ক্ষুদ্রশিল্পে প্রসারিত হউক সহায়তার হাত

আপডেট : ২৩ জুলাই ২০১৪, ২১:১৬
দেশের অর্থনীতিতে নিরন্তর যাহারা প্রাণের সঞ্চার করিয়াছে তাহাদের খবর রাখিবার প্রয়োজন আমরা কমই অনুভব করিয়াছি। এযাবত্কালে গ্রামীণ ক্ষুদ্র ও অসংগঠিত উদ্যোক্তাদের নূতন নূতন কর্মপ্রয়াস এবং ছোট পরিসরে হইলেও কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দেশের জিডিপিতে তাহাদের সমষ্টিগত অবদান সমপর্কে যে গবেষণাকর্ম হইয়াছে তাহার পরিমাণ খুবই নগণ্য। দেশের অর্থনীতিতে বিদেশ হইতে প্রেরিত রেমিটেন্স এবং ভারী ও মাঝারি শিল্পের পাশাপাশি এইসব কৃষিজ এবং কুটির শিল্পের অবদান অনস্বীকার্য। উত্পাদনের এই ক্ষেত্রগুলিতে বিগত কয়েক দশকে যে বিপ্লব ঘটিয়াছে তাহা রীতিমত অবাক করিবার মত, একক কিংবা সামষ্টিকভাবে। নূতন উদ্ভাবিত জাত ও পদ্ধতির ব্যবহার এখন যেন খুব স্বাভাবিক ব্যাপার হইয়া উঠিয়াছে এইসব ক্ষেত্রে। কী রাজনৈতিক অস্থিরতা, কী বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, কোনো প্রতিকূলতাই তাহাদের অর্থনৈতিক কার্যাবলীতে তেমন নেতিবাচক প্রভাব ফেলিতে পারে নাই বিগত কয়েকটি বত্সরে। আখেরে ইহা দেশের অর্থনীতির চাকা রাখিয়াছে সচল, স্বকর্মসংস্থান সৃষ্টি হইবার ফলে চাকুরীর বাজারে চাপ কমিতেছে উল্লেখযোগ্য হারে। উত্পাদিত পণ্য বাজারজাতকরণের কাজটিও এসব উত্পাদনকারী নিজেরাই করিয়া থাকে। ফলে মধ্যস্বত্বভোগীদের দাপট এখন তেমন আর লক্ষ করা যায় না। কতক ক্ষেত্রে পাইকারি ক্রেতাগণ সরাসরি উত্পাদনকারীর কাছে গিয়া হাজির হয়। ফলে প্রতিশ্রুতিশীল এই খাতটির প্রতি গ্রামীণ অনেক স্বল্প-শিক্ষিত তরুণের আগ্রহ বেশ লক্ষণীয়। একক বা সামষ্টিকভাবে বিভিন্ন কৃষিজ ও অ-কৃষিজ পণ্যের উত্পাদন হইতেছে দেশের নানা প্রান্তে। যোগাযোগ এবং প্রযুক্তিক্ষেত্রে প্রভূত উন্নয়ন সাধনের ফলে পণ্যের আনা-নেওয়া এবং উত্পাদন ও বাজারজাতকরণ আগের তুলনায় এখন অনেক সহজসাধ্য, যাহা এই ক্ষেত্রের বিকাশে বিরাট ভূমিকা রাখিয়াছে। অতীতে কৃষিজ ফসল ও অপচনশীল দ্রব্যের বেশিরভাগই উত্পাদিত হইত নিজেদের চাহিদা মিটাইবার জন্য। কিছু কিছু ক্ষেত্রে, বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে পণ্যের উত্পাদন করা হইলেও তাহার পরিসর ছিল অত্যন্ত ক্ষুদ্র অর্থাত্ বাণিজ্যিক ভিত্তিতে এই সকল পণ্যের উত্পাদন হইত না বলিলেই চলে। কিন্তু বর্তমানকালে এই পণ্যগুলির বাজার শুধু দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ নাই, বিদেশেও ছড়াইয়া পড়িতেছে ব্যাপকভাবে-যাহা আমাদের অর্থনীতির পক্ষে অত্যন্ত ইতিবাচক। উত্পাদিত ফসল প্রক্রিয়াকরণ ও রূপান্তরের মাধ্যমে পণ্যের মূল্য সংযোজন করা হইতেছে এবং কোনো ধরনের কেমিক্যাল ব্যবহার ব্যতীত দীর্ঘ সময় পর্যন্ত উহাকে ভোগযোগ্য করিয়াও রাখা হইতেছে। সত্যিই ইহা স্বস্তিদায়ক খবর। তবে এই সকল ক্ষেত্রে যে অনিশ্চয়তা নাই, তাহা নহে। অংকে অল্প হইলেও সঠিক সময়ে অর্থ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে হিমশিম খাইতে হয় উদ্যোক্তাগণকে। এ বিষয়ে দৈনিক ইত্তেফাকের ধারাবাহিক প্রতিবেদনে বিনিয়োগ-অর্থ সংকটসহ কতিপয় সমস্যা নিরূপিত হইয়াছে। যোগাযোগ অবকাঠামোতেও কিছু সমস্যা রহিয়া গিয়াছে। সামপ্রতিককালে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাগণের এহেন উদ্যমী কর্মকাণ্ডকে আগাইয়া নেওয়ার জন্য সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগ লক্ষণীয়। স্বল্প সুদে বিভিন্ন মেয়াদে ঋণদান কর্মসূচি গ্রহণ করিয়াছে অনেক প্রতিষ্ঠান যাহা নূতন এই ক্ষেত্রটিতে নিয়োজিতদের মধ্যে বিপুল উত্সাহের সৃষ্টি করিয়াছে-সন্দেহ নাই। কিন্তু সমস্যার শেষ কিন্তু এইখানেই নহে। ঋণ লওয়ার ক্ষেত্রে যে সকল কঠিন শর্ত এবং জটিল প্রক্রিয়া বিদ্যমান তাহা অনেক উদ্যোক্তাকেই নিরুত্সাহিত করিতে পারে। তাই যত দ্রুত সম্ভব ইহা দূর করিতে হইবে। দেশের অর্থনীতিকে টেকসই করিবার জন্য এই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সুসংগঠিত করা বাঞ্ছনীয়। আর্থিক সহায়তা কর্মসূচি যাহাতে প্রকৃত অর্থেই তাহাদের উপকারে আসে সেই ব্যবস্থা করাও আশু কর্তব্য।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন