ঈদ উত্সব : ‘গৃহকর্মী’ শিশু ও ‘পাখি’ ড্রেস

আপডেট : ২৭ জুলাই ২০১৪, ২০:৩৮
বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন একটি রেস্টুরেন্টে নিয়মিত চা খাওয়ার সুবাদে হাসানের সাথে পরিচয়। রেস্টুরেন্টে প্রবেশের সাথে সাথেই হাসিমাখা মুখে ‘আসেন স্যার, বসেন’ বলা তার নিত্যদিনের রুটিন। আলাপে আলাপে জানা যায়, রেস্টুরেন্টে আসা গ্রাহকদের টেবিল মোছা থেকে শুরু করে পানি সরবরাহ করা তার কাজ। বিনামূল্যে থাকা-খাওয়ার শর্তে হাসানের এই কর্মে নিযুক্তি। ছেলেটির চোখে-মুখে কেমন যেন এক সরলতা, দেখলেই মায়া লাগে। বয়স আর কত হবে ? দেশের আইনে শিশু হিসেবে সংজ্ঞায়িত হওয়ার মানদণ্ডের মাঝামাঝি বয়সেই তার অবস্থান। দম ফেলার সময় নেই তার। সে তার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে বদ্ধপরিকর। আলোচ্য এই হাসানের বিষয়টি কোন গল্প বা উপন্যাসের চরিত্র নয়। আমাদের সমাজ বাস্তবতার প্রচলিত, অনিবার্য ও নির্মম এক চরিত্র। যে শুধু দু’বেলা দু’মুঠো ভাত খাওয়ার জন্য তার উজ্জ্বল ভবিষ্যেক অন্ধকারে ঠেলে দিয়ে বর্তমানের প্রয়োজনটাকেই প্রাধান্য দিতে বাধ্য হচ্ছে। শুধু হাসানই নয়, এরকম লাখো লাখো হাসান জীবনযুদ্ধে টিকে থাকার জন্য নিজের জীবনকে তোয়াক্কা করছে না মোটেই। কয়জনের খবর আমরা রাখি বা রাখতে পারি। হাসানের চেয়েও বয়সে ছোট কোনো শিশু বা হাসানের মত অন্য কেউ হাসানের চেয়েও আরও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখছে। কেউ কেউ ইটভাটায় অনবরত ইট মাথায় নিয়ে কাজ করছে; ঝালাই, ঢালাই কারখানায় ঝুঁকিতে কাজ করছে; আগুন নিয়ে কাজ করছে রি-রোলিং কিংবা জ্বলন্ত বয়লারে। শিশুরা কাজ করছে গৃহকর্মে এক ধরনের ‘দাসবৃত্তি’ থেকে শুরু করে ধাতব কারখানায়, ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপে, প্লাস্টিক কারখানায়, অটোমোবাইল-গাড়ির গ্যারেজে, রিকশা-মোটরসাইকেল ওয়ার্কশপে। এর বাইরেও অনেক ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সাথে তারা জড়িত। এভাবে দেখতে দেখতে ক্লান্তি আসে কিন্তু শিশু শ্রমিকদের কাজের ক্ষেত্র কমানো সম্ভব হয় না। ২০১৬ সালের মধ্যে দেশে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম বন্ধ করার ব্যাপারে সরকার অঙ্গীকারাবদ্ধ হলেও এখনো অসংখ্য শিশু বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় নিয়োজিত। এর মধ্যে গৃহকর্মী অন্যতম। ঈদকে সামনে রেখে প্রতিবছরই কেনাকাটার ধুম লেগে যায়। এবারের ঈদেও তার ব্যতিক্রম নয়। তবে, এবার ‘পাখি’ ড্রেস নামের এক পোশাক সাড়া ফেলে দিয়েছে সারাদেশে। আর এই ড্রেসকে কেন্দ্র করে ঘটছে অদ্ভুত সব ঘটনা। ‘পাখি’ ড্রেস কিনে না দেয়ায় বিবাহবিচ্ছেদ ঘটেছে স্বামী-স্ত্রীর। ‘পাখি’ ড্রেস না পেয়ে আত্মহত্যা করেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের অভিমানী কিশোরী। হায়রে, সামান্য একটা জামার জন্য জীবনটাই দিয়ে দিল। পাখি হলো স্টার জলসার সিরিয়াল ‘বোঝে না সে বোঝে না’র এক চরিত্র। ‘পাখি’ ড্রেস ঠিক কি কারণে কতিপয় মানুষের এতো প্রিয় পোশাকের তালিকায় উঠে এলো এবং তা এমনভাবে আকৃষ্ট করলো যে, মানুষের জীবন-মরণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ালো তা আমার বোধগম্য নয়। তবে, আমার ভাবনার জায়গাটা হল সামান্য একটা ড্রেসের জন্য এতো কিছু ঘটে গেলো, অথচ দিনের পর দিন ‘গৃহকর্মী’ অনেক শিশু নিদারুণ অনাদর ও বঞ্চনার মধ্যে থেকেও জীবনটাকে এগিয়ে নিয়ে চলছে। না পাওয়ার বেদনা থাকার পরেও অনেকে আগামী দিনের স্বপ্ন বুনে চলছে। ‘পাখি’ ড্রেস সিনড্রোম তাদের আকৃষ্ট করে না, বিচলিত করে না। তবে হ্যা, মানুষ হিসেবে পরিগণিত না হওয়ার বেদনা যে তাদের বিচলিত করে, সেটা অস্বীকার করা যাবে না। সমাজের অনেকেই আছেন যারা বিভিন্ন কারণে ‘গৃহকর্মী’র প্রতি অমানবিক আচরণ করতে কুণ্ঠাবোধ করেন না। ছেলে বা মেয়ের সমবয়সী ‘গৃহকর্মী’ শিশুটিকে দিয়ে নিজের ছেলে-মেয়েকে স্কুলে নেয়ার জন্য তৈরি করে ‘গৃহকর্মী’ শিশুটির মৌলিক অধিকারের যৌক্তিকতা অস্বীকার করা সমাজে নতুন কিছু নয়। তবে ‘গৃহকর্মী’ শিশুর প্রতি একটু সদয় আচরণ তাদের দুঃখ-কষ্ট ভুলিয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। আমরা যেন গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশুটির প্রতি একটু নজর দেই। শুধু নিজের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ব্যস্ত না থেকে শ্রমজীবী শিশুদের দিকে এই আসন্ন ঈদকে উপলক্ষ করে একটু মানবতার হাত বাড়িয়ে দেই যেন তারাও একটু মানুষ হিসেবে তাদের অনুভূতিটা উপলব্ধি করতে পারে। লেখক : বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন