পল্লী জনপদে আশার আলো

আপডেট : ২২ জুলাই ২০১৪, ২১:২৮
বাংলাদেশের গ্রাম লইয়া যে সমস্ত চিরায়ত ছড়া-কবিতা রহিয়াছে, জসীম উদ্দীনের চোখ দিয়া যেভাবে পল্লীরূপকে আমরা কল্পনা করিতে পারি, তাহার বিবর্তন ঘটিতেছে অতি দ্রুত। জীবনানন্দ বাংলার প্রকৃতির যেই মুখ দেখিয়া পৃথিবীর আর কোনো সৌন্দর্য খুঁজিবার প্রয়োজন বোধ করেন নাই, তাহা আজ আর সেইরূপে নাই। পরিবর্তন যুগের ধর্ম, সুতরাং তাহা যাহাতে ইতিবাচক পথে ঘটিবার পথ পায়, তাহা গুরুত্বপূর্ণ। পরিসংখ্যান মতে এই দেশের চারজনের তিন জন এখনও গ্রামেই বসবাস করেন। দেশের ৮৭ সহস্রাধিক গ্রামে তাহারা যাহাতে বসবাস করিবার ন্যূনতম আধুনিক সুযোগ-সুবিধা পাইতে পারেন, তাহার ব্যবস্থা করা শুধু তাহাদের জন্যই জরুরি নহে। বিগত কয়েক দশকে যেই হারে গ্রামের মানুষ নগরে-মহানগরে ছুটিয়া আসিতেছে, তাহা সকলের জন্যই বিপজ্জনক। ছিন্নমূল-বাস্তুহারা মানুষের স্রোত শহরে বাড়িতেছে নানা কারণে। অথচ আমাদের গ্রামের পরিবেশ এখনও যেইটুকু অবশিষ্ট রহিয়াছে, তাহার সদ্ব্যবহারে এই গ্রাম হইয়া উঠিতে পারে জীবনযাপনের নন্দনক্ষেত্র। আমাদের লোকসংখ্যার তুলনায় জমির পরিমাণ এতটাই সামান্য যে, বিশ্বের জনঘনত্বে আমাদের শীর্ষে কেহ নাই। আমাদের কৃষিকাজের প্রধান ক্ষেত্রই ৮৭ হাজার গ্রাম। কৃষিতে উত্পাদনের পদ্ধতি, চাষবাসের ধরন, যন্ত্রের ব্যবহার, সেচ ব্যবস্থা, ঋণ ব্যবস্থা, সর্বোপরি ভূমি মালিকানার চরিত্রও উল্লেখযোগ্য ও তাত্পর্যপূর্ণভাবে পরিবর্তিত হইয়াছে। তাহার সহিত দুশ্চিন্তার কথা হইল—ফি-বত্সর আমাদের কৃষি ভূমির ১ শতাংশ হারাইয়া যাইতেছে প্রধানত আবাসন ব্যবস্থার সংস্থানে। এই হার দিন দিন বাড়িতেছে, এবং মাত্র অর্ধ-শতক পর, এইভাবে চলিতে থাকিলে, আমরা আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য লইয়াও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হইবার সুখস্বপ্ন কল্পনা করিতে পারিব না শুধু ন্যূনতম কৃষিজমির অভাবে। সুতরাং পরিকল্পিত ব্যবস্থা এখন হইতেই গ্রহণ করিতে হইবে। সমপ্রতি ইত্তেফাকের একটি প্রতিবেদনে জানা গিয়াছে, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে নাগরিক সুযোগ-সুবিধা প্রদান করিতে ‘পল্লী জনপদ’ নামক একটি প্রকল্প অচিরেই অনুমোদনের অপেক্ষায় রাখিয়াছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়। এই প্রকল্পের আওতায় বিচ্ছিন্নভাবে বসবাসকারী গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় লইয়া আসা হইবে। তাহাদের জন্য সরকার চারতলা বিশিষ্ট ফ্ল্যাট তৈরির ব্যবস্থা করিবে। বিদ্যুত্, গ্যাস সুবিধাসহ সামগ্রিক নাগরিক সুযোগ-সুবিধাও মিলিবে সেখানে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের ভাবনা নিশ্চয়ই সাধুবাদ পাইতে পারে। কেননা তাহাদের উদ্দেশ্য কৃষিজমি হ্রাসের লাগাম টানিয়া ধরা। তাহার সঙ্গে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে গ্রামেই শহরের ন্যূনতম সুবিধার ব্যবস্থা করা। বর্তমানে দেশের ৮টি গ্রামে পাইলট প্রকল্প হিসাবে ‘পল্লী জনপদ’ প্রকল্পটির কার্যক্রম চলিতেছে। যে সমস্ত উপজেলা নূতন করিয়া হইয়াছে সেখানে যাহাতে পরিকল্পিত নগরায়ন হয়, তাহারও ভাবনা রহিয়াছে। ইহা সকলেই বোঝেন যে, এ যাবত্কালে চলিয়া আসা অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলেই দেশের কৃষিজমির সঙ্কট আরও ঘনীভূত হইয়াছে। নগর পরিকল্পনায় শহরের কলেবরই কেবল বৃদ্ধি করা হয়। তাহাতে জমির মূল্য বৃদ্ধির কারণে কৃষি জমি তাহার নিজস্ব চরিত্র হারায়। অথচ সুষ্ঠু নগরায়নে নিবিড় লোকালয় তৈরি করা সম্ভব হইলে অপ্রয়োজনীয়ভাবে ভূমি সম্পদের ব্যবহারকেও নিরুত্সাহিত করা যায়। শরীরের একদিকে ক্রমান্বয়ে স্ফীতি ঘটিলে তাহাকে সুস্বাস্থ্য বলা যায় না। আমাদের নগর-মহানগরে জনস্রোতের ঢলকে সামলাইতে হইলে সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে তাহার ভারসাম্য রক্ষা করা অপরিহার্য হইয়া উঠিয়াছে। শুধু পরিকল্পনা প্রণয়ন নহে, তাহার বাস্তবায়নের ওপরেই নির্ভর করিবে এই প্রকল্পের সাফল্য। সুতরাং গ্রামকে সুষ্ঠু পরিকল্পনায় বাঁচানো গেলে তাহা শহর তথা সমগ্র দেশের হূিপণ্ডে শুদ্ধ রক্ত সরবরাহ করিবে। তাহা ভিন্ন বাঁচিবার উপায় কী?

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন