একথা আমরা অনেক সময় ভুলে যাই যে, আমরা সাগর পাড়ের দেশের মানুষ। বাংলাদেশের সমগ্র দক্ষিণদিক জুড়ে রয়েছে বঙ্গোপসাগর। এই উপসাগর যুক্ত হয়েছে ভারত মহাসাগরে। ‘বঙ্গ’ নামের ভূখণ্ডের রয়েছে অতি প্রাচীন অতীত। সেটির প্রধান অংশ নিয়েই এখনকার বাংলাদেশ। সেই ‘বঙ্গ’ ভূখণ্ডের নামে যে সাগরের নামকরণ, সেটিই হলো বঙ্গোপসাগর। ইংরেজরা নাম দিয়েছিল Bay of Bengal। সেই বঙ্গোপসাগরের সমুদ্রসীমা নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিরোধটি আন্তর্জাতিক সালিশি ট্রাইব্যুনালে শান্তিপূর্ণভাবে নিষ্পত্তি হয়েছে। সালিশি নিষ্পত্তিতে আমাদের প্রাপ্তির পরিমাণ নিয়ে তর্ক-বিতর্ক হচ্ছে। এ বিতর্ক হয়তো আরো চলবে। কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো, সাগর এলাকা কিভাবে ও কার স্বার্থে ব্যবহার হবে তা নিয়ে।
বাংলাদেশের ‘সাগর-জয়’ নিয়ে তর্ক-বিতর্ক ও মাতামাতির যুক্তিসংগত কারণ রয়েছে। অবশ্য ক্ষমতার খেলায় জয়ী হওয়ার উদ্দেশ্যে তা নিয়ে দেশের দুই বড় বুর্জোয়া রাজনৈতিক দল যুক্তিহীন ‘বাহাস’ চালিয়ে যাচ্ছে। তবে, মাতামাতিরও যুক্তিসংগত কারণ রয়েছে। বঙ্গোপসাগর হলো অনুত্তোলিত বিপুল সম্পদ-ভাণ্ডারের উত্স। এ সম্পদের অতি অল্পই আমাদের দেশ বর্তমানে কাজে লাগাতে সক্ষম হচ্ছে। সাগরের পানি নোনা। সে পানি পান করা যায় না। সেচের কাজেও তা ব্যবহার করা যায় না। কিন্তু সেই নোনা পানিতে রয়েছে বিপুল মত্স্য ও প্রাণীজ সম্পদ। রয়েছে নানা উদ্ভিজ্জ সম্পদ। এমনকি প্রক্রিয়াজাত করার মাধ্যমে সেই নোনা পানি থেকে শুধু লবণই নয়, পাওয়া যেতে পারে বহু মূল্যবান খনিজ ও রাসায়নিক সম্পদ। তাছাড়া সাগরের তলদেশ রয়েছে অমূল্য অনেক সম্পদে ভরপুর। সেখানে রয়েছে অনাবিষ্কৃত বিপুল গ্যাস ও তেলের ভাণ্ডার। এসব সম্পদ ছাড়াও সমুদ্র যোগাযোগের ক্ষেত্রে এবং তার চেয়ে বেশি ভূ-সামরিক ক্ষেত্রে, বঙ্গোপসাগরের রয়েছে বিশেষ গুরুত্ব।
সাগরে অনেককিছু থাকলেও সেখানে মিঠাপানি নেই। পান করার জন্য, চাষাবাদ করার জন্য এবং আরো একশো-একটা কাজের জন্য মিঠাপানির কোনো বিকল্প নেই। সাগরের নোনা পানি দিয়ে সেসব কাজ করা যায় না। একথা ঠিক যে, নোনা পানিকে প্রক্রিয়াজাত করে তাকে মিঠাপানিতে রূপান্তরিত করা সম্ভব। কিন্তু মানুষের ন্যূনতম চাহিদা মেটানোর জন্য যে পরিমাণ মিঠাপানির প্রয়োজন সেই পরিমাণের ক্ষুদ্রাংশ নোনা পানিকে মিঠাপানিতে রূপান্তরের প্রযুক্তি এখনো উদ্ভাবিত হয়নি। মিঠাপানির জন্য তাই মানুষকে নির্ভর করতে হয় প্রধানত ডাঙ্গা নদী, খাল, বিল, জলাশয় ইত্যাদির ওপর। তাছাড়া নির্ভর করতে হয় ভূপৃষ্ঠের নিচে জমে থাকা মিঠাপানির স্তর ও ‘পানির খনির’ ওপর। এসবের বাইরে, বৃষ্টির পানিও মিঠাপানির একটি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উত্স। সাগরের পানি বাষ্পায়িত হওয়ার পর মেঘ হয়ে বৃষ্টির আকারে মাটিতে আসার পর তা মিঠাপানির ভাণ্ডারকে পুষ্ট করতে সক্ষম হয়। এসব বহুবিধ উত্স সত্ত্বেও মানুষের জন্য মিঠাপানির প্রধান উত্স হলো ডাঙ্গার ওপর দিয়ে প্রবাহিত নদ-নদীর পানি।
পৃথিবীতে জনসংখ্যা বাড়ছে। সেইসাথে বাড়ছে মিঠাপানির চাহিদা। কিন্তু মিঠাপানির সরবরাহ সীমাবদ্ধ। ফলে মিঠাপানির প্রাপ্তি নিয়ে দেশে-দেশে, জাতিতে-জাতিতে, মানুষে-মানুষে টানাটানি বাড়ছে। এই টানাটানি ভয়ানক সব দ্বন্দ্ব-বিরোধের রূপ নিতে শুরু করেছে। মিঠাপানি নিয়ে পরিস্থিতি আরো সংঘাতময় হয়ে ওঠার আশংকা রয়েছে। কিছু চিন্তাবিদের অভিমত হলো, পৃথিবীতে যদি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ লেগে যায় তাহলে মিঠাপানির ইস্যুই হবে তার সম্ভাব্য কারণ। মিঠাপানির প্রধান উত্স যেহেতু ডাঙ্গায় প্রবাহিত নদীসমূহ, তাই নদী ও তার পানির ওপর নিয়ন্ত্রণই হয়ে উঠবে সংঘাতের প্রধান উপলক্ষ। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ রয়েছে একটি অনন্যসাধারণ নাজুক অবস্থানে। যেহেতু বাংলাদেশ মানেই হলো ‘নদীর দেশ’ তাই নদী নিয়ে বিরোধ তার অস্তিত্বের প্রশ্নের সাথে সরাসরি যুক্ত। নদী এদেশের ‘আশীর্বাদ’। কিন্তু নদী নিয়ে বিরোধ তার জন্য ‘অভিশাপ’ হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ। পৃথিবীর অন্য যে কোনো দেশের তুলনায় বাংলাদেশের এ পরিচয় অনেক বেশি সত্য। স্বদেশ হলো আমাদের মাতার মতো, তাই আমরা বলি ‘দেশমাতৃকা’। কিন্তু যা কিনা সেই স্বদেশেরই ‘মাতার মতো’ তা হলো নদী। সে কারণেই আমরা বলি নদীমাতৃক দেশ। অতঃপর বলা যায় যে, আমাদের ‘মাতার মাতা’ হলো বাংলাদেশের নদ-নদী।
কথাটি আক্ষরিক অর্থেই সত্য। মাতার গর্ভ থেকে যেমন সন্তানের জন্ম হয়, বাংলাদেশের জন্ম তেমনি হয়েছে নদ-নদীর গর্ভ থেকে। তিন তিনটি বড়-বড় নদীপ্রবাহ পদ্মা-যমুনা-মেঘনা যুগ-যুগ ধরে বিপুল পরিমাণ পলিমাটি বহন করে দীর্ঘ পথ পরিক্রমা শেষে বঙ্গোপসাগরে এসে মিশেছে। মোহনার মুখে এসে তাদের বক্ষে বহন করা পলি তারা সাগরের মুখে ঢেলে দিয়েছে। যুগ-যুগ ধরে চলেছে এই পলি আনয়নের প্রক্রিয়া। ক্রমান্বয়ে জেগে উঠেছে চর, সে চর উঁচু হয়েছে। সাগরের উপকূল ধরে এভাবে বিস্তৃত হয়েছে ডাঙ্গার সমতলভূমি। সাগরের বুকে পলিমাটি পড়ে সৃষ্টি হয়েছে ‘বঙ্গের’ ক্রমপ্রসারমান ভূখণ্ড। বাংলাদেশ শুধু পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্ ব-দ্বীপই নয়, এটি হলো পৃথিবীর বৃহত্তম ‘সক্রিয় ব-দ্বীপ’। নদী দিয়ে পলি আসা বন্ধ হলে, অথবা তা ক্ষীয়মাণ হয়ে উঠলে, সেটি হবে যুগ-যুগ ধরে চলে আসা ভূখণ্ডের ক্রমসম্প্রসারণ প্রক্রিয়াকে গলা টিপে হত্যা করার মতো একটি ঘটনা। তা হবে মাতৃগর্ভে সন্তানের জীয়নশক্তি হরণের মতো ঘটনা।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশবাসীর শ্লোগান ছিল— ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা’। এই শ্লোগানের মধ্যদিয়ে তারা জাতীয় আত্মপরিচয়ের নিশানা খুঁজে পেত। এ থেকেই স্পষ্ট হয় যে, বাংলাদেশ এমন একটি সত্তা যার পরিচয়ের মর্মস্থলে বিরাজ করে তার নদ-নদী বিধৌত প্রকৃতি, ও তাকে অবলম্বন করে গড়ে ওঠা অর্থনীতি, সংস্কৃতি, সমাজ চেতনা ও ঐতিহাসিক বিবর্তন। নদীর নামে জাতির আত্মপরিচয় পৃথিবীর আর কোন দেশে এমন দেখতে পাওয়া যাবে!
মহাকালের যাত্রাপথে পদ্মা-মেঘনা-যমুনার গতিপ্রবাহ অনেকবার দিক পরিবর্তন করেছে। কিন্তু পরিবর্তিত নতুন পথ ধরে এই নদীসমূহের বঙ্গোপসাগর অভিমুখী প্রবাহের স্বাভাবিক ধারা কখনো বাধাগ্রস্ত কিংবা রুদ্ধ হয়নি। প্রকৃতির আপন নিয়মে ও নিয়ন্ত্রণে নদীর পানি প্রবাহিত হয়েছে। কিন্তু মহাকালের সেই স্বাভাবিক গতিতে এখন হস্তক্ষেপ হতে শুরু হয়েছে। মানুষের হাত দিয়ে প্রকৃতির গতিপ্রবাহকে বদলে দেয়ার প্রয়াস শুরু হয়েছে। ‘মনুষ্য-ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর এসব প্রয়াস প্রকৃতির নিয়মের সাথে তাল মিলিয়ে কাজ করার বদলে তার মৌলিক প্রক্রিয়াকে বদলে দেয়ার ‘খেলায়’ মেতে উঠেছে। অন্যদিকে প্রকৃতির মহাকালীয় প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক গতি ‘রাজনৈতিক ভূগোলের’ বাস্তবতা দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে। প্রকৃতির ইচ্ছার চেয়ে ‘রাষ্ট্রের স্বার্থ’ প্রধান হয়ে উঠছে। প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রীয় সীমানা স্থির না হওয়ায় ‘রাষ্ট্রীয় স্বার্থের’ বিবেচনা প্রকৃতির নিয়মের বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে। প্রকৃতির স্বাভাবিক ভারসাম্য বিনষ্ট করার এই ‘মরণ খেলা’ ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনছে। এরকম একটি পটভূমি ও প্রেক্ষাপটে তিস্তা নদীর পানি বণ্টন নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত সমস্যাটি এদেশে ব্যাপক আলোচনা ও ক্রমবর্ধমান উত্কণ্ঠার বিষয় হয়ে থাকছে। সাগর-সীমা নিয়ে বিরোধের নিষ্পত্তি হলেও তিস্তা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তি হচ্ছে না। সাগরের অর্জন আনন্দ বয়ে আনলেও ভারত কর্তৃক তিস্তার পানি প্রত্যাহারের কারণে জমে ওঠা ক্ষোভ তাকে ছাপিয়ে আছে। এর কারণ কি এই নয় যে, তিস্তা নিয়ে বিরোধ সাগর-সীমা নিয়ে বিরোধের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর? হ্যাঁ, আসলে তাই! কারণ, সাগরের সম্পদের চেয়ে ডাঙ্গার মিঠাপানি অনেক বেশি প্রাণদায়ী ও মূল্যবান।
বাংলাদেশের জন্য তিস্তা কোনো বিচ্ছিন্ন একক ইস্যু নয়। এটি এই অঞ্চলের দেশগুলোর সামগ্রিক নদী ব্যবস্থাপনা নীতির সাথে জড়িত। বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত নদীগুলোর মধ্যে অধিকাংশ হলো একাধিক রাষ্ট্রের মধ্যদিয়ে প্রবাহিত অভিন্ন নদী। এ ধরনের অভিন্ন নদীর সংখ্যা হলো ৫৭টি, যার মধ্যে ৫৪টি ভারতের মধ্যদিয়ে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এই ৫৪টির মধ্যে কয়েকটি আবার ভারতে প্রবেশ করার আগে চীন, নেপাল, ভুটান প্রভৃতি দেশের মধ্যদিয়ে প্রবাহিত হয়ে ভারতে ও পরে বাংলাদেশে এসেছে। নদী ব্যবস্থাপনার বিষয়টি তাই এই অঞ্চলের প্রতিটি দেশের সামগ্রিক নদী ব্যবস্থাপনা নীতির যোগফলের সাথে সম্পৃক্ত।
কি হওয়া উচিত এসব দেশের নদী ব্যবস্থাপনা নীতির প্রধান চরিত্র? যে কোনো যুক্তিগ্রাহ্য বিবেচনা একথাই বলবে যে সেই নীতির প্রধান ভিত্তি হওয়া উচিত প্রথমত, প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক ভারসাম্যের সাথে মৌলিকভাবে অসংগতিপূর্ণ বা বৈরী কোনোকিছু করা থেকে বিরত থাকা। দ্বিতীয়ত, নদ-নদীর ক্ষেত্রে প্রথমেই যে নীতি মেনে চলা অত্যাবশ্যক তা হলো ‘নদীকে বাঁচতে দাও’-এর নীতি। এসব অভিন্ন নদীগুলোকে গলা টিপে হত্যা করা হচ্ছে। ‘মনুষ্য ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের’ মাধ্যমে এই হনন কাজ চালানো হচ্ছে। নদ-নদীর স্বাভাবিক যাত্রাপথ, স্রোত, বহনকৃত পলি ও জলজ-জীবের স্বাভাবিক চারণ ও প্রজনন ক্ষেত্র ইত্যাদি এভাবে ক্ষুণ্ন করার প্রক্রিয়া বন্ধ করতে হবে। নদীকে ‘হত্যা’ করার নীতি বদলাতে হবে। নদীকে নিজের মতো করে বাঁচতে দিতে হবে।
নদীগুলোকে এভাবে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়াটা অপর একটি আত্মঘাতী নীতির অবশ্যম্ভাবী পরিণতি। তা হলো নদ-নদীর প্রতি ‘বাণিজ্যিক’ মনোভাব অনুসরণ। লেবু বা আখ চিপে রস বের করার মতো, নদ-নদীকে নানাভাবে ‘হাত মোচড়’ দিয়ে নগদ বৈষয়িক লাভ নিংড়ে নেয়ার নীতি অনুসরণ করার ফলে নদী আর নদী থাকছে না। তা হয়ে উঠছে মুনাফা বানানোর আর দশটি উপকরণের মতো একটি লোভনীয় উপকরণ। এ ধরনের নীতি ও মনোভাবের উদ্ভব ঘটেছে অর্থনৈতিক-সামাজিক দর্শনের ক্ষেত্রে যৌথ স্বার্থের বিবেচনাকে প্রাধান্য দেয়ার বদলে ব্যক্তিগত স্বার্থচিন্তাকে প্রাধান্য দেয়ার দর্শন অনুসরণ করার ফলে। আলো-বাতাসের মতো নদ-নদী, সাগর, পাহাড়-পর্বত ইত্যাদি হলো মানুষের ‘যৌথ সম্পত্তি’। কিন্তু পুঁজিবাদ সবকিছুর পণ্যায়ন (commodification), বাণিজ্যিকীকরণ (commercialization), অ-যৌথায়ন (de-collectivization) তথা ব্যক্তিগতকরণ (privatization) ঘটায়। পুঁজিবাদের এই সর্বগ্রাসী প্রবণতার হাত থেকে কোনো কিছুরই নিস্তার নেই। নদ-নদীরও নিস্তার নেই। যৌথ সম্পত্তি কিভাবে ব্যক্তিগত মালিকানার মাধ্যমে লুণ্ঠনের উেস পরিণত হয় তার একটি চরম দৃষ্টান্ত হলো ভূমি-নদী দস্যুদের নদী দখলের অসংখ্য ঘটনাবলী।
নদী ব্যবস্থাপনা নীতির ক্ষেত্রে পুঁজিবাদী বাণিজ্যিকীকরণের কারণেই সাম্প্রতিক সময়ে আন্তঃরাষ্ট্রীয় অভিন্ন নদীর ক্ষেত্রে উজানের ও ভাটির দেশের মধ্যে পানির হিস্যা নিয়ে বিরোধ তীব্র হয়ে উঠেছে। যদি ‘নদীকে তার নিজ ধারায় স্বাধীনভাবে প্রবাহিত হতে দাও’ এবং ‘নদ-নদী হলো মানব সমাজের যৌথ সম্পদ ও সম্পত্তি’—এসব নীতি অবশ্যপালনীয় হতো এবং যদি এসব দেশ সেই নীতি অনুসরণ করতো, তাহলে উজানের ও ভাটির দেশের মধ্যে পানির হিস্যা নিয়ে বিরোধ এমন কঠিন ও মীমাংসা-প্রতিকূল হয়ে উঠতো না।
যে কোনো আন্তঃরাষ্ট্রীয় অভিন্ন নদীর ক্ষেত্রে তার পানি বণ্টন নিয়ে ন্যায়সংগত সমঝোতার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না। এক্ষেত্রে সবচেয়ে আগে যা করা দরকার তা হলো নদীর স্বাভাবিক অবস্থা বজায় রেখে তাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যে পরিমাণ পানি প্রবাহ প্রয়োজন, তার বরাদ্দ আগে-ভাগেই নির্ধারণ ও নিশ্চিত করা। তারপরে, অবশিষ্ট পানি প্রবাহের পরিমাণকে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জন্য সমতা ও সমঝোতার নীতির ভিত্তিতে বরাদ্দ করা। সেইসাথে প্রয়োজন উজান বা ভাটির দেশ কর্তৃক একে অপরের ক্ষতি সাধন হতে পারে নদীতে এমন কোনো স্থাপনা নির্মাণ নিষিদ্ধ করা। পাশাপাশি, নদী ব্যবস্থাপনায় পরস্পরের মধ্যে সহযোগিতামূলক আলোচনার পথ অনুসরণ করা। এভাবে প্রতিটি নদী-প্রণালীকে (river system) কেন্দ্র করে অববাহিকাভিত্তিক নদী ব্যবস্থাপনার স্থায়ী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা।
সাগরের সম্পদের ব্যবহারের ক্ষেত্রেও একই ধরনের মূলনীতি অনুসরণ করা আবশ্যক। সাগরের সম্পদের প্রতি বাণিজ্যিক ও ব্যক্তিগতকরণ (অ-যৌথায়ন)-এর নীতি অনুসরণ করা হবে বিশ্বাসঘাতকতা ও আত্মঘাতী। সাম্রাজ্যবাদী বহুজাতিক কোম্পানিগুলো সাগরের ‘সাধারণ সম্পত্তির’ ওপর ব্যক্তিগত ও কর্পোরেট থাবা হানতে সচেষ্ট রয়েছে। দেশের কিছু দালাল গোষ্ঠী ‘টু-পাইসের’ লোভে তাদের পদলেহন করছে। এরা সবাই স্রেফ ‘সাগর-দস্যু’ ব্যতীত অন্য কিছু নয়। ভূমি দস্যু-নদী দস্যু-সাগর দস্যুদেরকে রুখে দাঁড়ানোটা আজ সব দেশপ্রেমিকের পবিত্র কর্তব্য।
লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)
E-mail : [email protected]
