ঈদ এলে প্রতিটি ঈদেই ঘরমুখী মানুষের ভোগান্তির চিত্র পরিলক্ষিত হয়। একটি ব্যতিক্রম চিত্র দেখার আকাঙ্ক্ষা আর স্বপ্নগুলোর অপমৃত্যু দেখি প্রতিবার। নাড়ির টানে বাড়ি যাবার ব্যাকুলতায় শেষ পর্যন্ত নাড়ি ছেঁড়ার উপক্রম হয়। প্রতি ঈদেই সরকারের পক্ষ থেকে কেউ না কেউ ঘোষণা করেন আগামীতে এই ভোগান্তি আর থাকবে না। তারপরও আমরা দেখি সড়ক-মহাসড়কগুলোর বেহাল দশা, অচল লঞ্চ সচল করার পাঁয়তারা, ট্রেনের টিকিট হয়ে যায় সোনার হরিণ। কোনটা রেখে কোনটা বলব। বাসভাড়া হয়ে যায় দেড়গুণ থেকে তিনগুণ, লঞ্চে যাত্রী তোলা হয় ধারণ ক্ষমতার দ্বিগুণ। ট্রেনের টিকিট নিয়ে যে তেলেসমাতি কারবার চলে তা সরকারের উচ্চপর্যায়ের লোক থেকে শুরু করে খেটে খাওয়া মানুষ পর্যন্ত কারো অজানা নেই। এই অবস্থা চলছে যুগ যুগ ধরে। যারা নীতি নির্ধারক আছেন তাদের এসব বিষয়ে মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না। আমরা বিশ্বাস করি জনগণের সকল দুর্ভোগ লাঘব করা সম্ভব যদি কর্তাব্যক্তিদের সদিচ্ছা থাকে।
আর একটা বড় বিষয় যানজট। রমজান মাস শুরু হলে যানজট প্রকট আকার ধারণ করে। বিশেষ করে ঢাকা শহরে এই যানজট এত ভয়াবহ রূপ নেয় যে জনজীবন থমকে থাকে। এর কারণ খুঁজে পাওয়া খুব একটা দুঃসাধ্য ব্যাপার নয়। গাড়ি থামিয়ে পুলিশের চাঁদাবাজি অন্যতম একটি কারণ। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে সিগন্যাল বাতির ব্যবস্থা করা হলেও প্রতিটি সিগন্যাল পুলিশের হস্ত দ্বারা পরিচালিত হয়। যত্রতত্র বাস পার্কিং এবং লোক ওঠা-নামা করতে দেখা যায় যা নিয়ন্ত্রক ব্যক্তিদের চোখের সামনেই ঘটে। ফুটপাতগুলো হকারের দখলে থাকে এবং সেখানেও ক্রেতাসাধারণের ভিড় চোখে পড়ার মত। বড় বড় শপিং মল ও বাণিজ্যিক ভবনের অধিকাংশগুলোতে পর্যাপ্ত পার্কিং ব্যবস্থা নেই। ফলে রাস্তার দু’পাশ গাড়িতে ঢেকে যায়। ভবন নির্মাণের অনুমতি দিতে পার্কিং ব্যবস্থা বিবেচনা করা জরুরি। মূলত আমরা দেখে আসছি পরিকল্পনাগুলো কল্পনাতীতভাবে অসামঞ্জস্য থেকে যায় আর এসবের সকল ভোগান্তি পোহাতে হয় জনসাধারণকে। এমন ভোগান্তি থেকে পরিত্রাণ পেতে আমাদের আর কত ভোগান্তি সহ্য করতে হবে কেউই জানি না। প্রতিবছর দেখা যায় জুন ফাইনালের দোহাই দিয়ে বর্ষাকালে রাস্তা খোঁড়া ও রাস্তা মেরামতের কাজ চলে। আমাদের বোধগম্য নয়, জুন ফাইনাল কি জুনের আগে করা সম্ভব নয়? যে অর্থ ব্যয়ে পানিতে বিটুমিন ঢালা হয় তার আয়ু তো একবছরও হয় না। অথচ শুষ্ক মৌসুমে বিটুমিনাস কার্পেটিং করা হলে তা কত টেকসই হয় সে-কথা প্রকৌশলীদের অজানা নয়। এই চিরাচরিত জুন ফাইনাল থেকে আমরা কি কোনদিন পরিত্রাণ পাব না?
বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশ নয়, উন্নত দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে আশার বাণী শোনালেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। আমরাও আশান্বিত হতে চাই কিন্তু কেন যেন আশাহত হয়ে পড়ি। দেশের সকল লোক যদি সত্ আর আদর্শবান না হয় তা হলে একটি দেশ এত সহজেই উন্নত হতে পারে না। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুও একটি সম্ভাবনাময় সুন্দর দেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন কিন্তু অদ্যাবধি সেই দেশটি মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। কতিপয় দুষ্ট লোকের চক্রান্ত সকল স্বপ্নকে ধ্বংস করে দিতে পারে সে প্রমাণ আমরা পেয়েছি। ফলে বাংলাদেশকে উন্নত দেশে পরিণত করতে হলে মন্ত্রণালয়গুলোকে শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে হবে। মন্ত্রীদেরকে অফিসে বসতে হবে নিয়মিত। ব্যক্তিগত বিলাসিতা ত্যাগ করে জনস্বার্থে কাজ করতে হবে। আমরাও চাই প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন বাস্তবায়িত হোক তা যেকোন ত্যাগের বিনিময়েই হোক না কেন। এই স্বপ্নের পথটি যেন বন্ধুর না হয় সেটাই কাম্য।
আমাদের পূর্ব অভিজ্ঞতা আছে রাস্তায় খানাখন্দের কারণে তীব্র যানজটে আটকে ভাঙা রাস্তাতেই ঈদের নামাজ পড়তে হয়েছে কখনো কখনো। এটা যে কত বড় দুর্বিষহ যন্ত্রণা তা ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ জানে না। এবার ঈদে যেন এমনটি না ঘটে সেই প্রত্যাশা করি। ঈদের আনন্দ পরিপূর্ণভাবে উপভোগ করার জন্য আমাদের পথটি যেন শেষ হয় এবং পরিবার-পরিজন নিয়ে ছুটির দিনগুলো মধুময় করে তুলতে পারি।
লেখক : কবি ও শিশুসাহিত্যিক
