স্মরণ

ইতিহাসবিদ ড. আবদুল করিম

আপডেট : ২৩ জুলাই ২০১৪, ২১:১৭
প্রায় আশি বছর দৈর্ঘ্যের জীবনে সদা সৃষ্টিশীল আবদুল করিমের পৃথিবী আবর্তিত হয়েছে বাংলার মধ্যযুগের ইতিহাসকে কেন্দ্র করে। মধ্যযুগের সামাজিক ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে তাঁকে ফারসি ভাষায় রচিত গ্রন্থাবলি, সূফী সাধকদের জীবনচরিত, শিলালিপি ও মুদ্রার মতো জটিল বিষয় নিয়ে হাবুডুবু খেতে হয়েছে। তবে নিউ স্কীম মাদ্রাসার ছাত্র হওয়ায় আরবী-ফার্সী ভাষায় একটা দখল তাঁর আগেই ছিল। আর মুদ্রা ও শিলালিপির মতো টেকনিক্যাল বিষয় আয়ত্ত করতে নাকি যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছিল। কিন্তু তিনি তো ছিলেন নাছোড়বান্দা। প্রথম অভিসন্দর্ভের কাজ শুরু করে তেমন কোন উপাদান খুঁজে পাচ্ছিলেন না। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর কাছে গিয়ে কোন উত্সাহ পেলেন না। শহীদুল্লাহ সাহেব নাকি কখনো বই ধার দিতেন না, তাঁর লাইব্রেরীতে বসেই পড়তে হতো। ড. এনামুল হক তো আবদুল করিমকে তাড়িয়েই দিয়েছিলেন। আর গবেষণা-নির্দেশক প্রত্নতত্ত্ববিদ আহমদ হাসান দানীর কাছে উত্স-উপাদানের খবর জানতে গেলে নাকি শুধু বলতেন ‘সার্চ ইট আউট’। যা হোক, কঠোর অধ্যবসায়ের পর তিনি মুদ্রা বিশেষজ্ঞ হিসাবে লিখলেন ‘করপাস অব দি মুসলিম কয়েনস্ অব বেঙ্গল’ এবং ‘ক্যাটালগ অব কয়েনস্ ইন দি ক্যাবিনেট অব দি চিটাগং ইউনিভার্সিটি মিউজিয়াম’। শিলালিপি নিয়ে নাওয়া-খাওয়া ভুলে পয়দা করলেন ‘করপাস অব দি এরাবিক এন্ড পার্সিয়ান ইনস্ক্রিপশন্স্ অব বেঙ্গল’-এর মত ছয়শতাধিক পৃষ্ঠার বই। ইতিহাসের উত্স হিসাবে মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য হাঁতড়ে হাঁতড়ে তৈরি করলেন ‘বাংলা সাহিত্যের কালক্রম(মধ্যযুগ)’। ‘ঢাকা দি মুঘল ক্যাপিটাল’ রচনার জন্য লণ্ডনে উপাত্ত খুঁজতে গিয়ে তিনি ডাচ ভাষাও শিখে ফেললেন। নির্দিষ্ট সময়ের বেশ আগেই মূল কাজ খতম করে বিলেত বসেই মসলিন শিল্পের ইতিহাস নিয়ে মৌলিক গ্রন্থ ‘ঢাকাই মসলিন’ প্রকাশ করলেন। তবে বাংলা ভাষায় লেখা ‘বাংলার ইতিহাস ঃ সুলতানী আমল’-সম্ভবত আবদুল করিমের শ্রেষ্ঠ মৌলিক কর্ম। ইনস্টিটিউট ফর বাংলাদেশ স্টাডিজ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়-এর সিনিয়র ফেলো থাকাকালীন দুই খণ্ডে ‘হিস্ট্রি অব বেঙ্গল-মুঘল পিরিয়ড’ রচনা করেন। মেলা দীর্ঘ এই সৃষ্টিযজ্ঞ। তাঁর বিরামহীন গবেষণার ফসল বাংলা-ইংরেজি মিলিয়ে প্রায় চল্লিশটির মতো বই আর দু’শতের কাছাকাছি মৌলিক গবেষণা প্রবন্ধ। বাংলাপিডিয়াতে তাঁর একশ’ কুড়িটির মত বিষয়ে লেখা আছে। আছে সেই পাকিস্তান অবজারভার থেকে আজাদী, পূর্বকোণের কোণায় কোণায় অগণিত লেখা। তিনি উপাচার্য, প্রভোষ্ট, হাউস টিউটর-বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সব প্রশাসনিক দায়িত্ব এবং সামাজিকতা পালন করেছেন। কম্পিউটার ছিল না তাঁর কালে। জীবনে কোনদিন রাত দশটার পরে জাগেননি। তবে এত লিখলেন কীভাবে? সত্যি, এ এক বিপন্ন বিস্ময়। কখনো সময় অপচয় করেননি। এস.এম হলে তাঁর বাসায় গিয়ে অনেকেই দেখেছেন, চেয়ার-টেবিল, বিছানা, মেঝে সব জায়গাতে বই। বেশ কিছু বইয়ের মধ্যে ছোট ছোট কাগজ গোঁজা। অসম্ভব স্মরণশক্তির অধিকারী প্রফেসর করিম একসাথে অনেক কাজ করতে পারতেন। ড. করিম ১৯৫১ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। ১৯৬৬ সালে সদ্য প্রতিষ্ঠিত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে যোগ দেন। ইমেরিটাস প্রফেসর হিসাবে জীবনের শেষদিন পর্যন্তও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কথা প্রসঙ্গে একবার তিনি বলেছিলেন, প্রশাসনে না জড়ালে হয়ত আরও কয়েকটা বই লেখা যেত। গুরু এ,এইচ, দানীর এই একটি বিষয় অনুসরণ করেননি তিনি। ড. দানী নাকি লেখাপড়ার ক্ষতি হবে ভেবে বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্বটাও নেননি। বেশ রাজনীতি সচেতন মানুষ ছিলেন আবদুল করিম। ষাটের দশকে পাকিস্তানি শাসকদের শোষণ-নির্যাতনের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের মধ্যে যাঁরা সোচ্চার ছিলেন ড. করিম তাঁদের একজন- ছাত্র রাশেদ খান মেননের কথা। আর আরেক ছাত্র মাহমুদুর রহমান মান্না বলেছেন, করিম স্যার ছিলেন ছাত্রদের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক ক্রিয়াকাণ্ডের বড় উত্সাহদাতা। জীবনের একটা বড় সময় অভাবের সাথে বোঝাপড়া করতে হয়েছে তাঁকে। তাই শেষ জীবনে পেছনে তাকিয়ে বলে গেলেন, “অর্থ সংকট উচ্চশিক্ষার পথে বাধা নয়”। অগণন সৃষ্টিকর্মের ভেতর দিয়ে আবদুল করিম আমাদের স্মৃতিতে অম্লান হয়ে আছেন, থাকবেন। আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে তাকে শ্রদ্ধা। লেখক :শিক্ষক, ইতিহাস বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় zahidhistory¦gmail.com

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন