[ অ র্থ নী তি ]

বাঙালি জীবনে ঈদের অর্থনীতি

আপডেট : ২৫ জুলাই ২০১৪, ২১:৩২
বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলমান। তাদের দু’টো ঈদ জীবনে বয়ে আনে আনন্দের হিল্লোল। এই দু’টো ঈদকে ঘিরে রয়েছে ব্যাপক অর্থনৈতিক লেনদেন। ঈদুল ফিতরের আমেজ শুরু হয় রমজান মাস শুরুর অব্যবহিত পর থেকেই। রমজান মাসে ধর্মীয় হিসাবে কৃচ্ছ্রতা সাধনের কথা বলা হলেও কেউ কেউ কৃচ্ছ্রতার বদলে ব্যাপক খরচ করে থাকে। অথচ ইসলাম ধর্মে সুন্দরভাবে গরীব-ধনীর মধ্যে বৈষম্য হ্রাসের জন্য যাকাত-ফেতরার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই যাকাত ফেতরাকে যদি সঠিক অর্থে গরীবদের মধ্যে সুষ্ঠু বন্টন ব্যবস্থার মাধ্যমে দেয়া যেত তবে দেশের দারিদ্র্য বিমোচনে ব্যাপক ভূমিকা রাখত। ছেলে বেলায় ব্যাপক অর্থে ইফতার পার্টির আয়োজন না দেখলেও, এখন হররোজ ইফতার পার্টির আয়োজন করা হয়। সরকার যেখানে দেশে উন্নয়নের জন্য প্রয়াস চালাচ্ছেন, সেখানে বেসরকারি উদ্যোগে যে পরিমাণ ইফতার পার্টির আয়োজন করা হচ্ছে, সেসব খাদ্য নষ্ট না হলেও ভাল হতো। আল্লাহ্তায়ালা অপচয় অপছন্দ করেন। এখন ইফতার পার্টি কর্পোরেট কালচারের অংশ হয়ে গেছে। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরম্ভ করে অফিস-আদালতে ব্যাপকভাবে ইফতার পার্টি দেয়া হচ্ছে। ফলে ব্যাপক খরচ ভোগের ক্ষেত্রে ব্যয়িত হচ্ছে এবং সঞ্চয় হ্রাস পাচ্ছে। এদিকে ঈদুল ফিতর কেবল মুসলমান সম্প্রদায় নয় বরং অন্যান্য ধর্মাবলম্বীর জীবনে নিয়ে আসে আনন্দ। তবে ঈদকে ঘিরে যে পরিমাণ পোশাক-পরিচ্ছদ, অলংকারাদি, বাহারি সাজ-সজ্জায় নিম্নবিত্ত থেকে আরম্ভ করে উচ্চবিত্তের ক্ষেত্রে ব্যয়িত হয়। এক হিসাবে দেখা যায় যে, এক ঈদুল ফিতরে প্রায় ষাট হাজার পাঁচ শ’ কোটি টাকার মত ব্যয়িত হয়। আবার ঈদুল ফিতরের সময়ে অনেকে দেশের বাড়িতে, অনেকে আত্মীয়-স্বজনের সাথে দেখা করতে যান। এজন্যে যাতায়াত, আসা-যাওয়ায় যেমন ব্যয় হয় তেমনি অর্থ শহর থেকে গ্রামাঞ্চলে যায় এবং সাময়িক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করে থাকে। আবার অনেকে দেশের বাইরে বিশেষত: বিত্তবানেরা পরিভ্রমণে যান কখনো একা, কখনো সপরিবারে কিংবা দোকা। এক্ষেত্রেও বেশ খরচ হয়ে থাকে। তবে এবারের ঈদ শান্তিপূর্ণভাবে হচ্ছে। ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকা বিক্রি-বাট্টা ভাল হচ্ছে। রাজনৈতিক সহিংসতা ও গোলযোগ না থাকায় এবং আইনশৃংখলা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় ক্রেতা সাধারণ যেমন খুশী তেমনি বিক্রেতারাও খুশী। জননেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন যে, মানুষ নির্বিঘ্নে রাতবিরাতে চলাফেরা করতে পারছে এবং সাধ্য অনুযায়ী ক্রয় করতে পারছে বলে খুশী। তাঁর এই বক্তব্য যথাযথ। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় অর্থনীতির গতিময়তা সৃষ্টি হয়েছে। এই গতিময়তা বজায় থাকা একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক উন্নতির দিক-নির্দেশনা দিয়ে থাকে। ঈদুল ফিতরের আনন্দ ধনী-গরীব সবার জীবনে আনন্দ বয়ে আনুক। আবার ভিন্ন ধর্মাবলম্বীরাও যাতে এ আনন্দ থেকে বঞ্চিতও না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা বাঞ্ছনীয়। একজন ঈমানদার মুসলিম ভিন্ন ধর্মাবলম্বীর মনে কষ্ট দিতে পারে না। ভাবতে অবাক লাগে বিশ্বায়নের যে মূল স্পিরিট তা কিন্তু মুসলিম ধর্মে বহু শত বছর আগেই দিক-নির্দেশনা দিয়েছিল। তবে কষ্ট লাগে এই রমজান মাসে ফিলিস্তিনীদের উপর ইসরাইলী রাষ্ট্র যেভাবে মানব নিধন করছে তা দুঃখজনক। বিশ্ব বিবেকের কাছে অমানবিক কর্মকাণ্ড হিসাবে এটি বিবেচিত হচ্ছে। এ ব্যাপারে ধর্ম নির্বিশেষে সবাইকে সোচ্চার হওয়া বাঞ্ছনীয়। বিভিন্ন দামের ঈদ কার্ডও লেনদেন হয়। আবার রয়েছে গিফট আইটেম দেয়ার প্রতিযোগিতা। এদিকে ঈদুল ফিতর এবার যে আনন্দঘন পরিবেশে উদযাপিত হতে যাচ্ছে তা অত্যন্ত খুশীর খবর। গত ছর যে ধরনের হিংস্রতার মধ্যে মানুষকে ঈদ করতে হয়েছে তা কহতব্য নয়। তবু সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের আকুতি রয়েছে। ঈদের পর যেন শান্তি বিনষ্টকারী কোন ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচি না দেয়া হয়। সেদিকে বিরোধী দল যেন অবশ্যই মনোযোগ দেয়। সবারই ভাবা উচিত। বাংলাদেশ যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে তা সত্যি প্রশংসনীয়। দৈনিক ইত্তেফাকের ২৩শে জুলাই, ২০১৪ খৃ: সংখ্যায় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন বাংলাদেশের সামাজিক উন্নয়নে তার সরকারের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। নিঃসন্দেহে বর্তমান সরকারের জন্য রমজান মাসে এটি একটি ভাল কূটনৈতিক সাফল্য। এই সাফল্য প্রমাণ করে যে, দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং সামাজিক কল্যাণে গত সাড়ে পাঁচ বছরে সরকারের সাফল্য ঈর্ষণীয়। এই সাফল্যের ফল এবারের ঈদুল ফিতরে অনুভূত হচ্ছে। রমজানের শেষে যে ঈদ তার আনন্দ সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি পদক্ষেপ জরুরী। রাস্তাঘাট মেরামতে যে ফান্ড বরাদ্দ করা হয়েছে, তা যেন যথাযথভাবে ব্যয়িত হয় সেদিকে কেবল মন্ত্রীর ইচ্ছা থাকলেই হবে না- বরং এই কাজের সাথে জড়িত সবাইকে দক্ষতা ও কর্তব্যপরায়ণতার সাথে কাজ করতে হবে। কেননা নিরাপদে সবার যাত্রা বাসে-ট্রেনে-নৌপথে বাঞ্ছনীয়। এদিকে ঈদুল ফিতরের পর আসে ঈদুল আজহা এই সময়ে মুসলিমরা অন্যায় কর্ম থেকে বিরত থাকার উদ্দেশ্য নিয়ে কোরবানী করে থাকে। এই কোরবানীর জন্য কেবল দেশের জমাকৃত পশু দ্বারা সম্ভব নয়। এ কারণে পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে উট, গরু, মহিষ এসে থাকে। দেশে ছাগল-ভেড়া কোরবানী করা হয়। এতে প্রচুর পরিমাণে অর্থ বিদেশে বৈধ ও অবৈধভাবে চলে যায়। যেহেতু ধর্মীয় বিধান মেনে কোরবানী করতে হয় সেহেতু এটি সমস্যা নয়। তবে কোরবানীর ক্ষেত্রে সমস্যা অন্যখানে। সমাজে স্বল্পসংখ্যক হলেও কেউ কেউ আছেন, লোক দেখানোভাবে অতিরিক্ত দামে কোরবানী করে থাকেন। আবার প্রয়োজন না থাকলেও একাধিক পশু কোরবানী করেন। মনে পড়ে বিএনপি আমলের একজন ধর্ম প্রতিমন্ত্রী ১০০টি (একশ) গরু তার নির্বাচনী এলাকায় একবার কোরবানী দিয়েছিলেন। এটি অবশ্যই ধর্মীয় ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গী থেকে সমর্থনযোগ্য নয়। এক হিসাবে দেখা যায় যে, আশি হাজার কোটি টাকার মত কোরবানীর গবাদি পশু বিক্রি হয়। আবার কোরবানীর গবাদিপশু আনা-নেয়া, রাখালের কাজ, ট্রাক চলাচলের পাশাপাশি কোরবানী দেয়া, পশু বানানো এবং বণ্টনের কাজে ছদ্মবেশী বেকাররা সংযুক্ত থাকেন। এক্ষেত্রে অবশ্য নিয়মিত কসাইদের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম। সারা বছর যে পরিমাণ চামড়া সংগৃহীত হয় তার সত্তুর শতাংশ আসে কোরবানীর সময়ে। এই চামড়া সংগ্রহ করা এবং পাইকারি বাজারে বিক্রির ক্ষেত্রেও একটি শ্রেণির সাময়িক কর্মসংস্থান ঘটে। আবার পশুর হাড়-গোড়, চোয়াল, চোখ, খুলিসহ বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংগ্রহ করে ওষুধের উপকরণের জন্য আরেক দল সংযুক্ত থাকে। ঈদুল আজহাকে ঘিরেও আনন্দ উত্সবের কমতি থাকে না। তবে কোরবানীল মূল উদ্দেশ্য মানুষের মনের ভেতরের পশুত্ব বর্জন করা। বস্তুত: দুইটা ঈদ আমাদের জাতীয় জীবনে নিয়ে আসে আনন্দ, নিরহংকার হওয়ার দৃঢ় প্রত্যয়। ধর্মীয় বিধান যারা পুরোপুরি মেনে চলেন তাদের ক্ষেত্রে নিরহংকার হওয়া কোন সমস্যাই নয়। দুই ঈদকে ঘিরে রয়েছে বিভিন্ন স্তরে ক্রয়-বিক্রয়; ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিপণন ব্যবস্থা। ইদানীং ক্রয়-ক্রিয়ের ক্ষেত্রেও আধুনিকতার ছোঁয়াও লেগেছে। ইলেক্ট্রনিকভাবে অনেকে অর্ডার দিয়ে থাকে। দুই ঈদকে ঘিরে আনন্দ-উত্সবের পাশাপাশি যে অর্থনৈতিক লেনদেন তা বিভিন্ন স্তরের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে এক ধরনের লেনদেনের প্রভাব ধনী থেকে গরীব সবার মধ্যেই অনুভূত হয়। ঈদের অর্থনীতি দেশের সামাজিক কল্যাণকে শক্তিশালী করে থাকে। তবে যারা অপচয় করে থাকে তাদের ক্ষেত্রে পরিত্যাজ্য করা বাঞ্ছনীয়। কেননা ভোগবাদী সমাজ ব্যবস্থাতেও প্রত্যেক আয় স্তরের মানুষের চলার পথে অপচয়কারীরা না থাকলে বণ্টন ব্যবস্থা আয় অনুপাতে যথাযথ হয়ে থাকে। এদেশে আবহমানকাল থেকে বাঙালি সমাজ ব্যবস্থাতে মুসলমানদের আগমনকালের সাথে সাথে ঈদ হয়ে উঠেছে সার্বজনীন। যারা ভিন্ন ধর্মের তারা গরু খেতে পারেন না কিন্তু ছাগল-ভেড়ার মাংস রেঁধে তাদের ঈদুল আজহার সময় পাড়া-প্রতিবেশী, বন্ধু-বান্ধবেরা নিমন্ত্রণ করে খাওয়ায়। আসলে সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির জন্য মানুষের মনের ঔদার্য থাকা বাঞ্ছনীয়। বাঙালি এক্ষেত্রে কখনো কৃপণ ছিল না। তবে ইদানীং কিছু ধর্মান্ধ মানুষের সৃষ্টি হয়েছে যদিও এদের সংখ্যা খুব নগণ্য। আশা করব, ঈদের অর্থনীতি সুষম বণ্টন ব্যবস্থা, ন্যায় বিচার ও দারিদ্র্য হ্রাসে একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করবে। একই সাথে যারা অর্থাভাবে বা অসুস্থতাজনিত কারণে ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারছেন না তাদের জন্য সমাজের উচ্চবিত্ত শ্রেণিকে নীরবে-নিভৃতে এগিয়ে আসতে হবে। লোক দেখানো অর্থদানের চেয়ে নীরবে অর্থদান করাই উত্তম। ঈদ সবার মধ্যে আনন্দের উচ্ছ্বাস নিয়ে আসুক এই প্রত্যাশা করছি। সামনের দিনগুলো হোক কোন ধরনের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতামুক্ত এই প্রত্যাশা থাকল। কেননা বাঙালি কখনো গোড়ামি, হিংস্রতা ও তাণ্ডব পছন্দ করে না। লেখক : ম্যাক্রো ও ফিন্যান্সিয়্যাল ইকোনোমিস্ট

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন