জীবনের অস্তিত্বের জন্য পানির সুরক্ষা প্রয়োজন

আপডেট : ২১ জুলাই ২০১৪, ২২:০২
পানির অপর নাম জীবন, পানি ছাড়া প্রাণী বা উদ্ভিদের অস্তিত্ব আশা করা যায় না। পানি আমাদের জীবন। পানিই সম্পদ। পানিবিহীন জীবন আমরা কল্পনাও করতে পারি না। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা সূত্রে জানানো হয়েছে, দূষিত পানি পান করার ফলে প্রতিবছর গোটা বিশ্বে কয়েক লাখ শিশুসহ অনেক মানুষ মৃত্যুমুখে পতিত হয়। আর বাংলাদেশে অকালে মৃত্যুবরণ করে কয়েক হাজার শিশু। কোথাওবা সন্তানসম্ভবা মায়েরা দূষিত পানি পান করার ফলে বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম দেন। কখনো কখনো আমরা কিছু কিছু জন্তুকে খাল-বিল, নদী-নর্দমার নোংরা পানি পান করতে দেখি। তেমন একটি মুহূর্তের ছবি দেখে আঁঁতকে উঠে আমরা ভাবি, যদি বাস্তবে আমাদেরও এমন পরিস্থিতির শিকার হতে হয়। এমন পরিস্থিতি যে আমাদের ক্ষেত্রেও আসবে না, তা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। এক ফোঁটা পানির জন্য হাহাকার করতে হয় এমন জায়গাও আছে। পৃথিবীতে এমন দেশও আছে যেখানে প্রতিদিন পানির জন্য অগণিত মানুষকে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়তে হচ্ছে। এমন আজব দেশও রয়েছে যেখানে তেলের মূল্যের চেয়ে পানির মূল্য বেশি। বর্তমানে বিভিন্ন কারণে পানীয় জলের গুণাগুণ ও শস্যের উত্পাদন কমে আসছে। হয়তো আর ক’বছর পর গাছপালার মতো মানুষও শুকিয়ে মারা যাবে। বিভিন্ন কলকারখানা থেকে নির্গত দূষিত বর্জ্য পদার্থগুলো মানুষসহ অন্যান্য প্রাণীরও প্রচুর ক্ষতি করছে। গাছপালারও ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। কীটনাশক পদার্থ, রাসায়নিক সার, নদী, খাল, বিল, পুকুর ইত্যাদিতে মিশে পানি বিষাক্ত হচ্ছে। এর ফলে মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণী আজ মৃত্যুর গহ্বরে। প্লাস্টিকের সামগ্রী, অবাধ হারে পলিব্যাগের ব্যবহার—এসবই পানি দূষিত হওয়ার অন্যতম কারণ। এ ছাড়া আছে সাগরে মেশানো তেলের কথা। এদিকে প্রকৃতি ও পরিবেশের কথা চিন্তা না-করে আমরা যেভাবে ধ্বংসযজ্ঞে মেতে উঠেছি, গাছ-গাছড়া কেটে, মাটি কেটে নগর তৈরি করছি, জলাশয়, নদীনালা মাটি দিয়ে ভরাট করে অট্টালিকা নির্মাণ করছি, ভবিষ্যতের কথা চিন্তা না-করে কলকারখানা তৈরি করছি তাতে ভবিষ্যতে আমাদের হাহাকার করতে হবে পানির জন্য। এমন দিন আর বেশি দূরে নয়, যখন কৃষককে চাতক পাখির মতো আকাশের দিকে চেয়ে থাকতে হবে বৃষ্টির জন্য। পৃথিবীর সবকটি সাগর, মহাসাগর, উপসাগর, নদ-নদী, খাল-বিল, পুকুর-ডোবা, হ্রদ-হিমবাহ, মেরুতুষার-ভূগর্ভস্থ পানি দিয়ে বারিমণ্ডল গঠিত। পৃথিবীর মোট পানির শতকরা ৯৭ ভাগ সমুদ্রে থাকে। শতকরা প্রায় দু’ভাগ পানি আছে হিমবাহ ও মেরুতুষারে। মানুষের পানীয় এবং অন্যান্য ব্যবহারের উপযোগী মাত্র একভাগ পানির উত্স নদ-নদী, হ্রদ, পুকুর, ডোবা, কুয়ো, নলকূপ, ঝরনা ও ভূগর্ভস্থ পানি। সমগ্র পৃথিবীতে পানির পরিমাণ ও মান হ্রাস পাচ্ছে। পরিত্যক্ত পানির শোষণ ও পানীয়জলের শুদ্ধিকরণ বিঘ্নিত হচ্ছে। অথচ পানি ছাড়া প্রাণী বা উদ্ভিদ বেঁচে থাকতে পারে না। পানির অপচয়ের মাত্রা দিনে দিনে বাড়ছে। তাই পানিসম্পদ ব্যবহার ও পানি সংরক্ষণের জন্য যথাযথ আইন প্রণয়ন করা জরুরি। বাংলাদেশসহ বিশ্বের তাপমাত্রা ক্রমেই বাড়ছে। ফলে মেরু অঞ্চলের বরফ গলছে। সমপ্রতি জানা গেছে, তাপমাত্রা বৃদ্ধি হওয়ার ফলেই তিব্বত এলাকার হিমবাহগুলো বেশ দ্রুত গলে যাচ্ছে। এজন্য ২০৫০ সাল নাগাদ উপকূলবাসী থেকে শুরু করে যাযাবর জাতি পর্যন্ত এশিয়ার ২০ কোটি মানুষ চরম পানি সংকটে পড়বে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। বরফ খুব পুরু হয়ে জমাট বাঁধে। পরে সেগুলোর গলিত পানি গিয়ে পড়ে ইয়াংশি, ইয়েলো, ব্রহ্মপুত্র এবং মেরুসহ এশিয়ার বড়ো বড়ো নদ-নদীতে। এসব নদীসমূহ এবং আরো কিছু বড় নদী তিব্বতের হিমবাহ থেকে উত্পত্তি হয়েছে। ওয়াটে স্টেট ইউনিভার্সিটির হিমবাহ বিশেষজ্ঞ লনি থম্পসন বলেন, অনেক বিজ্ঞানীর মতে তৃতীয় মেরু হিসাবে পরিচিত এ মালভূমির তাপমাত্রা বিশ্বের অন্য অংশের তুলনায় দ্বিগুণহারে বাড়ছে। বর্তমানহারে বরফ গলতে থাকলে তিব্বত মালভূমির দুই-তৃতীয়াংশ হিমবাহ ২০৫০ সালের মধ্যে গলে যাবে। এর পূর্বেই মানুষ পানির জন্য মালভূমির যে স্তরের ওপর নির্ভরশীল তা আক্রান্ত হবে। ফলে পানি সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেবে। ওয়াশিংটনের উডরো উইলসন ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর স্কলার্সের পরিবেশ ও নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিচালক জিওফ ডাবেলকে বলেন, নদ-নদীগুলোর পানি কমে গেলে চীন, ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও ভূটানের প্রায় ৫০ কোটি মানুষ সংকটে পড়বে। কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির তিব্বত বিষয়ক অধ্যাপক রবার্ট বারনেট বলেন, পানি সংকটের ভয়াবহ দিকটি হচ্ছে এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ে নতুন ধরনের যুদ্ধ শুরু হতে পারে। থম্পসন এও বলেন, গলে যাওয়া পানি ধরে রাখার জন্য বাঁধ নির্মাণ করলে কিছু ক্ষেত্রে কাজে আসতে পারে কিন্তু এটা কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। আর এ ধরনের বাঁধ নির্মাণে উজানের দেশগুলোর লোকদেরকে বাধার মুখে পড়তে হবে। বিশ্ববিজ্ঞানীদের জনমঞ্চ এক বিবৃতিতে প্রকাশ করেছেন—ক্রমবর্ধমান পানির অভাব খাদ্যের যোগান এবং মানুষের স্বাস্থ্যের প্রতি গুরুতর হুমকির সৃষ্টি করেছে। এতে পৃথিবীর বাস্তুতন্ত্রের দারুণ ক্ষতি হচ্ছে। সেজন্য প্রয়োজন পানি সংরক্ষণ ও পানির সীমিত ব্যবহার। বৃষ্টিপাতের প্রয়োজনে অরণ্য সংরক্ষণ ও নতুন করে বৃক্ষ রোপণের মাধ্যমে বনাঞ্চল সৃষ্টি অত্যন্ত জরুরি। লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট। বৃক্ষরোপণে জাতীয় পুরস্কার (১ম স্বর্ণপদক) প্রাপ্ত