ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ

আপডেট : ২০ জুলাই ২০১৪, ২১:৪৫
যুগ যুগ ধরে লোকায়ত বাংলার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ নৌকা বাইচ। বিশেষ করে গতিহীন জলমগ্ন জীবনে নৌকা বাইচ করত গতির সঞ্চার। অতীতে বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে আয়োজন করা হতো নৌকা বাইচের। যেখানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করত অসংখ্য নৌকা। দূর-দূরান্ত থেকে আগত এসব নৌকার প্রতিযোগিতা দেখতে প্রতিযোগিতা স্থলে জড়ো হতো সহস্র মানুষ। কেউ নদীর তীরে, কেউবা আবার নৌকা করে নদী বক্ষে। বাদ যেত না গাছের ডাল ও ঘরের চাল কিংবা ছাদও। কিন্তু সমাজ ও সংস্কৃতিতে বড় বড় পরিবর্তনের ফলে গতি হারিয়ে ফেলেছে নৌকা বাইচও। নদী বিধৌত বাংলাদেশে ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, খেলাধুলা, আনন্দ আয়োজন ও উত্সবে নদী ও নৌকার সক্রিয় উপস্থিতি। বাংলাদেশের খেলাধুলার মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন নৌকা বাইচ। খ্রীষ্টপূর্ব ২০০০ বছর আগে ’মেসোপটেমিয়ার’ লোকেরা ইউ ফেট্রিস নদীতে নৌকা বাইচের আয়োজন করে। কয়েক শতাব্দি পরে মিশরীয়রাও নীল নদের জলে। কিন্তু আমাদের দেশে কবে নৌকা বাইচ গণমানুষের বিনোদনের মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায় তার কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ নেই। তবে এ ব্যাপারে দুটি জনশ্রুতি আছে। প্রথম: জগন্নাথ দেবের স্নানার্থীদের নিয়ে বহু নৌকার ছড়াছড়ি ও দৌড়াদৌড়ি পড়ে যায়। এতে মাঝি-মাল্লা-যাত্রিরা বাইচের আনন্দ পায়। এ থেকেই কালক্রমে নৌকা বাইচের প্রচলন। দ্বিতীয়: আঠার শতকের শুরুর দিকে এক গাজী পীর নদীর অন্য পাড়ে থাকা ভক্তদের তার কাছে আসার আহ্বান জানান। ভক্তরা অনেক খোঁজাখুঁজির পর যখন একটিমাত্র নৌকা নিয়ে মাঝ নদীতে আসে তখনই নদী ফুলে-ফেঁপে উঠে। তখন চারপাশে যত নৌকা ছিল খবর পেয়ে ছুটে আসে। একে অন্যের সাথে পাল্লা দিয়ে ছুটে চলে। এ থেকেই বাইচের গোড়াপত্তন। বাংলাদেশে জালের মত ছড়িয়ে আছে অসংখ্য নদ-নদী। তাছাড়া রয়েছে হাওর-বাঁওড় ও বিল। শুধু কিশোরগঞ্জের নিকলিতেই রয়েছে ২৪টি বড় জলমহাল। এক ফসলে এসব হাওরে শুষ্ক মৌসুমে দৃষ্টি জুড়ে শুধু সবুজ আর সবুজ। আর বর্ষায় পানিতে টইটুম্বুর। একাকার হয়ে যায় পথঘাট। পানিবন্দি হয়ে পড়ে পুরো জনপথ। হাওরবাসী ফসলের ব্যস্ততা শেষে বর্ষায় পায় বিনোদনের ফুরসত। শুরু হয় ঘেটুগান, যাত্রা ও নৌকাবাইচের পালা। চলে সারা র্বষা জুড়ে। মূলত শ্রাবণ সংক্রান্তির পর ১লা ভাদ্রে শুরু হতো বাইচ। শত শত নৌকার অংশগ্রহণে চলত টানা কয়েক দিন। বর্ষায় সারা দেশের নদী-নালা ও বিল-ঝিলে ছিল একই চিত্র। এ রীতি বজায় ছিল দেশ বিভাগের পূর্ব পর্যন্ত। কিন্তু পাকিস্তান আমলে নষ্ট হয়ে যায় বাইচের স্বতঃস্ফূর্ততা। সময়ের আবর্তে অপরিকল্পিত শিল্পায়ন ও নগরায়নের ফলে নদীগুলো আজ মৃতপ্রায়, ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে জলাশয়। আর নৌকা বাইচ? সে তো জাদুঘরে জায়গা পাওয়ার উপক্রম। আবহমানকাল ধরে চলা গ্রামবাংলার নির্মল আনন্দের মাধ্যম নৌকা বাইচ আজ আটকে পড়েছে কয়েকটি নদী ও দিবসের গন্ডিতে। ১৯৭৪ সালে নৌকা বাইচের উন্নয়নে গঠন করা হয় ’বাংলাদেশ রোয়িং ফেডারেশন’। সনাতন নৌকা বাইচ ও রোয়িং’র মধ্যে সমন্বয় সাধনই এ সংগঠনের কাজ। কিন্তু প্রতি বছর বুড়িগঙ্গায় জাতীয় নৌকা বাইচ ও খুলনার রূপসা, নড়াইলের চিত্রা, পঞ্চগড়ের করতোয়া, সাতক্ষীরার মাদার নদীতে নৌকা বাইচ ছাড়া তেমন কোনো বিশেষ উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয় না। তবে এ বাইচগুলোও আয়োজন করা হয় কোনো না কোনো দিবস উদযাপন অথবা ব্যবসায়িক স্বার্থে। ফলে নৌকা বাইচ নতুন প্রজন্মের কাছে অজানাই থেকে যাচ্ছে। লেখক :শিক্ষার্থী

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন