‘আমার শহরের নাম দীর্ঘশ্বাস সিটি’

আপডেট : ২২ জুলাই ২০১৪, ২১:৪৮
১৯৪৪ সালের ৪ অগাস্ট ফানডানের চিলেকোঠায় গেস্টাপো বাহিনীর হানা দেয়ার আগে জীবনের শেষ ডায়েরিতে আনা ফ্রাঙ্ক লিখেছিলো ‘একদিন সব কষ্টের অবসান হবে। পৃথিবীতে আর কোন গেস্টাপো বাহিনী থাকবে না। একদিন সব শিশু স্কুলে যাবে। আমরা সবাই যার যার ঘরে ফিরে যাবো।’ পৃথিবীর দুর্ভাগ্য এই যে, আনার চাওয়া পূরণ হয়নি। দেশে দেশে আজো আছে গেস্টাপো বাহিনী। তবে ভিন্ন নামে, অন্য পরিচয়ে । অতএব, ২০১৪ তে এসেও এই পৃথিবীরই আরেক প্রান্তের আরেক সংস্কৃতির কিশোরীকে আনার মতোই বেদনার কলম দিয়ে লিখতে হয়। ইঁদুরেরও গর্ত আছে, কাঠবিড়ালির আছে গাছ, মাছদের জন্য নদী আর পাখির জন্য আকাশ, কিন্তু ফিলিস্তিনিদের দেশ নেই। আর এসব ঘরহীন উদ্বাস্তু মানুষের জন্য মাহমুদ দারবিশকে লিখতে হয়, ‘আমার স্কুলের নাম কষ্ট বিদ্যালয়। আমার শহরের নাম দীর্ঘশ্বাস সিটি। আমার রাস্তার নাম দুর্দশা রোড আর আমার টেলিফোন নাম্বর শূন্য শূন্য শূন্য হাহাকার ।’ ৬৬ বছর কাটলো। মাহমুদ দারবিশ এবার ফিলিস্তিনের পানে চেয়ে, একবার নক্ষত্রের পানে চেয়ে, নক্ষত্রের কাছেই শেষমেশ চলে গেলেন, ইসরাইল বর্বরতার মূর্তমান প্রতীক হয়েই থাকলো। তিনজন ইসরাইলি তরুণকে হামাস অপহরণ করেছিলো বলে ইসরাইল দাবি করছে। সেই অপহরণের পর শত শত হামাস কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে, আবু খাদের নামের একজন ফিলিস্তিনি তরুণকে ধরে এনে মুখে পেট্রোল ঢেলে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে এবং যথারীতি পশ্চিমা গণমাধ্যম এই ঘটনা চেপে গেছে। লগ অন করলেই আলাদীনের দৈত্যের মতো তথ্যের দৈত্য আপনার চাহিদা মাফিক এসব তথ্য হাজির করে দেবে। কিন্তু যা হাজির করতে পারবে না তা হলো শত শত প্রাণ। ৯০-এর পর সোভিয়েত ইউনিয়নে গ্লাসনস্তের হাওয়া বইতে শুরু করলে সে হাওয়ায় ভেসে গেল সব আশা আর আদর্শবাদও। এখন আরব লীগ আর ওআইসি কোন মতে, দায়সারা গোছের একটুখানি প্রতিবাদ করে। মিসর পরিণত হয়েছে, ‘বন্ধু তুমি, শত্রু তুমিতে।’ সিরিয়া, জর্ডান,তুরস্কের ভূমিকা - পৃথিবীতে কে কাহার? আর জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন যারা বাংলাদেশের মানবাধিকারের পান থেকে খসে পড়লে সংস্কারের চুন-জগতের কোথাও আর এক ফোঁটা মানুষের অধিকার নাই বলে হায় আফসোস করে তারাও এখন কেবল একখানা তদন্ত কমিটির ঘোষণা দিয়েই দায় সেরেছে। এই হলো জাতিসংঘের সেই মানবাধিকার কমিশন যেখানে ফিলিস্তিনি শিশুর কান্না জাতিসংঘের দেয়াল থেকে ফিরে আসে। ভেতরে বসে থাকা নাভি পিল্লাই আপাদের কান পর্যন্ত পৌঁছায় না। পাশার দান উল্টে গেছে, যে কারণে মস্কোর কার্ল মার্কস এ্যাভিনিউতে খোলা হয় রকফেলার ব্যাঙ্ক- আর তার জের ধরে বিশ্বও হয়ে পড়ে ভারসাম্যহীন। ভারসাম্যহীন এই দুনিয়ায় বিশ্ব এক চক্ষু হরিন জাতিসংঘ ( নাকি বিষবৃক্ষ) যা বয়ান দেবে তাই মেনে নিতে হবে বিশ্ববাসীকে। বিস্ময় নিয়ে ভাবি, কোথায় আমাদের ৫ মের শাপলা চত্বরের স্মরণীয় হেফাজতের বরণীয় নেতারা। ইতালীয় দার্শনিক বেনেদিত্তো তত্ত্ব কে মিথ্যে প্রমাণ করে তারা হামাসের পক্ষে একটি বিবৃতিও তো দিলেন না। ও হ্যাঁ বেনোদিত্তো ক্রোচে তত্ত্ব দিয়েছিলেন স্বজাতির প্রতি মানুষের আবেগ সাপের মতো কণ্ডুলী পাকিয়ে ঘুমিয়ে থাকে এবং সেই আবেগে টোকা পড়লে যথা নিয়মে ফুঁসেও ওঠে। লক্ষ্য করুন গত ৮ জুলাই আলতাদীঘির জাতীয় উদ্যানে বিপদাপন্ন শেয়ালের প্রতি সহমর্মিতাবশত শত শত শেয়াল হাজির হয়েছিলো। ধূর্ততা এবং চতুরতার উদাহরণ টানতে গিয়ে আমরা সবসময়ই শেয়ালের উদাহরণ টানি। আসলে আমারা ভুলই করি। মনে রাখা দরকার, শেয়াল নয় বরং শেয়ালের চেয়েও ধূর্ত আর চতুর প্রাণী আমাদের মানুষের মধ্যেই আছে। ঘৃণা প্রকাশও তো এক ধরনের প্রতিবাদ। সেটুকুও তো করলো না আরব বিশ্ব। আর যে জাতিসংঘের ভূমিকা হওয়া উচিত ছিলো সবচেয়ে ফলপ্রসূ, তারা তো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তাদের সব বিকিয়ে বসে আছে। জন্মের পর পর থেকেই তারা ভূমিকা বিষবৃক্ষের, নিপীড়িতের ছায়া বৃক্ষ নয়। হ্যামার সোল্ড ফাউন্ডেশন তাদের এক সমীক্ষায় দেখিয়েছে পৃথিবীর উপার্জিত অর্থের সত্তর ভাগই খরচ করে বৃহত্ শক্তির চারটি দেশ আর তাদের খরচের প্রধান খাত হচ্ছে অস্ত্র। যতদিন পর্যন্ত ইসরাইলের সাথে শক্তিমানের এই অস্ত্র বেচা-কেনার সম্পর্ক থাকবে ততদিন পর্যন্ত থেকে থেকে নানান ছুতো নাতায় ইসরাইল, ফিলিস্তিনিদের উপর অন্যায় অভিযান চালাতেই থাকবে। আর যুদ্ধ বিরতির প্রস্তাব অভিনিত হতেই থাকবে। স্মরণ করা দরকার, যুদ্ধকালীন (১৯৭১) বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ এ ধরনের তথাকথিত যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছিলো। সেদিন যদি সোভিয়েত ইউনিয়ন ওই প্রস্তাবে ভেটো না দিতো হয়তো বাংলাদেশেরও দশা হতো ওই প্যালেস্টাইনের মতই। দুঃসময়ের মুখোমুখি বাংলাদেশের পাশে থেকে সোভিয়েত ইউনিয়ন যে বলিষ্ঠ ছায়া দিয়েছিলো সেই ছায়ার প্রতি ভালোবাসা জানানোর ভাষা কী হতে পারে? যে বৃক্ষ ছায়া দেয়, জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি আগলে রাখে, সেই বৃক্ষকে তো আর ধন্যবাদ বলা যায় না! লেখক : কথাসাহিত্যিক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন