রাজনীতি

চলমান রাজনীতির বাস্তবতা ও ভবিষ্যত্

আপডেট : ২৪ জুলাই ২০১৪, ২১:২৫
বিএনপি বলছে ঈদুল ফিতরের পর সরকার পতনের আন্দোলন গড়ে তুলবে এবং এক্ষেত্রে দলটি অহিংস কর্মসূচি গ্রহণ করবে। ইতিবাচক পদক্ষেপ সন্দেহ নেই। কিন্তু সাংগঠনিকভাবে দুর্বল দলটি এ বিষয়ে যথেষ্ট হোমওয়ার্ক করছে বলে মনে হয় না। দলের নেতৃবৃন্দ মধ্যবর্তী নির্বাচনের কথা বলছেন। তারা স্পষ্ট করেননি এই নির্বাচন কার অধীনে হবে? যদি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে মধ্যবর্তী নির্বাচন করতে হয়, তাহলে বিএনপি’কে আগে সিদ্ধান্তে আসতে হবে নির্বাচনকালীন সরকারের বিষয়ে। এ বিষয়ে ক্ষমতাসীন দল কি আদৌ ছাড় দিবে? মনে হয় না। সর্বোপরি, শুধু মধ্যবর্তী নির্বাচন বা নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি নিয়ে আন্দোলন করলেই সরকারের পতন ঘটানো সম্ভব হবে, এ কথা নিশ্চিত করে বলা যায় না। বিএনপি’কে অবশ্যই সুশাসনের জন্য আওয়ামী লীগের গৃহীত নীতি-কর্মসূচির চাইতে ভাল কিছু বিকল্প জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে। দেশে চলমান দুর্নীতি, সন্ত্রাস, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির প্রশ্নে বিএনপি এখনও দায়িত্বশীল বিরোধীদলের পরিচয় দিতে পারেনি। এই সকল বাস্তবতায় বিএনপি’র উচিত জনগণের সামনে কিছু নতুন চিন্তা তুলে ধরা। ভারতের বিজেপি অথবা আম আদমি পার্টির রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা বিএনপি’র জন্য শিক্ষণীয় হতে পারে। সংসদের বাইরে অবস্থান করে বিএনপি’র মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবির মধ্যে মনে হয় কিছু দুর্বল দিক রয়েছে। সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় আমরা মধ্যবর্তী নির্বাচন দেখি যখন একটি সংখ্যালঘু দলের নেতৃত্বে একটি কোয়ালিশন সরকার হয় এবং এক পর্যায়ে ঐ কোয়ালিশনের কোন বড় দল যদি সংখ্যালঘু দলটির সরকারের উপর থেকে সমর্থন তুলে নেয়। ১৯৯৮ সালে আই. কে. গুজরালের নেতৃত্বাধীন জনতা দলের উপর কংগ্রেস সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়। সরকারের তখন পতন হয়। ফলে ভারতে মধ্যবর্তী নির্বাচন অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। তদ্রূপ সংসদে বিরোধী দল যদি সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনে এই প্রস্তাবের ওপর ভোটে যদি সরকার হেরে যায় তখনও মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিতে পারে। এই দৃষ্টান্ত থেকে আমরা বলতে পারি, সংসদের বাইরে থেকে মধ্যবর্তী নির্বাচনের বি.এন.পি’র দাবি টেকনিক্যালি দুর্বল। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বয়কট বিএনপি’র জন্যও ছিল একটি ভুল সিদ্ধান্ত। এতে করে দলটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অংশীদারিত্বের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়। যা সমর্থকদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করেছে। তবে এতে দলের সমর্থনে ভাটা পড়েছে তাও বলা যাবে না। গত উপজেলা নির্বাচন তার প্রমাণ। আওয়ামী লীগের জন্য ৫ জানুয়ারির নির্বাচন একটি অনৈতিক সিদ্ধান্ত। দীর্ঘমেয়াদে সামনে যদি বি.এন.পি ক্ষমতায় আসে তাহলে ৫ জানুয়ারির পুনরাবৃত্তি যে হবে না এটা নিশ্চিত করে বলা যায় না। যদি হয় তবে আওয়ামী লীগের জন্য তা ক্ষতিকর হবে। ফলে জাতির আরও ভোগান্তি বাড়বে বৈ কমবে না। রাজনৈতিকভাবে বৈধতার সংকট কাটিয়ে দলের ভাবমূর্তি বিনির্মাণ করতে হলে আওয়ামী লীগের জন্য প্রয়োজন দেশে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে আগের জায়গায় ফিরিয়ে আনা। এ ক্ষেত্রে সবার আগে প্রয়োজন বি.এন.পিসহ সকল দলের সাথে আলোচনায় বসা এবং নিজেদের মধ্যে একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে ন্যূনতম ঐক্যের জায়গা তৈরি করা। আলোচনা ব্যতীত মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবি বাস্তবায়িত হওয়া সম্ভব নয়। ৫ জানুয়ারির পূর্ব পর্যন্ত আমার কাছে মনে হয়েছিলো দল হিসেবে আওয়ামী লীগ বিএনপি’র চেয়ে অধিকতর গণতান্ত্রিক। সর্বোপরি সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সিদ্ধান্ত গ্রহণে আওয়ামী লীগ বিএনপি’র চেয়ে অধিকতর বলিষ্ঠতার পরিচয় দেয়। এটি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সকল ক্ষেত্রে সমানভাবে সত্য। কিন্তু, এখন আমার ধারণা পাল্টাচ্ছে। অর্থনৈতিক এবং সামাজিক ক্ষেত্রে তা সত্য হলেও ৫ জানুয়ারির নির্বাচন রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের সিদ্ধান্ত নেয়ার বিশ্বাসযোগ্যতাকে অনেকাংশেই নষ্ট করেছে। আওয়ামী লীগকে অবশ্যই ভাবতে হবে অর্থনৈতিক, সামাজিক ক্ষেত্রে সফলতা, জনগণের কাছে রাজনৈতিক সমর্থন আদায়ের মানদণ্ড নাও হতে পারে। দলের নেতৃত্বকে ভাবতে হবে, ভোটাররা কেবল পারফরমেন্স বিবেচনায় একটি দলকে ভোট দেয় না। ভোট আচরণের মানদণ্ড বহুবিধ হতে পারে। শ্রেণিগত সহমর্মিতা, ধর্মীয় পরিচয়, এলাকাপ্রীতি এসবও ভোট আচরণে মানুষকে প্রভাবিত করে। আবার প্রধান দু’টি রাজনৈতিক দলই তাদের ক্ষমতায় যাওয়ার বিষয়টি বহিঃশক্তির সমর্থনের উপর উল্লেখযোগ্যভাবে ছেড়ে দিয়েছে বলেই প্রতীয়মান হয়। ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের হিসেবে ৫ জানুয়ারি নির্বাচনটি ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ নির্বাচনে ভারত সরাসরি আওয়ামী লীগের পক্ষে অবস্থান নেয়। ভারতের এই অবস্থান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের সাথে দ্বান্দ্বিক হলেও ভারতের অবস্থানের কারণে আওয়ামী লীগ যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কোন বড় ধরনের কার্যকর বাধার সম্মুখীন হয়নি। তবে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের বৈধতার প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র এখনও উদ্বিগ্ন। অন্যদিকে চীনও ৫ জানুয়ারির নির্বাচন প্রশ্নে সরকারের বিপক্ষে কার্যকর কোন অবস্থান নেয়নি। ফলে বহিঃশক্তির নিষ্ক্রিয় অবস্থান আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় থাকার বিষয়ে আরও অনমনীয় করে তুলেছে। বিএনপি ভারতের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগ নিলেও এতে সফলতা দেখাতে ব্যর্থ হয়। এক পর্যায়ে এসে বিএনপি তার রাজনৈতিক ভবিষ্যত্ বহিঃশক্তির উপর ছেড়ে দেয়। এর দ্বারা বিএনপি’র রাজনৈতিক দুর্বলতাকেই প্রকাশ করে। রাজনীতির উপর রাজনীতিবিদদের নিয়ন্ত্রণ না থাকলে বহিঃশক্তির ওপর নির্ভরশীলতা বাড়বে। এতে আমাদের দেশপ্রেমিক চেতনা জাতির ক্রান্তিলগ্নে তার যথার্থ ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হবে। রাজনৈতিক বৈধতার ঘাটতির কারণে সরকার সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অনেকাংশেই প্রশাসনের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। বাস্তবেও আমরা সে ধরনের চিহ্ন দেখছি। প্রশাসনিক নির্ভরশীলতার পাশাপাশি সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সকল রাজনৈতিক সংকট আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে কাটিয়ে সামনে এগোনোর পথকে মসৃণ করতে হবে। লেখক :সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন