দিনাজপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বশির স্যারের নাম শুনলেই স্কুলের প্রতিটি ছাত্রের হূদকম্পন শুরু হয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় এদিক-সেদিক ছুটে পালাতে থাকে। সামনে পড়া মানেই যমের সাথে সাক্ষাত্। একটা না একটা প্রশ্ন ধরবেনই, হয় এ্যালজেবরার সূত্র না হয় ইংরেজি গ্রামার, বাংলা ব্যাকরণ, না হয় জ্যামিতি ইত্যাদি। না পারলে কান মলে হাতে থাকা বেত দ্বারা পিঠের উপরে শপাং শপাং করে বেত্রাঘাত। উহ কি ভয়ংকর। ভাবতেই মাথাটা ঝিম ঝিম করে হাত-পা অবশ হয়ে যায়। আমি ভুল করেও তার সামনে কখনো যাইনি। তার সামনে যাওয়ার আশা কখনো আমার মনে উদয় হয়নি।
সবেমাত্র ৭ম শ্রেণীতে পদার্পণ করেছি। প্রথমদিনেই জানতে পারি বশির স্যার আমাদের ক্লাস টিচার, ইংরেজি পড়াবেন। ভয়ে আমার আত্মা শুকিয়ে যায়, বুক কেঁপে ওঠে। তার হাতে থাকা বেতের কথা ভেবে আঁতকে উঠি। মনে মনে ভাবি কখনো অপরাধী হিসাবে যেন তার সামনে দাঁড়াতে না হয়। এ কারণে কয়েকজন ভিক্ষুককে সাহায্যস্বরূপ কয়েকটি টাকাও দিয়েছি। কিন্তু এত কিছু করেও স্যারের হাত থেকে রেহাই পাইনি। তার সামনে পড়ে প্রশ্নের সঠিক জবাব দিতে না পেরে কত যে মার খেয়েছি এবং কান ধরে উঠাবসা করেছি তার হিসেব নেই।
প্রতিদিনের ন্যায় আমরা যথাসময়ে ক্লাসে উপস্থিত হয়েছি। অদ্যাবধি যা ঘটেনি তাই ঘটতে চলেছে। ক্লাস শুরু হওয়ার ১০ মিনিট হয়ে গেছে তবু বশির স্যারের দেখা নেই। কি ঝড় কি বৃষ্টি কখনোই বশির স্যার ১ মিনিটও দেরি করে ক্লাসে আসেননি। অথচ আজ এর ব্যতিক্রম। স্কুল কর্তৃপক্ষ বা আমরা কেউ এর কারণ বুঝে উঠতে পারিনি। প্রায় ২০ মিনিট পর বশির স্যার ক্লাসে এসে দেরিতে আসার জন্য সবার কাছে ক্ষমা চেয়ে নেন। একি স্যারের চেহারা। মাথার চুল এলোমেলো, মুখে খোঁচাখোঁচা দাড়ি, পরনের জামাকাপড়ও ঠিকমত পরেননি। দু’চোখের কোণে পানি, কেমন জানি চুপসে গেছেন। ভয়ে স্যারকে আমরা কোন কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস পাইনি। স্যার ইংরেজি গ্রামার পড়ানো শুরু করেন। অন্যদিনের চেয়ে আজকের পড়ায় কেমন যেন ঝিমানি ভাব দেখি। ক্লাসের একজন সাহস করে জিজ্ঞেস করে, স্যার আপনার কি হয়েছে? অনেকক্ষণ চুপ থেকে ছোট ছেলের মত হু হু করে কেঁদে উঠে জানান, ক্লাসে আসার পথেই তিনি শুনেছেন তার স্ত্রী অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি। সেখানে যাওয়ার আগে তিনি ক্লাসটি নিতে এসেছেন। পড়ার মাঝেই হঠাত্ তার মোবাইল ফোন বেজে উঠে। রিসিভ করেই তিনি চিত্কার দিয়ে কেঁদে উঠে জানান তিনি এখনি হাসপাতালের উদ্দেশ্য রওনা হবেন। রওনা হওয়ার প্রাক্কালে তিনি আমাদেরকে জানান যে, কিছুক্ষণ আগে তার স্ত্রী চিকিত্সাধীন অবস্থায় হাসপাতালে ইন্তেকাল করেছেন। ভেবেছিলেন ক্লাস নিয়েই অসুস্থ স্ত্রীকে দেখার জন্য সেখানে যাবেন। তা আর হলো না। এর আগেই সব শেষ হয়ে গেছে। আমরা সবাই কিংকর্তব্যবিমূঢ় এবং আর্শ্চয হই। এ যুগেও কি এ ধরনের স্যার আছেন যিনি স্ত্রীর অসুস্থতার সংবাদ পেয়েও হাসপাতালে যাওয়ার আগে নিজের ক্লাসের ছাত্রদের পড়ানোকে অধিক গুরুত্ব এবং একমাত্র দায়িত্ব মনে করেছেন। স্যার যাওয়ার পর তাঁর দুঃখের কথা ভেবে ক্লাসে সবাই কেঁদেছি। আর মনে মনে বলেছি, পৃথিবীতে যুগে যুগে যেন বশির স্যারের মত শিক্ষক জন্ম নেয়। তার স্ত্রী গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিত্সাধীন, একথা তিনি কাউকে বলেননি এবং হাসপাতালে যাওয়ার আগে ক্লাস নেয়া জরুরি মনে করেছেন। অথচ ক্লাস বাদ দিয়ে তিনি যদি হাসপাতালে যেতেন তবে স্ত্রীর সাথে শেষ দেখা এবং অন্তিম মুহূর্তে স্ত্রীর পাশে থেকে না বলা অনেক কথা শুনতে পেতেন। কিন্তু তা আর হলো না।
তখন সকাল ১১টা। ইতিহাস স্যার আমাদের ক্লাস নিচ্ছেলেন। হঠাত্ স্কুলে হৈ-চৈ এবং কান্নার রোল পড়ে যায়। আমরা ঠিক ভেবে পাচ্ছিলাম না বিষয়টি কি ? এ সময় স্কুলের দপ্তরি এসে জানায়—বশির স্যার তার মৃত স্ত্রীকে দেখে সহ্য করতে না পেরে হাসপাতালে হার্টফেল করে মারা গেছেন। স্যার এবং তার স্ত্রী দু’জনারই লাশ হাসপাতালে। একথা শুনে আমরা সবাই জোরে জোরে কাঁদতে থাকি। ইতোমধ্যে সংবাদ শুনে স্কুলে কান্নার ধুম পড়ে। সবাই ছুটে যায় হাসপাতালে বশির স্যার ও তার স্ত্রীকে শেষবারের মতো দেখার জন্য। স্যারের স্ত্রী হাসপাতালে তবুও তিনি স্কুলে এসে ছাত্রদেরকে পড়িয়েছেন। কখনো ক্লাসে আসা থেকে বিরত থাকেননি। এটা এক বিরল দৃষ্টান্ত যা পৃথিবীতে খুঁজে পাওয়া যাবে কি না সন্দেহ। স্যালুট করি স্যারের নিষ্ঠা, সততা, মহানুভবতা এবং কর্তব্যপরায়ণতাকে যা চলার পথে পাথেয় এবং অনুকরণীয় ও চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
