ঐতিহ্য

ঢাকার ঈদ উত্সব

আপডেট : ২৪ জুলাই ২০১৪, ২১:২৫
ঢাকা অতি প্রাচীন শহর। উপমহাদেশের প্রাচীন শহরগুলোর মধ্যে একটি ঢাকা। মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের সেনাপতি ও সুবাদার ইসলাম খানের ঢাকা বিজয়ের পর থেকে এটা বাংলার রাজধানী। ঢাকাকে কেন্দ্র করেই সুবে বাংলার সকল আদেশ-নির্দেশ, আনন্দ-উত্সব দেশময় ছড়িয়ে পড়তো। মুঘলদের আগে ঢাকার ঈদ সম্পর্কে তেমন কোন তথ্য পাওয়া যায় না। মুঘল নৌসেনাপতি মির্জা নাথানের “বাহারস্থান ই গায়েবী” হতে ঢাকার ঈদ সম্পর্কে কিছু তথ্য পাওয়া যায়। যদিও মুঘলদের আড়াইশ বছর আগে ঢাকায় মুসলমানদের অস্তিত্ব নারিন্দায় ও মিরপুরে পরিলক্ষিত হয়েছে। এদুটি স্থানে যেহেতু প্রাচীন দুটি মসজিদ রয়েছে, সেহেতু সেখানে অবশ্যই ঈদের নামাজও হতো। মির্জা নাথানের লেখনী হতে জানা যায়, তখন ঈদের চাঁদ দেখা যাওয়ার সাথে সাথে মুঘল কেল্লা হতে কামানের গুলি ছোঁড়া হতো। আতশবাজি করা হতো। শাহী বজরা সেনাপতি পরিদর্শন করতেন। সুবাদার শাহী লোকদের পাহারা দিতেন। কিন্তু সাধারণ লোকেরা কিভাবে ঈদ পালন করতো তা লেখা হয়নি। সে সময় ধনাঢ্য ব্যক্তিরা দামি পোশাক পরতো। পাঞ্জাবি, সেরোয়ানী ও পাজামা পরতো পুরুষরা। তাতে জরী ও দামি মুক্তার কাজ করা থাকতো। মেয়েরা শাড়ী, সালোয়ার ও কামিজ পরতো। মুঘল হেরেমের মহিলারা মসলিন কাপড় পরতো। দল বেঁধে ঈদের নামাজ পড়তে যেতো। ঈদের দিন ঈদ মিছিল হতো। এ ঈদ মিছিল ঢাকা শহর ঘুরতো। ঢাকা শহরে ঈদের নামাজের জন্য ধানমন্ডিতে শাহ শুজার সময় মীর কাসিম ১৬৪০ খ্রিস্টাব্দে একটি ঈদগাহ নির্মাণ করেন। এ ঈদগাহর আয়তন ২৪৫–১৪৭ ফুট। ধানমন্ডি ছাড়াও চকবাজার, কাওরান বাজার, লক্ষ্মীবাজার, ইসলামপুর ও লালবাগ এলাকায় ঈদের জামাত হতো। ঈদের দিন ঢাকায় ধনাঢ্যদের বাড়িতে দামি ও সুস্বাব্দু খাবার রান্না করা হতো। এখন ঢাকার ঈদ চিত্র ভিন্ন। দেশের ১৬ কোটি জনগণের প্রায় দেড় কোটি লোকের বাস ঢাকায়। এখন বাংলাদেশের বড় দুটি উত্সবই হলো ঈদ-উল-ফিতর ও ঈদ-উল-আজহা। সারা মাস রোজা থাকার পর শাওয়াল মাসের ১ তারিখে অনুষ্ঠিত হয় ঈদ-উল ফিতর। রমজানে ঢাকা যেন হয়ে পড়ে স্বর্গনগরী। ইফতারসংস্কৃতি এখন শুধু ঢাকায়ই নয়, সমগ্র বাংলাদেশেই প্রচলিত। রমজানের ১৫ তারিখ থেকেই জাতীয় ঈদগাহ সাজাতে থাকে সরকার। জাতীয় ঈদগাহে রাষ্ট্রপতি, মন্ত্রীপরিষদ সদস্যরা ও সংসদ সদস্যরা ঈদের নামাজ আদায় করেন নগরবাসীর সাথে। প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা-নেত্রীরা তাদের দফতরে সর্বসাধারণের সাথে সাক্ষাত্ দেন। দেশি-বিদেশি লোকেরা তাদের সাথে সাক্ষাত্ করেন। ঢাকা সাজাতে থাকে নানা রঙের বাতিতে। পুলিশের নিরাপত্তা বেষ্টনীতে থাকে ঢাকা কয়েক দিন। ঈদ-উল-ফিতরে ধনাঢ্য ব্যক্তিরা জাকাত ও ফিতরা গরীবদের মাঝে বিতরণ করেন। জাকাতের কাপড় আনতে যেয়ে অনেক দুর্ঘটনাও মাঝে-মধ্যে ঘটে। বঙ্গভবন ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বায়তুল মোকাররম মসজিদ সুন্দর করে সাজানো হয়। ঈদ উপলক্ষে ইসলামপুর, চায়নামার্কেট, সদরঘাট, গুলিস্তান, পল্টন, বসুন্ধরা, চাঁদনীচক, গাউছিয়া ও নিউমার্কেট বিপণী বিতানগুলিতে বেচা-কেনার ভীড় জমে। লাখ টাকায় বিক্রি হয় কোন কোন থ্রিপিস ও লেহেংগা। শাড়ীও বিক্রি হয় অনেক দামে। ঢাকার বস্তি থেকে শুরু করে আবাসিক এলাকায় এখন ঈদের আমেজ শুরু হয় একমাস আগে থেকেই। ঢাকায় যাতায়াতের বিশেষ ব্যবস্থা থাকলেও ঈদের দিন ঈদ যাত্রীদের পোহাতে হয় চরম দুর্ভোগ। ঢাকা সিটি কর্পোরেশন ও ঢাকা জেলা পরিষদের মাধ্যমে অনেক ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। সবচেয়ে বেশী ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে। এখানে ৫-৮ টি ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। সব বয়সের সব শ্রেণির লোক ঈদের নামাজে উপস্থিত থেকে জামাত আদায় করেন। তাদের পরনে থাকে সাদা পাঞ্জাবি পাজামা ও টুপি। আতর, গোলাপ, চন্দন ও সেইন্টের সুবাস গায়ে মেখে ঈদগাহে উপস্থিত হয় লাখো মুসলমান। ঈদের দিন ঢাকাবাসী সেমাই, লাচ্ছা, জর্দা, পায়েশ ও দই প্রভৃতি খান। ঘরে ঘরে রান্না করা হয় গরুর মাংস, খাসীর মাংস, মুরগীর মাংস, পোলাও এবং বিরিয়ানী প্রভৃতি। এ বাসায় ও বাসয় দেয়া হয় খাবার দাবার। এতে তৈরি হয় ভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতি। তবে ঈদ এখন শুধু মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এ উত্সব বাংলাদেশের সার্বজনীন উত্সবে রূপ নিয়েছে। হিন্দু মুসলিম সকলেই সমভাবে উপভোগ করছেন ঈদ উত্সব। এ থেকেই বুঝা যায়, ঢাকার বর্তমান ঈদ “সার্বজনীন উত্সবে” রূপ নিয়েছে। লেখক : সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন