গণপরিবহন ও যানজট

আপডেট : ২৫ জুলাই ২০১৪, ২১:৩৩
রাজধানীবাসীর কাছে দিন দিন অসহনীয় দুর্ভোগের কারণ হয়ে উঠছে গণপরিবহন ব্যবস্থার অপ্রতুলতা। শুধু তাই নয় ভোগান্তির তালিকা দিন দিন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। পরিস্থিতি এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে এখানকার পরিবহন ব্যবস্থা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, রাস্তার সার্বিক পরিস্থিতি ক্রমেই নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ছে। যাচ্ছেতাইভাবে সবকিছু চলাটাই যেন অনেকটা রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। নাগরিক মানুষজন সবচেয়ে অসহায় বোধ করে পরিবহনের জন্য অপেক্ষার সময়। গণপরিবহনের অব্যবস্থাপনা দুঃসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে অনেক আগেই। কোথাও যাওয়ার জন্য নাগরিকদের রাস্তায় নেমেই এক বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। গন্তব্যে যাওয়ার জন্য তাড়া আছে কিন্তু যানবাহনের তীব্র সংকট। অফিসে যাওয়া, বাচ্চার স্কুল, বিয়ে-দাওয়াত, পার্টিতে যাওয়া, এমনকী রোগী নিয়ে হাসপাতালে যাওয়া—প্রয়োজনীয় কোনো গন্তব্যেই যে সময়মত পৌঁছানো যাবে তার কোনো গ্যারান্টি নেই। বাসে ওঠতে গেলে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। ট্যাক্সিক্যাব অপ্রতুল, ভাড়াও অতিরিক্ত। সিএনজিচালিত অটো রিকশা মিটার বহির্ভূত অধিক ভাড়া নিয়েও প্রয়োজনীয় গন্তব্যে যেতে নারাজ। এর বাইরে বিকল্প যানবাহনও অপ্রতুল। এ অবস্থায় মানুষজনের ভোগান্তির কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। যানজটের কারণে তো রাজধানী স্থবির হয়ে থাকে অধিকাংশ সময়। অথচ একটি দেশের রাজধানীর কর্মচঞ্চলতা যদি এভাবে রাস্তাতেই নষ্ট হয় তাহলে সেই দেশের ভূত-ভবিষ্যত্ যে কি তা কি আর বলার অপেক্ষা রাখে। যানজটের ফলে নষ্ট হচ্ছে কর্মঘণ্টা বাড়ছে রোগ-ব্যাধি। এছাড়া যানজট একটি স্থায়ী সমস্যা হিসেবে দেখা দেয়ায় পরিবহন খাতে বড় ধরনের পরিকল্পনা নিয়ে এগোনো ছাড়া কোন উপায় নেই। যানজট সমস্যার সমাধান না হওয়ায় প্রতিদিনই অনেক কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। পিছিয়ে যাচ্ছে উন্নয়ন। বাধাগ্রস্ত হচ্ছে অগ্রগতি। শুধু তাই নয়, শব্দদূষণ ও বায়ুদূষণে নানা সংক্রামক ব্যাধিতেও আক্রান্ত হচ্ছে রাজধানীর বিপুলসংখ্যক মানুষ। যানজটে নগরবাসীর প্রাত্যহিক জীবনযাত্রাও মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণও বাড়ছে দিন দিন। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা যায়, যানজটের কারণে বছরে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি। সব রুটে যাত্রীদের চলাচলে কমপক্ষে ৩ কর্মঘণ্টা সময় অপচয় হয় প্রতিদিন। যানজটের কারণে বিপুল পরিমাণ জ্বালানিরও অপচয় হয়। কিন্তু এ থেকে পরিত্রাণের যেন কোন উপায় নেই। বিভিন্ন সময়ে নানামুখী কর্মসূচি-পরিকল্পনা হাতে নেয়া হলেও বাস্তবায়ন হয়েছে খুবই কম। ফলে সমস্যা যে তিমিরে ছিল সেখানেই রয়ে গেছে। অথচ দুর্বিষহ যানজটের জন্য পরিকল্পনা ও সমন্বয়হীনতার অভাবকেই দায়ী করা হয়। রাজধানীতে দিন দিন জনসংখ্যা বেড়ে চলেছে। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে গাড়ি-ঘোড়া। কিন্তু সে তুলনায় রাস্তাঘাট বাড়ছে না। রাজধানীতে রাস্তার তুলনায় প্রায় ৩ লাখ যানবাহন বেশি চলছে। এছাড়া প্রতিদিন গড়ে ২৩০টি নতুন গাড়ি রাস্তায় নামছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী যে কোনো শহরে মোট আয়তনের শতকরা ২৫ ভাগ যান চলাচলের জন্য রাস্তা থাকা আবশ্যক। ঢাকা শহরের মোট আয়তন ৮১৫ দশমিক ৮৫ কিলোমিটার। এ হিসেবে ২০৪ কিলোমিটার রাস্তার প্রয়োজন হলেও ঢাকা শহরে প্রধান রাস্তার পরিমাণ মাত্র ৮৮ কিলোমিটার। এই পরিমাণ রাস্তায় ৫ লাখ যানবাহন চলাচল করছে। অথচ অন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী এই পরিমাণ রাস্তায় ২ লাখ ১৬ হাজার যানবাহন চলাচল করার কথা। এর ফলে যানজট এক অনিবার্য বাস্তবতা হিসেবে দেখা দিয়েছে। এছাড়া ট্রাফিক ব্যবস্থা ঠিকমত কাজ না করায় যানজট থেকে মুক্তি পাচ্ছে না রাজধানীবাসী। যানজট নিয়ন্ত্রণে কঠোর ট্রাফিক আইনের প্রয়োগ, প্রাইভেট গাড়ির ওপর নিয়ন্ত্রণ, যত্রতত্র পার্কিং নিষিদ্ধ করা, রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, নদীপথ এবং ঢাকার ভেতরের খাল দখলমুক্ত করে নৌপথের উন্নয়ন করা, রিকশামুক্ত সড়কসহ নানা পরিকল্পনার কথা বলা হয়। কিন্তু এগুলো নিয়ে কথাবার্তা যতটা হয় কাজ ততটা হয় না যে তা যানজটের বর্তমান হালই বলে দিচ্ছে। কিন্তু যানজট এখন এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে যে, এ থেকে পরিত্রাণের উপায় খুঁজে বের করতে হবে। যানজট বর্তমান নগরবাসীকে স্থবির ও অচল করে রেখেছে। এই অবস্থা দীর্ঘায়িত হলে এর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক ফলাফল হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। এজন্য পরিবহন খাতে একটি স্বস্তিদায়ক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। এজন্য অবকাঠামো, সুশাসন অযান্ত্রিক পরিবহন, পরিবহনের পরিদর্শন ও ব্যবস্থাপনা, ড্রাইভিং লাইসেন্সের ক্ষেত্রে গুণগত পরিবর্তন ও চালকদের ফিটনেস বা স্বাস্থ্যগত বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতে হবে। পরিবহন সেক্টরে নৈরাজ্য বন্ধ এবং একটি সুষ্ঠু প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত পরিবহন বিআরটিসিকে সত্যিকার অর্থে সচল করতে হবে। ঢাকার রাস্তায় একই সঙ্গে চলছে বাস, মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার, সিএনজিচালিত অটো রিকশা ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের যানবাহন। ফলে এক জগাখিচুরি অবস্থার কারণে যানজট এখানে নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ জন্য একটি সুসমন্বিত পরিকল্পনা নিয়ে এগুনো প্রয়োজন। সড়ক পথের উন্নয়নের পাশাপাশি ঢাকার চারপাশের নৌপথগুলো চালু করা দরকার। নৌপথে যাতায়াত অপেক্ষাকৃত সস্তা এবং স্বস্তিদায়কও বটে। এছাড়া মেট্রো রেল চালু করেও রাজধানীর গণপরিবহনের চাহিদা অনেকটাই মেটানো সম্ভব। গণপরিবহনের অব্যবস্থাপনা এবং যানজট দূর করে স্থবির ঢাকাকে বদলে না দিতে পারলে দেশের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়। এ কারণে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এবং তা অত্যন্ত জরুরিভিত্তিতে। লেখক : সাংবাদিক [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন