইস্টনে অজ্ঞাতনামা বন্দুকধারীর গুলিতে চার শিশু মারা গেছে। এই অজ্ঞাতনামা বন্দুকধারী কারা? স্যাডিস্ট, নেতাদের নামই স্যাডিস্ট। আমাদের প্রাচ্যের ইতিহাসের সিলেবাসে স্যাডিস্ট হিসেবে একজন রাজনীতিকের নাম খুব ঘটা করে বর্ণনা করা হয়েছে। এই দুর্ভাগ্যবান শাসকের নাম মুহম্মদ বিন তুঘলক। সিলেবাসের বাইরের ইতিহাস পড়ে জেনেছি মোটেই তিনি স্যাডিস্ট টাইপের ছিলেন না। রাজধানী বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চয়ই নাগরিকদের কষ্ট দেয়ার জন্য তিনি করেননি। আর বিকেন্দ্রীকরণ যে রাজধানী আসক্ত নাগরিকেরা সহজভাবে নেন না, তার প্রমাণ ভূরি ভূরি মেলে। আমাদের অতিমাত্রায় রাজধানীপ্রীতির কারণেই বিআইডাব্লিউটিএ’র ভবন একবার বরিশালে স্থানান্তর করে আবার ঢাকায় ফিরিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছিল সরকার। আমাদের প্রধানমন্ত্রীতো পদ্মার ওইপাড়ে একখানা হংকং সিটি প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার কথা বলেছেন। বুঝি না। কেউ কি নেই তার পাশে, যিনি হংকং কিংবা সিঙ্গাপুরের বদলে একটা ‘শ্রাবন্তী নগরী’ তৈরির পরামর্শ দিতে পারে তাকে। কী জানি, তারা হয়তো মনে করেন, শান্তি মানে ফ্লাইওভার, মেট্রোরেল আর বিমানবন্দর, আর সেইসঙ্গে কিছু পাঁচতারা হোটেল। মনে পড়ে যায় স্থপতি এবং নগর পরিকল্পনাবিদ লুই কানের কথা। যিনি বলেছিলেন, ‘আমি যখন একটা শহরের পরিকল্পনা করি তখন লক্ষ্য থাকে এটি হবে এমন একটি শহর যার পথে পথে হাঁটতে হাঁটতে একজন তরুণ তার জীবনের লক্ষ্য এবং ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা সাজিয়ে নিতে পারবে।’ ঢাকার জন্যও পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। সেই পরিকল্পনা তছনছ হয়েছে আমাদের ক্ষমতাধর স্যাডিস্টদের অন্যায় তত্পরতায়। কেবল নীতি-নির্ধারণী জগতেই নয়, স্যাডিস্টদের দীর্ঘ হেজিমনি আছে প্রেমের তল্লাটেও। যে কারণে প্রায় বাধ্য হয়েই উকিল মুনশীকে লিখতে হয়েছিল সেই চূড়ান্ত আত্মসমর্পণের গান ‘আমার গায়ে যত দুঃখ সয়, বন্ধুয়ারে কর তোমার মনে যাহা লয়।’ কিন্তু ‘আমি তাই করি ভাই যখন চাহে এ মন যা, আমি উন্মাদ, আমি ঝন্্ঝা’ এরকম বাক্য লেখায় নজরুলকে স্যাডিস্ট ভাববার কোনো কারণ নেই। উত্তর কবি নিজেই দিয়েছিলেন। বড় বিষ জ্বালা এই বুকে... দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া গিয়াছি... মুখে। নজরুলকে যারা ক্ষেপিয়ে তুলেছিলেন বিশ শতকে, তাদেরই জাগ্রত অতৃপ্ত আত্মা লণ্ডভণ্ড করে দিচ্ছে আমাদের মানবিক চিন্তা আর শুভবোধকেও। মাদার তেরেসার ভাষায় এইসব মানুষই বোধহয় এক একটা শিক্ষা। সেই যে মাদার বলেছিলেন, ‘কিছু কিছু মানুষ পৃথিবীতে আসে আশীর্বাদ হয়ে, আর কিছু কিছু মানুষ আসে শিক্ষা হয়ে। জীবনভর যাদের সঙ্গে পরিচয়টাই একটা শিক্ষা (শাস্তি অর্থে) হিসেবে থেকে যায়। স্যাডিজমের বিস্তর উদাহরণ আছে এই ভুখণ্ডে। সতীদাহ প্রথাকে যারা কৌলিন্যবাদের অংশ ভাবতেন তারা স্যাডিস্ট। কন্যাসন্তান জন্মদানের অপরাধে যারা অবিশ্বাস্য নিপীড়ন চালান নারীর ওপর, তারা স্যাডিস্ট। প্রেম প্রত্যাখ্যাত এসিডবাজ স্যাডিস্ট, যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে যেসব মতলববাজ ইনিয়ে বিনিয়ে সাফাই গায়, তারা স্যাডিস্ট। দৃষ্টান্ত আছে আরো ঢের। ভালো হতো যদি পুরো বিষয়টিকেই গুরুত্বহীন করে দেয়ার জন্য সুকুমার রায়ের ছড়া খানিক বদলে দেয়া যেত। সবচাইতে বড় স্যাডিস্ট, পাউরুটি আর ঝোলাগুড়। কিন্তু বলতে পারছি না, প্রশ্নটি যখন দেশ আর দেশের স্বার্থ, তখন কোনো তরল আলাপ চলে না। সাকিব আল হাসানকে যারা ডিজিটাল শূলে চড়ালেন, তারা কি মহান যিশুকে আরেকবার স্মরণ করবেন—‘পাথরটি সেই ছুঁড়ে মারো ওই ব্যভিচারিণীর দিকে, যে নিজে কখনও পাপ করোনি।’ সাকিব যদি স্যাডিস্ট হয় ...। লেখক : কথাসাহিত্যিক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন