আন্তর্জাতিক

গাজা যুদ্ধের সামরিক ও রাজনৈতিক ফলাফল

আপডেট : ২৪ জুলাই ২০১৪, ২১:২৫
ফিলিস্তিনীদের বিরুদ্ধে ইসরাইলী সেনাদের কঠোর ও নির্দয় হামলা নতুন কোন ঘটনা নয়। ১৯৪৮ সালে ইসরাইল প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিশ্ববাসী জায়নিষ্ট ইসরাইলের নৃশংসতার অসংখ্য ঘটনা প্রত্যক্ষ করে আসছে। দখলদার ইসরাইল এসব নৃশংসতা চালায় জাতিসংঘের নির্লিপ্ততার সুযোগে এবং পশ্চিমা শক্তিগুলোর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থন নিয়ে। সামপ্রতিক একটি বিতর্কিত ঘটনাকে অজুহাত করে ইসরাইল গত ৮ তারিখ থেকে টানা দশদিন ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় বিমান হামলা শুরু করে। এরপর ১৭ তারিখ থেকে শুরু হয় স্থল অভিযান। ঘটনাটিকে বিতর্কিত বলার কারণ হলো, যে তিন ইহুদী যুবক অপহূত ও পরে নিহত হওয়ার জন্য ইসরাইল গাজার নির্বাচিত শাসক দল হামাসকে দায়ী করেছে, দলটি সাথে সাথেই সে অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছে। এটা সবারই জানা যে, দখলদার শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইরত ফিলিস্তিনি দলগুলো ইসরাইল বিরোধী কোন পদক্ষেপের সাথে জড়িত থাকলে তার দায় তারা কখনও অস্বীকার করে না। তারা যা করে ঘোষণা দিয়েই তা করে থাকে। এ বিষয়টি ইসরাইলী নেতারাও ভালো করে জানেন এবং বুঝেন। তারপরও তেলআবিব হামাসের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে গাজায় ব্যাপক ধর-পাকড় চালায়, বসতিস্থাপনকারী ইহুদীরাও বসে থাকেনি, তারা এক ফিলিস্তিনী কিশোরকে অপহরণ করে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করে এবং তারই চাচাতো ভাই অপর কিশোরকে নির্মমভাবে পিটিয়ে আহত করে। এসব করেও বর্ণবাদী ইসরাইলীদের জিঘাংসা চরিতার্থ হয়নি। এরপর ভয়ংকর বিমান হামলা ও স্থল পথে কমান্ডো অভিযানের মাধ্যমে ৩৬০ বর্গ কিঃ মিটার আয়তনের উপত্যকাটিকে বধ্যভূমিতে পরিণত করা হয়। বরাবরের মত এবারও পশ্চিমা গণমাধ্যম ফিলিস্তিন ইস্যুতে কৌশলী ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেও সামাজিক যোগাযোগের নানা মাধ্যমে ফিলিস্তিনের প্রকৃত অবস্থা বিশ্ববাসীর দোর গোড়ায় পৌঁছে গেছে। সাইবার জগতে ছড়িয়ে পড়া ফিলিস্তিনীদের আহাজারি, নারী ও শিশুদের ছিন্ন-ভিন্ন দেহের ছবি এবং জায়নিষ্ট সেনাদের বর্বরতার দৃশ্য দেখে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে বিশ্বের প্রতিটি বিবেকবান মানুষ সংক্ষুব্ধ হয়েছে। বর্ণবাদী ইহুদীদের নৃশংসতার বিরুদ্ধে যখন বিশ্ব জনমত ফুঁসে উঠেছে ঠিক তখন আলজাজিরা অনলাইন সচিত্র এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে দেখা যায়, ইসরাইলের এসড্যারট শহরের অধিবাসীরা নিকটবর্তী একটি পাহাড়ের চূড়ায় চেয়ার পেতে বসে গাজায় বিমান হামলার দৃশ্য উপভোগ করছে। আলজাজিরার সাংবাদিক জানান, গাজায় ইসরাইলের একেকটি বোমা নিক্ষিপ্ত হওয়ার পর সেখান থেকে যখন বিপন্ন মানুষের আর্তনাদের শব্দ বাতাসে ভেসে আসছিল তখন ?পাহাড়ের চূড়ায় বসে বর্ণবাদী ইহুদীরা হাততালি দিয়ে উল্লাস প্রকাশ করছিল। প্রতিবেদনটি পড়ার পর স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন আসে, এরাই কি হলোকাষ্ট বা জার্মানীর নাত্সী বাহিনীর গণহত্যা থেকে বেঁচে যাওয়া সেই সৌভাগ্যবানদের বংশধর? এদের পূর্বপুরুষরাই কি হিটলার কর্তৃক গণহত্যার শিকার হয়েছিল? যে জাতির ইতিহাসে হলোকাষ্টের মত ট্র্যাজেডি রয়েছে সেই জাতি কি করে নর হত্যার পৈশাচিক উন্মত্ততায় মেতে উঠতে পারে ! এটা ভেবে বিস্মিত হতে হয়। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ঘোষণা করেছিলেন বিমান হামলার মাধ্যমে হামাসও এই সংগঠনটির সামরিক শক্তি ধ্বংস করা হবে। অথচ দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। গত দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে ইসরাইলী সেনারা জল, স্থল ও আকাশ পথে যে ভয়াবহ হামলা চালিয়ে যাচ্ছে তাতে হামাসের একটি সামরিক স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে বা গুরুত্বপূর্ণ হামাস কমান্ডার নিহত হয়েছে এমন কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। হামাসের রকেট উেক্ষপক ও চলাচলের কৃত্রিম সুড়ঙ্গ পথগুলো ধ্বংস করার নামে স্থল অভিযান শুরু করা হলেও বাস্তবে ধ্বংস হচ্ছে সাধারণ মানুষের ঘর-বাড়ী, মসজিদ,ব্যবসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এর সাথে আশংকাজনক হারে বাড়ছে নারী ও শিশুসহ বেসামরিক মানুষ হতাহতের ঘটনা। অপর দিকে আগ্রাসন ও বেসামরিক মানুষের উপর হামলার জবাবে ইসরাইলের অভ্যন্তরে হামাসের রকেট হামলা বন্ধ করা যায়নি। হামাসের রকেট জেরুজালেম ও তেলআবিবকেও আঘাত করতে সক্ষম হয়েছে । তাদের রকেট গিয়ে পড়েছে দিমুনা পরমাণু কেন্দ্রের সন্নিকটে। ফলে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক আতঙ্ক। ভীত-সন্ত্রস্ত হাজার হাজার ইসরাইলী ঘর-বাড়ী ছেড়ে আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে অবস্থান নিয়েছে। বেন গুরিয়ন বিমান বন্দরের স্বাভাবিক কাজ-কর্ম প্রায় বন্ধ রয়েছে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে দেখা দিয়েছে স্থবিরতা। আতংকিত অভিবাসী ইহুদীরা ইসরাইল ছাড়তে শুরু করেছে। এ অবস্থায় দেশটির অর্থনীতি এখন চরম বিপর্যয়ের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে। এদিকে স্থল অভিযানে হামাসের হাতে নিহত হয়েছে ১৩ ইসরাইলী সেনা, এছাড়া ১ ইসরাইলী সেনাকে বন্দী করার দাবি করেছে হামাস। ফলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন এতে কোন সন্দেহ নেই যে, খুব সহসাই ইসরাইলের মিত্র আরব ও পশ্চিমা দেশগুলো যুদ্ধ বিরতির জন্য তত্পর হয়ে ওঠবে। অতীতে গাজায় পরিচালিত ইসরাইলী হামলার ধরন ও ফলাফলগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে বর্বরোচিতভাবে নারী-শিশু ও বেসামরিক মানুষ খুন করা ছাড়া তাতে ইসরাইলের অন্য কোন অর্জন নেই। ২০০৬ সালে হামাসের হাতে গিলাত শালিত নামে এক ইসরাইলী সেনা আটক হয়েছিল। তাকে উদ্ধারের নামে ইসরাইল জল-স্থল ও আকাশ পথে গাজায় ব্যাপক হামলা চালায়। কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং কয়েক দফা হামলা চালিয়ে ইসরাইল হামাসের হাত থেকে বন্দী সেনাকে মুক্ত করতে সক্ষম হয়নি। শেষ পর্যন্ত ইসরাইল হামাসের কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়। ঘটনার ৫ বছর পর ২০১১ সালের ১৮ অক্টোবর হামাসের সাথে সমঝোতার ভিত্তিতে ১০২৭ জন ফিলিস্তিনী বন্দী মুক্তির বিনিময়ে গিলাত শালিত ছাড়া পায়। ২০০৮, ২০০৯ ও ২০১২ সালের যুদ্ধের ফলাফল একই রকম। প্রতিবারই ইসরাইল হামলা শুরু করেছে হামাসকে নির্মূল করার শ্লোগান দিয়ে। কিন্তু বাস্তবে হামাস নির্মূল হয়নি বরং আগের চেয়ে সামরিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে দলটি শক্তিশালী হয়েছে। হামাস ২০০৮ সালে রকেট বা ক্ষেপণাস্ত্রের যোগান পেতো গাজার বাইরে থেকে। এখন এসব রকেট তৈরী হচ্ছে গাজার ভিতরে। হামাসের রকেটের পাল্লা ৪ বছর আগে ছিলো সর্বোচ্চ ৯০ কিঃ মিঃ। এবার এসব রকেট ১৪০ কিলোমিটার দূরের অবস্থানেও আঘাত করছে। অতএব, দেখা যাচ্ছে ইসরাইল তার অত্যাধুনিক অস্ত্রসম্ভার ব্যবহার করেও বরাবরই হামাসের ত্যাগ,আদর্শিক শক্তি ও সাহসের কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে। আর তাদের যুদ্ধোন্মাদনার পরিণতিতে নিহত হয়েছে ফিলিস্তিনের নারী,শিশু ও সাধারণ মানুষ। যা অমানবিক,আন্তর্জাতিক যুদ্ধনীতির পরিপন্থি,এককথায় কাপুরুষোচিত কাজ। ফলে ফিলিস্তিনীদের সাথে জায়নিষ্টদের অসম যুদ্ধে নৈতিক ও সামরিক পরাজয় সব সময় ইসরাইলের জন্যই প্রযোজ্য হবে। লেখক :রেডিও তেহরানের সাবেক পরিচালক [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন