দ্রব্যমূল্যের আগুনের মধ্য দিয়েই শেষ হবে এবারের পবিত্র রমজান। প্রতি বছরই রমজানের শুরুতে দ্রব্যমূল্য অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পায়, তবে ধীরে ধীরে তা কমতেও থাকে। এবার ব্যতিক্রমই ঘটছে যেন। এবারের রমজানের শুরুতে পণ্যমূল্যের যে উলম্ফন ঘটেছে রমজানের মাঝামাঝি এসেও তা কমেনি এবং দাম কমবে সে লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। এখনও ৬০ টাকার নিচে কোন সবজি নেই। দেশীয় সবজির মধ্যে সর্বোচ্চ দামে অবস্থান করছে বেগুন- দাম ১০০ টাকা। সবজির সাথে পাল্লা দিয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে মাছের দাম। গড় দাম বেড়েছে দের থেকে দ্বিগুণ। মাংসের বাজারও চড়া। মাছ-মাংস ও সবজির অপরিহার্য অনুষঙ্গ আদা-পেঁয়াজ, রসুন, মরিচ এবং মসলার দাম বৃদ্ধি পেয়েছে সমান তালেই। সব মিলিয়ে ক্রেতা সাধারণের নাভিশ্বাস, আর দম বেরিয়ে যাচ্ছে নিম্নবিত্ত ও স্বল্প আয়ের মানুষগুলোর।
রমজান শুরু হওয়ার আগেই দ্রব্যমূল্যে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য সরকারের তোরজোর ছিল লক্ষণীয়। ব্যবসায়ীদের সাথে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দফায় দফায় বৈঠক হয়েছে। মন্ত্রিসভার বৈঠকেও দ্রব্যমূল্য সহনীয় মাত্রায় রাখতে নানা পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সবই নিষ্ফল। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের গর্জন, সরকারের হুঁশিয়ারির কোন কিছুতেই থামেনি দ্রব্যমূল্যের পাগলা ঘোড়া। আমদানিকারক, পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ী সকলেই জানে সরকারের এই হম্বিতম্বি থেমে যাবে দু’চারদিনের মধ্যেই। যাই বলা হোক না কেন আসলে বাজারমূল্য নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে কার্যকর কোনো পদক্ষেপই চোখে পড়েনি। রাজধানীর প্রতিটি বাজারে দ্রব্যমূল্যের তালিকা প্রতিদিন টাঙ্গানোর কথা থাকলেও তা মানা হয়নি কোনো বাজারেই। বাজার মনিটরিং করার জন্য গঠন করা হয়েছে মনিটরিং টিম, সেসব টিমের কোনো তত্পরতা দেখা যায়নি কোথাও। ঢাকার বাইরে ডিসিদের নেতৃত্বে মূল্যে মনিটরিং যে সেল গঠন করা হয়েছে তাদের কাজও ঢাকার মতোই তথৈবচ। সারকথা, প্রতি রমজানে পণ্যমূল্যে অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটবেই এবং ক্রেতাসাধারণকে তা বহন করতে হবে।
পণ্যমূল্যে নির্ধারিত হয় সরবরাহ ও চাহিদার উপর ভিত্তি করে। কিন্তু পণ্যমূল্য নির্ধারণের এই স্বতঃসিদ্ধ নিয়ম বাংলাদেশের বাজারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। রমজানে নিত্য ব্যবহার্য প্রায় সকল দ্রব্যেরই মূল্য দের থেকে আড়াই গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু যেসব পণ্যের সরবরাহের ঘাটতি আছে সে কথা বলা যাবে না। পাইকারী বাজার, খুচরা বাজার, রাজধানীর অলিগলি ফুটপাত সর্বত্রই নিত্য ব্যবহার্য পণ্যে সয়লাব। কিন্তু দাম আকাশচুম্বী। এক্ষেত্রে যে কথাটি সত্য তা হলো বাংলাদেশের বাজারমূল্য নির্ধারিত হয় ক্রেতা সাধারণের অযৌক্তিক আচরণে ও ব্যবসায়ীদের ইচ্ছায়।
রমজানের সপ্তাহখানেক আগে থেকে কেনাকাটার ধুম পড়ে যায়। বড়ো বড়ো চেইনশপগুলোতে যেমন বিশাল কিছু দেখা যায় একই অবস্থা সাধারণ বাজারগুলোতেও । দুর্ভিক্ষের পূর্বাভাস বা যুদ্ধকালীন সময়ে মানুষের মধ্যে নিত্য ব্যবহার্য পণ্য ক্রয়ের যে প্রতিযোগিতা শুরু হয় ঠিক সে রকমই লক্ষ্য করা যায় রমজানে বা অন্যান্য উত্সব পার্বণে। এক শ্রেণির মানুষের জন্য দাম যেন কোনো বিষয়ই না। ৩০ টাকার বেগুন ১২০ টাকায় যেমন স্বাচ্ছন্দ্যে তারা ক্রয় করেন, সেই বেগুনের দাম ১২০০ টাকা হলেও সেই শ্রেণি স্বতঃস্ফূর্তভাবেই তা ক্রয় করবে। রমজানসহ যে কোনো উত্সবেই পণ্য মূল্য যেখানেই পৌঁছাক না কেন ক্রেতা সাধারণের অযৌক্তিক আচরণে তা বিক্রি হতে থাকেই। ব্যবসায়ীরা মুনাফা করবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বাংলাদেশের অধিকাংশ ব্যবসায়ী মুনাফা করে না মুনাফা লোটে, তাদের পরিচয় অতি মুনাফাকারী। পণ্যমূল্যে যাই চাওয়া হোক না কেন তা যখন বিক্রি হয়ই, সেক্ষেত্রে পণ্যমূল্য যৌক্তিক পর্যায়ে নামবে এমন আশা করা বোকামি। যে দেশে ৩০ টাকা কেজির দরের পেয়ারা দুই থেকে আড়াইশ’ টাকা দামে ফুটপাত থেকেও মানুষ ক্রয় করে সেখানে যে কোনো সুযোগে পণ্যমূল্যে দুই আড়াইগুণ তো হবেই। একদিকে ব্যবসায়ীদের অতি মুনাফা লোভ, একশ্রেণির নেতা সাধারণের অযৌক্তিক ক্রেতা আচরণ রমজানের মতো উপলক্ষে পণ্যমূল্য হু হু করে তো বাড়বেই।
পণ্যমূল্য বৃদ্ধির ক্ষেত্রে অন্যান্য বাহিনীগুলোও এ সময় তত্পর হয়ে ওঠে। পরিবহন মালিক শ্রমিকরা এই সুযোগে ভাড়া আদায় করে অন্যান্য সময়ের চেয়ে বেশি। যদিও তাদের পরিবহন ব্যয় দু’পয়সাও বৃদ্ধি পায় না। বৈধদের অবৈধ তত্পরতার সাথে যোগ হয় অবৈধ অর্থাত্ চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য। তারা ঘাটে ঘাটে চাঁদা আদায় করে পণ্যমূল্য বৃদ্ধিকে এগিয়ে নিয়ে যায় আরেক সিঁড়ি। সেই সাথে যোগ হয় ট্রাফিক সার্জেন্টদের ঘুষ আদায়। সকল দেশে নিত্যব্যবহার্য পণ্য পরিবহন যেখানে বিশেষ সুবিধা পায়, ঠিক উল্টো ঘটে আমাদের দেশে। সার্জেন্টদের ঘুষ আদায়ের অন্যতম টার্গেট পণ্যবাহী পরিবহন। তাদের চাঁদাবাজিও যোগ হয় পণ্যমূল্যে।
এত কিছুর পরও নিত্যব্যবহার্য দ্রব্যমূল্য এতটা চড়া হওয়ায় কথা নয়। কোনো ক্ষেত্রেই ন্যূনতম নিয়ন্ত্রণ বা তদারকি না থাকায় ভোক্তা পর্যায়ে এত বেশি দাম গুণতে হচ্ছে। দেখা গেছে উত্পাদক পর্যায় থেকে ভোক্তা পর্যায় পৌঁছে একটি পণ্যের দাম ২ থেকে ৩ গুণ পর্যন্ত হয়ে যাচ্ছে। এমনকি পাইকারী বাজার থেকে খুচরা বাজার এই সামান্য দূরত্বের ব্যবধানেও অনেক পণ্যের দাম দেড় থেকে দ্বিগুণ হয়ে যায়। পণ্যমূল্য বৃদ্ধিতে ক্রেতা সাধারণ পরোক্ষভাবে কম দায়ী নয়। একশ্রেণির ক্রেতার অসচেতনতা, একশ্রেণির ক্রেতার হুমড়ি খেয়ে পড়া, একশ্রেণির ক্রেতার অঢেল টাকা পণ্যমূল্যে বৃদ্ধিতে বরাবরই ভূমিকা রেখে চলেছে। অথচ বিষয়টি নিয়ে আমরা কেউই ভাবি না।
পণ্যমূল্যে সঠিকভাবে নির্ধারণে ক্রেতাসাধারণের যৌক্তিক আচরণের ব্যর্থতা, সরকারের ফলহীন উদ্যোগ, ক্যাব এর যথার্থ ভূমিকা পালন না করা, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের নিষ্ক্রিয়তা, ব্যবসায়ীদের অতি মুনাফা লোভ সারাবছর পণ্যমূল্যে বৃদ্ধি করে রাখে। আর রমজানের মতো মোক্ষম উপলক্ষে তা লাগামহীন ঘোড়ার বেগে ছুটতে থাকে। এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। দাম যে যেভাবে বেড়েছে তাতে পণ্যমূল্যে আগুনই বলতে হবে। পণ্যমূল্য আগুনময় হলেও তার তাপ সকলের গায়ে সমানভাবে লাগে না।
বেশি দুর্ভোগে পড়ে স্বল্প আয়কারী, প্রাম্ভিক আয়কারী ও শ্রমজীবী মানুষগুলো। পণ্যমূল্য বৃদ্ধির সাথে তাদের আয় বৃদ্ধির সুযোগ নেই বললেই চলে। আবার সমাজের অন্যান্য শ্রেণির মত তাদের কোন সঞ্চয়ও থাকে না। ফলে বাড়তি মূল্য যোগানের কোন উপায়ই থাকে না তাদের। একারণেই মূল্য আগুনে ঝলসে যায় তাদেরই জীবন। এটা চলছে প্রতিকারহীনভাবে। এভাবে কি চলতেই থাকবে? জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত পণ্যমূল্যে কি যৌক্তিক পর্যায়ে নির্ধারিত হবে না? হবে। তবে সরকারের একার পক্ষে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করা কখনোই সম্ভব নয়। পৃথিবীর কোনো দেশেই কোন সরকার পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। এক্ষেত্রে বড়ো ভূমিকা পালন করে সেসব দেশের ক্রেতা সাধারণ। কেননা তারা ভোক্তা অধিকার সম্পর্কে সচেতন। আমাদের দেশেও পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে বড়ো ভূমিকা রাখতে হবে ক্রেতা সাধারণকেই। মূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারের পাশাপাশি তারা যদি পণ্যমূল্য যতই হোক না কেন তা কিনতে হবে— এই ধরনের অসু্স্থ ক্রয় প্রবণতা কিছুটা পরিহার করে এবং প্রয়োজনের অধিক পণ্য ক্রয়ের মানসিকতা থেকে বেড়িয়ে আসে তাহলে পণ্যমূল্য আপনা আপনিই কমতে বাধ্য। সুতরাং, পণ্যমূল্য বৃদ্ধিতে শুধু সরকারকে দোষারোপ না করে ক্রেতা সাধারণকে আগে নিজের ক্রেতা আচরণ সঠিক করতে হবে।
লেখক: ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক
E-mail: [email protected]
