বিষাক্ত প্যারাসিটামল সিরাপ

আপডেট : ২৪ জুলাই ২০১৪, ২১:২৪
বিচারের রায় অবশেষে পাওয়া গিয়াছে বটে। বিলম্বিত বিচার অনেকক্ষেত্রেই বিচার অস্বীকারের সমতুল্য। তবে ২১ বত্সরের বিলম্বকে ‘বিচার-অস্বীকার’ বলা যায় না নিশ্চয়ই, কিন্তু এতখানি কালক্ষেপণও দুঃখজনক। কেননা ঘটনাটি শুধু মর্মান্তিকই নহে, তাহা যেন এক ধরনের নীরব গণহত্যা। তত্কালীন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত ঘটনার বিবরণে জানা যায়, ১৯৮৯ হইতে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত কয়েকটি ঔষধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের তৈরি প্যারাসিটামল খাইয়া মৃত্যু হয় প্রায় পৌনে তিন হাজার শিশুর। সেই সময় ঢাকার শিশু হাসপাতালে অ্যাডফ্লেমের তৈরি প্যারাসিটামল সিরাপ ‘ফ্ল্যামোডল’ সরবরাহ করা হইত। জ্বরে আক্রান্ত যেই সকল শিশু ওই সময় হাসপাতালে ভর্তি হইয়া ফ্ল্যামোডল সিরাপ খাইয়াছিল, তাহাদের অনেকে কিডনি সমস্যায় আক্রান্ত হইয়া ঢলিয়া পড়িয়াছিল মৃত্যুর কোলে। পরবর্তীতে তদন্তে প্রমাণিত হয় ওই সিরাপে ছিল বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ ‘ডাই-ইথিলিন গ্লাইকল’—যাহা একইসঙ্গে অননুমোদিত ও নিষিদ্ধ। কিডনি অকেজো করিবার মূল কারণটি ছিল ওই ‘ডাই-ইথিলিন গ্লাইকল’ রাসায়নিকটি। শিশুমৃত্যুর এই রহস্য স্পষ্ট হইবার পর মামলা হয় ১৯৯৩ সালে। কিন্তু এই মামলার আরও এক যুগ পূর্ব হইতেই বহু শিশুর মৃত্যু হইয়াছে জ্বর পরবর্তী কিডনি অকেজো হইয়া এবং অনেক চিকিত্সক মনে করেন, তাহার কারণ ওই ভেজাল প্যারাসিটামল সিরাপ। সরকারের টনক না নড়া অবধি ও জনসচেতনতার পূর্ব পর্যন্ত ওই বিষাক্ত প্যারাসিটামলের কারণে কত হাজার শিশুর মৃত্যু হইয়াছে, তাহার সঠিক হিসাব এখনও কেউ জানে না। নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষদের হত্যা করা অথবা এমন কোনো পদক্ষেপ চাপাইয়া দেওয়া যাহা এই ‘নির্দিষ্ট শ্রেণির মধ্যে নূতন শিশুর জন্মকে প্রতিরোধ করে’—জাতিসংঘের কনভেনশনের অধীনে অনুচ্ছেদ ২-এ বর্ণিত ‘গণহত্যা’র এই সংজ্ঞা অনুযায়ী এই ঘটনাকে গণহত্যার শামিল বলা যায় বৈকি! আর সেই অপরাধের শাস্তি মাত্র ১০ বত্সরের কারাদণ্ড! তাহাও হয়তো সম্ভব হইত না, যদি গণমাধ্যম এই ভয়াবহ ঘটনার ব্যাপারে নিরন্তর ফলোআপ না করিত। কেননা প্রভাবশালী মহলের দ্বারস্থ হইয়া অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানসমূহ বিভিন্ন সময় মামলাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করিয়াছে। ঢাকার বিভাগীয় বিশেষ জজ ও ড্রাগ আদালত গতকাল মঙ্গলবার এই রায়ের পর্যবেক্ষণে বলিয়াছেন, আসামিরা সমাজ তথা মানবতাবিরোধী অপরাধ করিয়াছেন। যেই ঔষধ খাইয়া শিশুরা আরোগ্য লাভ করিবে, সেই ঔষধেই তাহারা মৃত্যুর মুখে ঢলিয়া পড়িয়াছে। ইহা মানবতাবিরোধী অপরাধ। বিজ্ঞ আদালতের দৃষ্টিতে ইহা মানবতাবিরোধী অপরাধ হইলেও শুধু আইনের সীমাবদ্ধতায় আসামিরা মাত্র ১০ বত্সর কারাদণ্ডসহ দুই লাখ টাকা জরিমানার শাস্তি পাইয়াছে। বিদ্যমান আইনে ইহাই সর্বোচ্চ শাস্তি! এই শাস্তি অবশ্যই একটি দৃষ্টান্ত। কিন্তু সেই সময় ড্রাগ (কন্ট্রোল) অর্ডিন্যান্সে মামলা হইয়াছে বিধায় এতগুলি শিশুর মৃত্যুর পরও সর্বোচ্চ ১০ বত্সরের বেশি কারাদণ্ডের শাস্তি দেওয়া সম্ভব হয় নাই। সুতরাং সময় আসিয়াছে এই আইনকে যুগোপযোগী করার। এই শিশুমৃত্যুর ঘটনায় বাকি তিনটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা এখনও বিচারাধীন রহিয়াছে। ২০০৭ সালেও আরেকটি ঔষধ কোম্পানির উত্পাদিত প্যারাসিটামল সিরাপে একই ধরনের ক্ষতিকর রাসায়নিকের উপস্থিতি ধরা পড়ে। তাহাদের বিরুদ্ধে করা মামলাটিও বিচারাধীন রহিয়াছে। আমরা আশা করি, এই মামলার বিচারকার্য শেষ হইতে অধিক বিলম্বিত হইবে না। শিশুরা একটি দেশের অস্তিত্বের প্রবহমান ধারার প্রথমভাগ। হীন ব্যবসায়িক মুনাফা চরিতার্থে সেই প্রথমভাগের ওপর মৃত্যুর কালোছায়া নামিয়া আসিলে তাহার ভয়াবহতা কোনোকিছুর সঙ্গে তুল্য নহে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন