[ উ ন্ন য় ন ]

আসুন, তাদের উদ্যমে সাহস জোগাই

আপডেট : ২০ জুলাই ২০১৪, ২১:৪৭
চলছে কেনাকাটার মৌসুম। ব্যস্ততা দেখে বোঝাই যাচ্ছে, আসন্ন ঈদের খুশির হাওয়া বইছে সবার মনে। গ্রাম-শহরের মার্কেটগুলোতে উপচেপড়া ভিড়। সাধারণ মানুষের সাধ আর সাধ্যের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের জন্য এখন বিভিন্ন ধরনের মার্কেট, শপিংমল হয়েছে। সামর্থ্য অনুযায়ী ক্রেতারা এসব মার্কেট থেকে নিজেদের চাহিদামত কেনাকাটা করছেন। শুধু যে ক্রেতারা খুশি, তা নয়। বিক্রেতারাও। এই মৌসুমের জন্য গত কয়েক মাসের টানা প্রস্তুতিও ছিল। এখন ঢাকা ও ঢাকার বাইরের বিভিন্ন শহরে দেশীয় বিভিন্ন ব্র্যান্ডের শো-রুম রয়েছে। এসব শো-রুমের নিজস্ব কারখানাও রয়েছে। আবার অনেক মার্কেটে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জামাকাপড় সরবরাহ করা হয়ে থাকে। ঢাকার কেরানীগঞ্জে তৈরি পোশাকের বিশাল বাজার গড়ে উঠেছে। যেখান থেকে দেশীয় বাজারগুলোতে জামাকাপড় সরবরাহ করা হয়ে থাকে। অভ্যন্তরীণ চাহিদার বিশাল অংশ মিটিয়ে থাকে কেরানীগঞ্জের পোশাক শিল্প। এছাড়াও সারাদেশ জুড়ে এখন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উদ্যোগ চোখে পড়ছে। যা দেখে বিস্মিত হতে হয়। এই ঈদকে কেন্দ্র করে যে বিশাল অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ চোখে পড়ছে, তাতে আশান্বিত হতে হয়। দেশ আসলেই এগিয়েছে অনেক। এখন অজপাড়াগাঁ বলতে আর কিছু নেই। গ্রামেও এখন শহরের আবহ পাওয়া যাচ্ছে। গ্রামীণ নারীরা জড়িয়ে পড়ছেন বিভিন্ন উদ্যোগের সঙ্গে। নিজেরাই নিজেদের পণ্য বাজারজাত করছেন। আবার ক্রেতা হয়ে নিজেরাই জেলা কিংবা পৌরশহরের মার্কেটে গিয়ে কেনাকাটা সারছেন। গ্রামীণ জনজীবনে এক বিশাল পরিবর্তন ঘটে গেছে। এর পেছনে প্রধানতম ভূমিকার দাবিদার প্রবাসীদের কষ্টার্জিত অর্থ। এই অর্থে গ্রামীণ পরিবারগুলোর জীবনমান উন্নত হয়েছে। পাশাপাশি সরকারের কেন্দ্রীয় রিজার্ভকেও শক্তিশালী করেছে। যা এখন ২৩ বিলিয়ন ডলার। এই রিজার্ভ ভান্ডার বিশ্ববাণিজ্যে দেশের গ্রহণযোগ্যতাকে বাড়াতে পেরেছে। দ্বিতীয়ত, স্বল্পপুঁজির নানা উদ্যোগের সঙ্গে এখন গ্রামীণ জনগণ সম্পৃক্ত হয়েছে। তাদের হাতে তৈরি পণ্য সহজেই ঢাকায় পৌঁছে যাচ্ছে। সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নত হওয়ার ফলে উপযুক্ত দামও পাচ্ছে। এসব উদ্যোক্তার পেছনে বেশকিছু ব্যাংক, বেসরকারি সংস্থা অর্থায়নও করছে। ফলে, পুঁজির সরবরাহ (স্বল্প হলেও) পাওয়ায় নিজস্ব সৃজনশীলতার মাধ্যমে দেশ ও নিজেকে এগিয়ে নিতে সক্ষম হচ্ছেন তারা। এসব ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বললে অবাক হতে হয়। কোন কোন উদ্যোক্তা একেবারেই সামান্য পুঁজি নিয়ে ব্যবসা শুরু করেছেন। অর্থনীতিতে এদের কৃতিত্বের কথা আমরা কমই মনে করি। গত বছরের শেষদিকে এসব ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সাফল্য নিয়ে দৈনিক ইত্তেফাক সিরিজ রিপোর্ট প্রকাশ করে। ঐ রিপোর্ট লিখতে গিয়ে মনে হয়েছে এদেশে বড়দের নিয়েই ব্যস্ত সবাই। সরকারের নীতিও যেন বড়দের জন্য। বাজেটে তাদের কি ধরনের সুবিধা দেয়া হবে- তা নিয়েও চলে দেনদরবার। গ্যাস সংকট সমাধান, জমিদান, সুদ কমান প্রভৃতি দাবি ও সুবিধা নিয়ে বড় উদ্যোক্তারা চলছেন। আর প্রান্তিক পর্যায়ের উদ্যোক্তাদের খবর কেউ রাখে না। হয়তো প্রান্তিক পর্যায়ের এই মানুষগুলোকে উদ্যোক্তা বলতে রাজি হবে না অনেকেই। কিন্তু আসল বাণিজ্য তারাই করে। কষ্ট করে সামান্য পুঁজি যুগিয়ে তাদের পথচলা। ঢাকায় একটি টং দোকানেও দেখা যাবে মালিকের সঙ্গে সাহায্যকারীও রয়েছে। তাতে দুই পরিবারের ভরণপোষণ হচ্ছে। অথচ এরা সরকারের খাতাবদ্ধ নয় কিংবা সরকারকে এদের নিয়ে চিন্তা করতে হয় না। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সৃজনশীলতাও বড় বিস্ময়ের ব্যাপার। প্রচলিত অর্থে অপ্রয়োজনীয় এমন অনেক জিনিস দিয়ে তৈরি হচ্ছে নানা ধরনের পণ্য। কচুরিপানা দিয়েও গয়না তৈরি হয়। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সৃজনশীলতার সঙ্গে প্রযুক্তির মিশেল ঘটাতে পারলে বিপ্লব হয়ে যেতে পারে। বর্তমানে উন্নত অনেক দেশ রয়েছে যারা এক সময় ক্ষুদ্র উদ্যোগ দিয়েই শুরু করেছিল। চীন-জাপানের কথা সবার জানা। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের মাধ্যমেই দেশ দুটি আজ বড় অর্থনীতির দেশে পরিণত হতে পেরেছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, কিংবা শুধু পশ্চিমবঙ্গের কথাই যদি বলি, সেখানে ঘরে ঘরে সেলাইয়ের কাজ হচ্ছে। তারা মেনেছেন যে, ক্ষুদ্র উদ্যোগের সমষ্টি দিয়েই বড় অর্জন সম্ভব। আমাদেরও সেদিকে নজর দিতে হবে। কারণ, ক্ষুদ্র উদ্যোগে কর্মসংস্থানের সুযোগও বেশি। গ্রামীণ বিশাল জনগোষ্ঠীও নিজের কর্মসংস্থান গড়েছে ক্ষুদ্র উদ্যোগের মাধ্যমেই। আমাদের দেশে সবকিছু শহরকেন্দ্রিক হওয়ায় গ্রামীণ জীবনের পরিবর্তন তেমন চোখে পড়ে না। শহরে বসবাসকারী বিশাল অংশের কাছে গ্রাম বলতে শুধু ঈদকেন্দ্রিক বাড়ি যাওয়া। ঈদে বাড়ি যাওয়ার ঝক্কিঝামেলাও কম নয়। সেই ভয়েও অনেকে পা বাড়াতে চান না। ইতোমধ্যে পত্র-পত্রিকায় দেখেছি সড়ক-মহাসড়কের যে বেহাল দশ। তাতে দুর্ভোগের শংকা রয়েই যায়। কিন্তু এই দুর্ভোগ কেন হবে? প্রতি বছরেই বাজেটে সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের জন্য বিপুল অংকের ব্যয় বরাদ্দ রাখা হয়। এসব বরাদ্দ কি তবে সঠিকভাবে ব্যবহূত হয় না? অবশ্য, স্বল্পোন্নত কিংবা গরীব দেশগুলোতে সরকারি অর্থের অপচয় কিংবা লোপাটের হার বেশি হয়। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। এত বেশি জনসংখ্যার দেশ, স্বল্প জমি ও দারিদ্র্যের কারণে সব কিছু নিয়মমাফিক করা দুষ্কর। তবুও চেষ্টা থাকতে হয়। সেই চেষ্টাই হয়তো করছেন দায়িত্বপ্রাপ্তরা। কিন্তু কতটা সফল হচ্ছেন সে প্রশ্ন রয়ে গেছে। যোগাযোগ মন্ত্রী নিজেও তদারক করছেন। সময় বেঁধে দিচ্ছেন দ্রুত কাজ শেষ করার। কিন্তু এধরনের কাজে সেই সময় কি যথেষ্ট? কিংবা প্রকৃত অর্থেই রাস্তাঘাটের অবস্থা কি, সেটিও অনুধাবন করা দরকার। অনেকেই বলছেন, সড়ক-মহাসড়কের যে হাল হয়েছে তাতে শুধু মেরামত করলেই চলবে না। বরং কয়েকদিন পর আবারও যা-তা অবস্থাই হবে। কিন্তু আমরা এমনটি চাই না। কারণ, দেশের অর্থনীতিকে বেগবান করতে হলে সড়ক অবকাঠামো বড়ই গুরুত্বপূর্ণ। এতক্ষণ দেশব্যাপী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা যে উদ্যোগগুলোর কথা বললাম, সেগুলোর সুষ্ঠু বিপণনের জন্য নির্বিঘ্ন সড়ক যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। আর এই মুহূর্তেতো কথাই নেই। ঈদকে কেন্দ্র করে তৈরি পণ্যের বিপণন বাধাগ্রস্ত হলে পুঁজিই মার খাবে। এখন ঢাকাসহ সারাদেশের জেলাশহরগুলোতে রাতদিন কাজ হচ্ছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অসংগঠিত খাত বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এত জনসংখ্যার দেশ, স্বল্প জমি, তথাপিও বছর শেষে অর্থনীতি যে হারে এগুচ্ছে তা নিয়ে অনেকেরই বিস্ময়, ঘোর কাটে না। কী করে বাংলাদেশ বছরের পর বছর ধরে ছয় শতাংশে জিডিপি ধরে রাখতে পারছে। আসলে বাংলাদেশে অর্থনীতির বিস্ময় এসব ক্ষুদ্র উদ্যোগ। হাটেঘাটে সহজেই চোখে পড়ে এসব ক্ষুদ্র উদ্যোগ ও উত্পাদিত পণ্য। বাঁশ ও বেতের নানা রকম দৃষ্টিনন্দন আসবাবপত্র, মৃিশল্প, ছোটছোট ওয়ার্কশপ, ক্ষুদ্র বুটিক হাউস, সেলাই ঘর, মাছ চাষ প্রকল্প প্রভৃতি খাতে নিয়োজিত শ্রমিকরা দিনভর কাজ করছে। মজুরিও পাচ্ছে তারা। ছোট খাটো খাবার দোকানগুলোতেও রয়েছে মানুষের ভিড়। আপাত ক্ষুদ্র উদ্যোগ মনে হলেও এগুলো সবসময়েই সচল থাকছে। সচল রাখছে অর্থনীতি। যদিও দ্রুত বর্ধনশীল এই অর্থনীতি বারবার হোঁচট খাচ্ছে। কখনো কখনো রাজনৈতিক সংঘাত বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ২০১৩ সালের শেষার্ধের কথাই যদি বলি, হরতাল-অবরোধের মত রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) হিসাবমতে, বিগত কয়েক মাসে হরতাল, অবরোধ ও সহিংসতায় যোগাযোগ, কৃষি, পোশাক শিল্প ও পর্যটন খাতে মোট ৪৯ হাজার কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে। অন্যান্য খাতের ক্ষতি যোগ করলে মোট ক্ষতি আরও অনেক বেশি হবে। এর আগে চেম্বারগুলো বলেছে, বিভিন্ন খাতে মোট ১ লক্ষ কোটি টাকার অধিক ক্ষতি হয়েছে। যা মোট দেশজ উত্পাদন বা জিডিপি’র প্রায় ৯ শতাংশ। ভাগ্যিস, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। এতে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু এই পরিস্থিতি কতদিন থাকবে? পত্রিকায় খবর এসেছে ঈদের পরে আন্দোলনের ডাক আসবে। যদি আবারো সংঘাতময় রাজনীতি শুরু হয়ে যায় তবে ‘কষ্টের সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠা অর্থনীতি’র কি হবে-তা ভেবে দেখা দরকার। আমাদের এখন মাথাপিছু আয় ১১৯০ ডলারে পৌঁছেছে। আমদানি-রফতানি বাণিজ্য বেড়েছে। বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্ভাবনা যথেষ্ট থাকায় উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর পাশাপাশি উন্নয়নোন্মুখ অনেক দেশই বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার করতে আগ্রহী। এখানে রয়েছে সস্তা শ্রম-সুযোগ। বহির্বিশ্বের সাথে স্থল, নৌ ও আকাশ যোগাযোগ-সামর্থ্যও অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল- আইএমএফ’র পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশ এখন জিডিপি’র আকার বিবেচনায় বিশ্বের ৪২তম অর্থনীতি। দেশটির মোট বাণিজ্য প্রায় ৬৮ বিলিয়ন ডলার। এ অবস্থায় বাংলাদেশকে আরো এগিয়ে নিতে হলে দরকার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। অন্তত ক্ষুদ্র উদ্যোগগুলো যাতে টিকে থাকতে পারে। মনে রাখা দরকার যে, অর্থনীতির বাইরে থেকেও তারা অর্থনীতিকে বেগবান করতে সহায়ক ভূমিকা রাখছেন। তাই রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি আহ্বান আসুন, তাদের উদ্যমে সাহস যোগাই। তাদের উদ্যোগকে সচল রাখতে সচেষ্ট হই। লেখক:কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন