নর্দমা নির্মাণে ব্যবহূত নির্মাণ সামগ্রী রাখিতে খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি) গোলকমনি শিশুপার্কের স্থান ভাড়া দিয়াছে। প্রায় সাত মাস ধরিয়া নির্মাণ সামগ্রী রাখিবার কারণে শিশুদের খেলাধুলা বন্ধ হইয়া গিয়াছে বলিয়া খবর প্রকাশিত হইয়াছে। বিষয়টি লইয়া এলাকাবাসীর মনে ক্ষোভের জন্ম হইয়াছে। ভাড়ার শর্ত অনুযায়ী চলতি বছরের ৩১ মার্চের মধ্যে স্থান ছাড়িয়া দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তিন মাসের স্থলে ছয় মাস অতিবাহিত হইলেও পার্ক ছাড়েন নাই ঠিকাদার। সমপ্রতি পূর্বের তিন মাসের টাকা পরিশোধ করিয়া নূতন করিয়া অক্টোবর পর্যন্ত সময় চাহিয়া আবেদন করিয়াছেন তিনি।
এই ঘটনাটি সমরূপ আরও কিছু ঘটনার উদাহরণ মাত্র যাহার ফলাফল হইলো নগরগুলি হইতে পার্কগুলি হারাইয়া যাইতেছে। একসময় জনসংখ্যার অনুপাতে নগরগুলিতে পর্যাপ্ত পার্ক ও খেলার মাঠ ছিল। সময়ের ব্যবধানে নগরগুলিতে লোকসংখ্যা বাড়িয়াছে কয়েক গুণ। বাড়তি মানুষের জন্য নূতন পার্ক ও খেলার মাঠ সৃষ্টির প্রয়োজন ছিল; কিন্তু বাস্তবে ঘটিয়াছে উল্টা। বিভিন্ন এলাকার পুরানা পার্ক ও খেলার মাঠ উধাও হইয়া গিয়াছে। আবার যাহাও বা অবশিষ্ট রহিয়াছে, তাহার অনেকগুলি বেদখল হইয়া রহিয়াছে। ফলে নগরজীবনের দৈনন্দিন ক্লান্তি ঘুচাইতে নাগরিকদের ছায়াশীতল কোনো স্থানে নিরিবিলি সময় কাটাইবার সুযোগ অপসৃত হইয়াছে, শিশু-কিশোরদের বাড়িয়া উঠিবার অন্যতম অনুষঙ্গ খেলাধুলা করিবার স্থানও দুষ্প্রাপ্য হইয়া উঠিয়াছে। রাজধানীর কথাই ধরা যাক। রাজউক এবং ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের হিসাব অনুযায়ী, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সরকারি সম্পত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত পার্কের সংখ্যা ৪৭; কিন্তু বাস্তবে অস্তিত্ব খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে বড়জোর ১৫টির। একইভাবে ১৯টি খেলার মাঠের মধ্যে ৮টির অস্তিত্ব কোনোমতো টিকিয়া আছে। বাকিগুলি হাওয়া হইয়া গিয়াছে। তালিকায় থাকিলেও, যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তায়, মগবাজারে, কাওরান বাজার ইত্যাদি নানান স্থানে পার্কের কোনো অস্তিত্ব নাই। যাহাওবা আছে, তাহাদের মধ্যে মোহাম্মদপুর এবং গুলশান-বনানী এলাকার পার্কগুলি তুলনামূলক ভালো অবস্থায় থাকিলেও, অন্যসব এলাকার পার্কগুলি ধীরে ধীরে বেদখল হইয়া গিয়াছে।
প্রভাবশালীদের দুর্বৃত্তায়নই রাজধানীর পার্ক ও মাঠের এই দশা করিয়াছে। ক্ষমতাধরের সর্বগ্রাসী লোলুপতার কারণে পার্কের জায়গায় তৈরী হইয়াছে মার্কেট অথবা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। আবার কোথাওবা পার্ক দখল করিয়া গাড়ি কিংবা রিকশার গ্যারেজ বানানো হইয়াছে। খুলনার মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানই পার্কগুলিকে মারিয়া রাখিয়াছে। সরকারের দিক হইতে ব্যর্থতা হইলো এইসকল পার্ককে বা খেলার মাঠকে রক্ষা করিতে না পারা। বেদখল হইয়া যাওয়া পার্ক বা মাঠকে উদ্ধার করার ক্ষেত্রেও সরকারগুলি ব্যর্থ হইয়াছে। তবে দোষ কেবল রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদেরই নহে, সিটি কর্পোরেশনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যোগসাজশ ও দুর্নীতি ইহার জন্য কম দায়ী নহে।
পুরানা পার্ক ও মাঠের ভাগ্যে যাহা ঘটিয়াছে, তাহা সকলের সামনেই ঘটিয়াছে, কেহই কিছু করেন নাই। লক্ষ্য করিবার বিষয় হইলো, নগরগুলি সম্প্রসারিত হইতেছে কিন্তু নূতন আবাসিক এলাকায় প্রয়োজনীয় রাস্তা-ঘাটের মতোই পার্ক ও মাঠের সুব্যবস্থা রাখা হয় নাই। জলাশয় ভরাট করিয়া নূতন প্লট তৈরি করা হইয়াছে, কিন্তু সেই প্লটে যেইসব দালান উঠিতেছে তাহাদের শ্বাস ফেলিবার ন্যূনতম স্থান রাখা হয় নাই। দালানগুলির মাঝখানে ফাঁকা জায়গা হয়তো রাজউক হইতে পাস হওয়া কাগজপত্রে আছে, বাস্তবে নাই। নগর পরিকল্পনাবিদ, সরকারি প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী ব্যক্তিবর্গ সর্বোপরি সাধারণ নাগরিকেরা একত্রিত হইয়া নগরগুলিকে বাসযোগ্য করিবার উদ্যোগ লইবার পরিবর্তে সকলে মিলিয়া তাহাদের বিনষ্ট করিতেছি। এমনকি অপেক্ষাকৃত ছোট শহরগুলিতেও নগরসম্প্রসারণ হইতেছে বস্তির বিচারে—দালানগুলিকে ঘেঁষাঘেঁষি করিয়াই যেন দাঁড়াইতে হইবে। আজ ঢাকাকে বসবাসের অনুপযোগী বলিয়া নিজেরাই উপলব্ধি করিতেছি, ভবিষ্যতে আমরাই ইহাকে মর্ত্যের নরক বলিয়া রায় দিবো। তাই সচেতন হইবার এখনই সময়, এই নগরগুলিকে রক্ষা করিতে উদ্যোগ লইবার এখনই সময়।
