১৯৯০ সালের মার্চ মাসে থাইল্যান্ডের জমতিয়েনে সার্বজনীন শিক্ষার জন্য বিশ্ব সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে যে ঘোষণা গৃহীত হয়েছিল তা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের জন্য ২০০০ সালে সেনেগালের ডাকারে বিভিন্ন দেশের সরকার প্রতিনিধি, সিভিল সোসাইটি, ইউনেস্কো ও বিশ্ব ব্যাংকের মত উন্নয়ন সংস্থার সিদ্ধান্তক্রমে (১) লিঙ্গ বৈষম্যহীনতা, (২) বিদ্যালয়ে ভর্তির হার শতভাগ, (৩) প্রাক প্রাথমিক শিক্ষা, (৪) বয়স্ক শিক্ষা, (৫) সাম্যতার ভিত্তিতে শিক্ষা ও (৬) মানসম্মত শিক্ষা এ ছয়টি বিশেষ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। ডাকারের ঘোষণা মতে, বিশ্বের প্রায় সকল দেশ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে লিঙ্গ বৈষম্য দূর করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। বাংলাদেশে মেয়েদের জন্য উপবৃত্তি কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অনেকাংশে সফল হয়েছে। বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ ও শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচির মাধ্যমে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির হার বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছে। তবে এখনও বহু শিশু বিদ্যালয়ের বাইরে রয়েছে এবং কায়িক পরিশ্রমে জড়িয়ে রয়েছে যা আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচিত। বর্তমান সরকারকে শিশু শ্রমরোধে অবশ্যই আন্তরিক হতে হবে। দেরিতে হলেও আমাদের দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রাক প্রাথমিক বিদ্যালয় চালু হয়েছে যদিও মান নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। তবে ৩১৭টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ও শহর অঞ্চলে বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়সমূহে এর ব্যত্যয় ঘটেছে। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা সীমিত আকারে বয়স্ক শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে গেলেও সরকারি পর্যায়ে এ ক্ষেত্রে ভূমিকা গৌণ।
প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক হওয়া সত্ত্বেও বিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার হতাশাব্যঞ্জক। বিভিন্ন মহলের সক্রিয় প্রচেষ্টায় ঝড়ে পড়া রোধে বিশেষ কর্মসূচি চালু রয়েছে। এ ব্যবস্থা অব্যাহত রাখা খুবই প্রয়োজন। তবে বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মানসম্মত শিক্ষা। মানসম্মত শিক্ষা নিয়ে সংজ্ঞাগত মতপার্থক্য দূর করে এডুকেশন ইন্টারন্যাশনাল মানসম্মত শিক্ষায় মূল উপাদান হিসেবে ক) মানসম্মত শিক্ষক, খ) মানসম্মত পরিবেশ ও গ) মানসম্মত শিক্ষা উপকরণ নির্ধারণ করেছে। বাংলাদেশসহ সকল উন্নয়নশীল ও উন্নত দেশের সার্বিক অবস্থা পর্যালোচনা করে মানসম্মত শিক্ষার জন্য এডুকেশন ইন্টারন্যাশনাল শিক্ষক, ছাত্র, অভিভাবক, বিভিন্ন পেশার মানুষ ও সরকারের মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন। এরই অংশ হিসেবে সারাবিশ্বে নানা কর্মসূচি পালন করে চলছে এবং ২০১৫ সালের জুলাই মাসে কানাডার অটোয়ায় অনুষ্ঠিতব্য ৭ম বিশ্ব শিক্ষক সম্মেলনের প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারণ করা হয়েছে-Unite for Quality Education : Better education for a better World-এ সংগঠন বিশ্বাস করে মানসম্মত শিক্ষা শিশুসহ সকলের মৌলিক ও মানবিক অধিকার। তাছাড়া মানসম্মত শিক্ষার মাধ্যমেই মানসম্মত শিক্ষক প্রাপ্তি সম্ভব। তাই শিক্ষা ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বিনিয়োগ, পর্যাপ্ত অবকাঠামোসহ নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং মানসম্মত শিক্ষক নিশ্চিত করতে হবে।
মানসম্মত ও দক্ষ শিক্ষক পেতে হলে তাদের পেশাগত স্বীকৃতি, সম্মানজনক বেতন, পেনশন, সামাজিক প্রাপ্তি ও চমত্কার কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। সর্বোপরি মনে রাখতে হবে যে, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ব্যতীত দক্ষ কাঠমিস্ত্রী দিয়ে যেমন একটি ঘর তৈরি করা যায় না তেমনি দক্ষ শিক্ষক ও প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ ব্যতীত শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষাদান করতে পারেন না।
তাছাড়া পরীক্ষা পদ্ধতিতে আধুনিকায়ন প্রয়োজন। বর্তমানে পরীক্ষা পদ্ধতি ত্রুটিপূর্ণ হওয়ার কারণে জিপিএ ৫ এর ছড়াছাড়ি কিন্তু মান প্রশ্নবিদ্ধ। সাম্প্রতিককালে প্রশ্ন ফাঁসের প্রসঙ্গটি এসে যায়। তাই শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নের মূল উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে পরীক্ষা পদ্ধতি সংস্কার ব্যতীত শিক্ষার মান নিশ্চিত অসম্ভব। তাই এডুকেশন ইন্টারন্যাশনাল জাতিসংঘের কর্মসূচির সাথে মিল রেখে ২০১৫ সালের মধ্যে মিলেনিয়াম গোল অর্জনে সফল নয় বাংলাদেশসহ এমন দেশের জন্য ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের জন্য বেশ কিছু সুপারিশ পেশ করে। তা হলো (১) ২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য মানসম্মত প্রাক প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা। (২) ২০৩০ সালের মধ্যে সকল বালক-বালিকাদের অবৈতনিক, সমতা ভিত্তিক ও মানসম্মত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা দান। (৩) ২০৩০ সালের মধ্যে সকল শিক্ষার্থীদের জন্য দক্ষ, পেশাগত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, উত্সাহধর্মী ও সহায়ক শিক্ষক নিশ্চিত করা। (৪) ২০৩০ সালের মধ্যে নিরাপদ, কার্যকরী শিক্ষাদান উপযোগী, উচ্চতর শিক্ষাদান উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করা। (৫) ২০৩০ সালের মধ্যে বাজেটে শিক্ষাখাতে জিডিপি অন্তত ৪-৬% বরাদ্দ দেয়া নিশ্চিত করাসহ বেশ কিছু মূল্যবান সুপারিশ পেশ করে।
উপরোক্ত সুপারিশের আলোকে নির্ভুল পাঠ্যপুস্তক রচনা, শ্রেণিকক্ষে আইসিটি প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে আধুনিক উপকরণ যেমন ওভারহেড প্রজেক্টের অডিও ভিডিও স্লাইড, রঙিন বোর্ড, মার্কার, ডাস্টার, হোয়াইট বোর্ড প্রভৃতি কৌশল অবলম্বনের মাধ্যমে শিক্ষাদানকে চিত্তাকর্ষণ করেই শিক্ষার্থীদের জীবনভিত্তিক শিক্ষাদান সম্ভব। তাই দলমত নির্বিশেষে মানসম্মত শিক্ষার জন্য প্রয়োজন ঐক্যমত।
লেখক: জেনারেল সেক্রেটারি
বাংলাদেশ টিচার্স ফেডারেশন এফিলেটেড এডুকেশন ইন্টারন্যাশনাল
e-mail:[email protected]
